বিজ্ঞাপন
প্রতিপক্ষ যেই হোক! টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি যেকোনো সংস্করণেই ইতিহাস ও পরিসংখ্যান স্বাক্ষী- প্রতিপক্ষের ফ্রন্টলাইন বোলারদের চেয়ে মাঝারি ও সাধারণ মানের বোলারদের সবসময় অকাতরে বেশি উইকেট বিলিয়ে আসার রেকর্ড আছে বাংলাদেশের ব্যাটারদের।
শুনতে মন্দ লাগলেও কঠিন সত্য হলো, সেই স্বল্প পরিচিত এবং মাঝারি মানের কিংবা অতি সাধারণ বোলারদেরই সবচেয়ে ভালো বোলিংয়ের রেকর্ডটা বাংলাদেশের বিপক্ষেই ঢের বেশি।
খুব চাঁছাছোলা ভাষায় বললে বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে পচা শামুকে পা কাটার প্রবণতাটা মোটেই কম নয়। যা মেনে নিতে হলে খুব বেশি দূর পিছনে তাকাতে হবে না। অস্ট্রেলিয়ায় দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে মাঠে নামার আগে বাংলাদেশ দল যে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচটি খেললো সেখানেই টাইগারদের ব্যাটিং দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছেন এক অখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান পেসার। নাম ক্যাম্পবেল টম্পসন। একটি মাত্র প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা যার। বেশ কিছু দিন ইনজুরিতে থেকে উঠে আসা ২১ বছরের সেই দ্রুতগতির বোলার একাই টাইগার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামিয়েছেন। তার বলে নাকানিচুবানি খেয়ে আউট হয়েছেন বাংলাদেশের আট ব্যাটসম্যান। ২৫ রানে ৮ উইকেট দখল করলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস গুটিয়ে যায় মাত্র ৫৪ রানে।
আরও পড়ুন
২৩ বছর আগেও অস্ট্রেলিয়ায় জিতেছিল বাংলাদেশ, অথচ এবার ৫৪ রানে অলআউট!
প্রতিপক্ষের কোনো বোলার সফল হতেই পারে। তার দিনে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করে প্রতিপক্ষকে নাকানিচুবানি খাওয়াতেই পারেন। কিন্তু তারও একটা পূর্বশর্ত আছে। তার তো একজন মানসম্পন্ন বোলার হওয়া প্রয়োজন। এখন একটি মাত্র প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলে ২১ বছরের একজন বোলার যখন বাংলাদেশের ৮ ব্যাটারকে আউট করেন। এবং তার বোলিংয়ে যখন ৫৪ রানে ইনিংস শেষ হয়, তখন সেটা মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ শুরুর ঠিক আগে অখ্যাত, আনকোরা নবীন অজি বোলার ক্যাম্পবেল টম্পসনের জায়গায় যদি মিচেল স্টার্ক , হ্যাজেলউড আর কামিন্সের মতো একজন অমন দানবীয় বোলিং করতেন, তাহলে একটা কথা ছিল। সেটা না হয়ে একজন ২১ বছরের তরুণ, যিনি কখনো কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচই খেলেননি। সে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই যার আছে একটি মাত্র ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা। তার বলে কেন এক ইনিংসে ৮ জনকে আউট হতে হবে?
শুনে ও জেনে অবাক হবেন প্রতিপক্ষের ফ্রন্টলাইন বোলার ছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির অল্প পরিচিত ও আনকোরা বোলারদের অকাতরে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসায় জুড়ি নেই বাংলাদেশ ব্যাটারদের।
টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি তিন ফরম্যাটেই এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। প্রতিপক্ষের ফ্রন্টলাইন বোলার নন, হয় অনিয়মিত বোলার, নাহয় একদম পাঁচ বা ছয় নম্বর বোলার। কিন্তু তারই আছে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেরা বোলিংয়ের কৃতিত্ব।
যেমন টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে অজি বোলারদের সেরা বোলিং ফিগারটি গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, জেসন গিলেসপি, মিচেল স্টার্ক, হ্যাজেলউড, কামিন্স কিংবা শেন ওয়ার্নের দখলে নয়। সেটা আরেক লেগস্পিনার স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের (৮/১০৮)। একইভাবে ওয়ানডেতেও অষ্ট্রেলিয়ার কোন সুপ্রতিষ্ঠিত ও হাই কোয়ালিটি বোলার বাংলাদেশের বিপক্ষে ৬/৭ উইকেট পাননি কখনো। অজি বোলারদের মধ্যে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেরা বোলিং ফিগারটি এক সময়ের ব্যাটিং অলরাউন্ডার অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসের (৫/১৮) ।
টি টোয়েন্টি ফরম্যাটেও ভারতীয় ক্রিকেটার স্টুয়ার্ট বিনির আছে বাংলাদেশের বিপক্ষে এক অদ্ভুত বোলিং ফিগার! ৪ রানে ৬ উইকেট দখলের কৃতিত্ব আছে তার। সময়কাল ছিল ২০১৪। ঢাকার শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের এক লো-স্কোরিং ম্যাচে ভারতের চেঞ্জ বোলার হিসