জাতীয়

তদবিরের হাট ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বেশ ইন্টারেস্টিং একটা ‘সমঝোতার’ খবর চোখে পড়ল। অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈরিতা থাকলেও, আওয়ামী লীগপন্থি চিকিৎসকদের পরিষদ (স্বাচিপ) এবং বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন (ড্যাব)-এর নেতাদের তদবিরের মাধ্যমে ‘ম্যানেজ’ করে পদায়ন বাগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি এই কাজে তাল মিলিয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ। অবশ্য এমনি এমনি যে কাজ হচ্ছে, তা নয়; কাজ হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে ‘তদবিরের হাট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করেছে জাগো নিউজ২৪। প্রকাশিত সংবাদটি বলছে, কথা ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বদলি-পদায়ন হবে অটোমেশনের মাধ্যমে। অটোমেশন চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও একই সুরে কথা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ সব উল্টে গেল। অটোমেশন চালুর পরিবর্তে তদবির ও অর্থের বিনিময়ে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মেধা, যোগ্যতা, চাকরির রেকর্ড ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে চিকিৎসকদের পদায়নের উদ্যোগটি আবার ঝিমিয়ে পড়েছে। বহু বছর ধরে চলমান এই ‘তদবির সংস্কৃতি’ শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েই নয়, অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থাতেও চলছে। তদবির, ঘুষ ও দুর্নীতিকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির অংশও বলা যায়। যেভাবেই হোক, দেশকে ভালো অবস্থানে নিতে চাইলে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি-সম্পর্ক ও অর্থ যেন আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে অচল করে না দেয়। এ ক্ষেত্রে আদালত ও গণমাধ্যম সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। সব সময়ই বলা হচ্ছে, সেবাখাতে দুর্নীতি, ঘুষ লেনদেন এবং তদবির বাণিজ্য সাধারণ জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ও সেবাখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। কিন্তু কিছুতেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হচ্ছে না। সেবা গ্রহণের জন্য কোথাও গেলেই সাধারণ মানুষকে তদবির, ঘুষ, প্রতারণা, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার দাপট ও দায়িত্বে অবহেলার মতো বিষয়গুলোর মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জাতীয় পরিচয়পত্র, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি দপ্তর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, টিআইবির জরিপ (২০২৫) বলছে, বাংলাদেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ খানা (হাউজহোল্ড) বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাত বা প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে গিয়ে কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এই হার ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সেবাখাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ আদায়ের শিকার খানার ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ বাধ্য হয়ে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিয়েছে। অন্যদিকে, সেবাদাতার সঙ্গে যোগসাজশে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ খানা ঘুষ দিয়েছে। কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতা, হয়রানি এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির আশঙ্কায় দুর্নীতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ অভিযোগ জানাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। এদিকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর এবং পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বলেছেন, ‘আমি দেখছি যে কিছুই বদলায়নি। আগে যারা ঘুষ খেত, তারা এখনো ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে। একইভাবে যারা ভালো একটা কাজ আটকে দিত, তারা এখনো তা আটকে দিচ্ছে।’ লোকজন ভোল পাল্টাচ্ছে এবং প্রশাসনের পুরোনো সংস্কৃতি বহাল রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তাঁর এই বক্তব্য রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। তিনি যে কঠিন সত্যটি তুলে ধরেছেন, সেটির পরিবর্তন কঠিন হলেও অত্যন্ত জরুরি। তদবির বাণিজ্যের উপস্থিতি শুধু বাংলাদেশেই নয়; প্রায় সব দেশেই কোনো না কোনো মাত্রায় রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তদবির, ঘুষ ও দুর্নীতির প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। সাধারণত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ বা জটিল হলে মানুষ শর্টকাট খোঁজে। তখন ব্যক্তিগত পরিচয়, অর্থ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে কাজে লাগায়। বাংলাদেশে চাকরি, বদলি, টেন্ডার, প্রশাসনিক সেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ঘুষ ও তদবির তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। একে ঠেকানোর জন্য আইন থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই ধরনের অবস্থা ভারত, পাকিস্তান ও নেপালেও দেখা যায়। কাজের জন্য বাংলাদেশে যেখানেই যেতে হয়, সেখানেই একটি জট দেখা যায়। টাকা না দিলে, পরিচিত ব্যক্তি বা উচ্চপদস্থ কেউ না থাকলে সেই জট খোলে না। পরিচিত মানুষ বা টাকা ছাড়া কাজ হবে না—ক্রমেই এমন ধারণা সমাজে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। আমাদের তদবিরের সংস্কৃতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার—সব ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতার অপব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। এর মানে তদবির বাণিজ্য শুধু রাজনৈতিক দল বা রাজনীতিবিদদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, আমলাসহ অনেকেই জড়িত। সরকারি নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুপারিশ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায়ই খবর প্রকাশিত হয় এবং আলোচনা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষক ও প্রশাসনিক নিয়োগ, সরকারি ক্রয়, টেন্ডার, ঠিকাদার নির্বাচন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। এই তদবিরের সংস্কৃতি বাংলাদেশে হঠাৎ করে চালু হয়নি। দিন-তারিখ গুনে বলাও যাবে না, কবে থেকে এটি আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকে গেছে। রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে ধীরে ধীরে এর বিকাশ ঘটেছে। গত ২৫–৩০ বছরে এটি একেবারে গেড়ে বসেছে। ব্রিটিশ আমলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব ছিল বেশি। তাই সে সময় জমিদার, মহাজন ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠেন। এরাই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার বিনিময়ে প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। এটি বর্তমান অর্থে ‘তদবির বাণিজ্য’ না হলেও ব্যক্তিগত প্রভাবের একটি রূপ ছিল। ধীরে ধীরে সরকারি চাকরি খুব কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে। লাইসেন্স, পারমিট ও আমদানি-রপ্তানির অনুমতির জন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের গুরুত্ব বাড়ে। পরবর্তীকালে স্কুলে ভর্তি, চাকরি পাওয়া, চাকরিতে পদোন্নতি, হাসপাতালে ভর্তি—এসব ক্ষেত্রেও ‘পরিচিত লোকের মাধ্যমে কাজ করানো’ সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়। তাহলে কি ব্যক্তি ও অর্থকেন্দ্রিক এই গভর্ন্যান্স থেকে আমাদের মুক্তি নেই? মুক্তি আছে। তবে সে জন্য ইতিবাচক কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়াতেও একসময় ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের প্রভাব ছিল; সিঙ্গাপুরেও ছিল। কিন্তু শক্তিশালী দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা ও ই-গভর্ন্যান্স দেশ দুটিতে এই তদবিরের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছে। যেসব দেশে আইনের শাসন, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী, সেখানে তদবির বা ব্যক্তিগত প্রভাবের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম। যেসব দেশ তদবির ও ঘুষ কমাতে সফল হয়েছে, তারা সরকারি সেবা ডিজিটালাইজড করেছে, নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডারে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া চালু করেছে। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেয় বা নিতে চায়, তার লিখিত কারণ প্রকাশ করে। পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেছে। যেভাবেই হোক, দেশকে ভালো অবস্থানে নিতে চাইলে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি-সম্পর্ক ও অর্থ যেন আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে অচল করে না দেয়। এ ক্ষেত্রে আদালত ও গণমাধ্যম সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। ৩ আগস্ট, ২০২৬ লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক। এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>