বিজ্ঞাপন
আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশে দিন-রাত চলছে সোনা উত্তোলনের কাজ। পাহাড় কেটে একের পর এক সোনা খুঁজছেন শ্রমিকরা। অথচ এসব পাহাড়েই একসময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের গবাদিপশু চরাতেন। সোনার খনির বিস্তার বদলে দিয়েছে তাদের জীবন ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ।
প্রাদেশিক রাজধানী ফয়জাবাদ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে শিওয়া এলাকায় হাজারো শ্রমিক সোনা উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিনিয়োগকারীদের জন্য সেখানে কাজ করছেন তারা। দিন-রাত পাহাড়ে চলছে খননযন্ত্রের শব্দ।
তবে এই সোনার হিড়িকে কেউ কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হলেও পরে সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন। তাদের একজন কৃষক মোহাম্মদ আমিন।
৭৪ বছর বয়সী আমিন পুল-ই-জিরি বান উপত্যকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, খননকাজ শুরুর আগে নদীতে গভীর ও পরিষ্কার পানি ছিল।
আমিন বলেন, এখন নদীর পানি পান করার উপযোগী নেই। এমনকি সেই পানি দিয়ে শরীরও ধোয়া যায় না।
কথা বলার সময় চোখে পানি চলে আসে তার। তিনি জানান, নদীর তীরের সব ঘাসও নষ্ট হয়ে গেছে। বাতাসে ধুলো ও মাটির কারণে এখন আর সেখানে চাষাবাদ করা সম্ভব নয়।
আগে যেখানে তিনি ৪০টি পর্যন্ত ছাগল পালন করতে পারতেন, এখন সেখানে সর্বোচ্চ ১৫টি ছাগল রাখতে পারেন।
আমিন জানান, একটি খনি কোম্পানির কাছে জমি ইজারা দেওয়ার জন্য ২০ হাজার ডলারে চুক্তি করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোম্পানিটি তাকে পুরো টাকা দেয়নি। জমির কাজ শেষ হওয়ার পর কৃষিজমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেনি।
খনি খাত সম্প্রসারণ করছে তালেবান
পাঁচ বছর আগে ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানের খনি খাত সম্প্রসারণে জোর দিয়েছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। দেশটির ভূগর্ভে থাকা বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে সরকারি আয় বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য।
বাদাখশানের খনি বিভাগের প্রধান আবদুল মতিন রহিমজাই বলেন, সেখানে প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০টি কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে। পাশাপাশি হাজারো মানুষ হাতে-কলমে খনির কাজে যুক্ত রয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর আফগানিস্তানে শত শত খনি চুক্তি হয়েছে। এ খাতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বছরে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।
কাজের আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিক
আমিনের গ্রামে খননকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও তার বাড়ি থেকে খুব দূরে গুলাক-দারা উপত্যকায় চলছে ব্যাপক খনন। সেখানে কয়েক ডজন খননযন্ত্র পাহাড়ের ঢাল কেটে সোনা খুঁজছে।
আফগানিস্তানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা এই অঞ্চলে ছুটে আসছেন।
কাবুলের বাসিন্দা ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ আগা খাজা খাইল পাঁচ বছর ধরে খনিতে কাজ করছেন। ট্রাকে মাটি ও খনিজ বোঝাই করার কাজ করে মাসে ১০ হাজার আফগানি বা প্রায় ১৫০ ডলার আয় করেন তিনি।
তিনি বলেন, কাবুলে কাজের সুযোগ খুব বেশি নেই। তাই অন্য যেকোনো কাজের চেয়ে এই কাজই তার কাছে ভালো।
জালালাবাদের বাসিন্দা শাফিউল্লাহ এহসাসও কাজের আশায় নিজের খননযন্ত্র নিয়ে বাদাখশানে এসেছেন। পাঁচ সন্তানের বাবা ৩২ বছর বয়সী এ ব্যক্তি প্রায় তিন মাস আগে কয়েক শ কিলোমিটার দূর থেকে তার যন্ত্রটি এখানে নিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, জালালাবাদে সোনা উত্তোলনের কাজ শুরু হয়নি। বাদাখশানে কাজ চলছিল বলে অন্য কোনো উপায় না থাকায় তিনি নিজের যন্ত্র নিয়ে এখানে চলে এসেছেন। এতে মাসে প্রায় ২৫ হাজার আফগানি আয় করছেন তিনি।
নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা
আফগানিস্তানের খনি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় এখন এই খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হামায়ুন আফগান বলেন, আগের সরকারের সময় খনিজ সম্পদ এলোমেলোভাবে উত্তোলন করা হতো। যথাযথ তদারকিও ছিল না।
তার ভাষ্য, দেশের উত্তরাঞ্চলে সোনা উত্তোলন দ্রুত বাড়ছে। প্রতিবেশী তাকহার প্রদেশেও খননকাজ চলছে। সেখানে একটি আফগান কোম্পানি চীনা অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।
আফগানিস্তান অ্যানালিস্টস নেটওয়ার্কের গবেষক ফাব্রিজিও ফোশিনি বলেন, আগের কয়েক দশকের যুদ্ধের সময় খনি থেকে পাওয়া সম্পদের বড় অংশই বিদ্রোহী গোষ্ঠী, তালেবান এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতে যেত।
বর্তমানে খনি কোম্পানিগুলোকে প্রতি হেক্টর জমির জন্য প্রতি মাসে ২০ গ্রাম সোনা কর হিসেবে দিতে হয়। চাইলে এর সমপরিমাণ অর্থও দেওয়া যায়। কোম্পানির লাভ কত—তার ওপর এই করের পরিমাণ নির্ভর করে না।
সোনা উঠলেও ধ্বংস হচ্ছে বসতি
প্রাদেশিক খনি বিভাগের প্রধান রহিমজাই জানান, গত বছর বাদাখশান সরকার ১১২ কেজি সোনা সংগ্রহ করেছে। খনিশ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি গ্রাম সোনার বিক্রিমূল্য ছিল প্রায় ১১৮ ডলার।
তবে গত বছর বেশির ভাগ খনি নিবন্ধিত ছিল না। ফলে সেসব খনি থেকে সরকার নিয়মিত ফি আদায় করতে পারেনি।
পরিবেশ ও মানুষের বসতির ক্ষতি করা প্রায় ২২৫টি খনি বন্ধের নির্দেশও দিয়েছেন রহিমজাই। এর মধ্যে শিওয়া এলাকার বেশ কিছু খনি রয়েছে।
তিনি বলেন, একটি এলাকায় আগে সেতু, দোকান ও স্কুল ছিল। কিন্তু বন্যার পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে সব চাপা পড়ে গেছে। পুরো এলাকাটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
রহিমজাই দুর্নীতির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার দাবি, বাদাখশানের খনিজ সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হবে এবং এর সুফল স্থানীয় মানুষও পাবে।
‘শুধু ক্ষমতাবানরাই লাভবান’
তবে বাদাখশানের সব এলাকা এখনো খননের কবলে পড়েনি। শিওয়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে কিছু পাহাড়ি এলাকা এখনো আগের মতোই রয়েছে।
সেখানে বসবাসকারী পশুপালক ফজিল চান, খননকারীরা যেন ওই এলাকায় না আসে। নিরাপত্তার কারণে তিনি শুধু নিজের প্রথম নাম জানিয়েছেন।
৪৫ বছর বয়সী ফজিল বলেন, এসব জায়গা মানুষের বেড়ানো, পশু চরানো এবং স্থানীয় জীবনের সঙ্গে জড়িত। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রতি গ্রীষ্মে নিজের পশুর পাল নিয়ে এসব পাহাড়ে আসেন।
তার অভিযোগ, সোনা উত্তোলনের এই কর্মকাণ্ড স্থানীয় মানুষের জন্য কোনো সুবিধা বয়ে আনছে না।
ফজিলের ভাষায়, এতে শুধু ক্ষমতাবানরাই লাভবান হচ্ছে।
আফগানিস্তানের সোনার খনি তাই একদিকে কর্মসংস্থান ও সরকারি আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কৃষিজমি, পানির উৎস, পশুচারণভূমি ও বসতি ধ্বংস করছে। সোনার সন্ধানে পাহাড় কাটা যত বাড়ছে, ততই বদলে যাচ্ছে বাদাখশানের মানুষের জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
সূত্র: এএফপি
এমএসএম
বিজ্ঞাপন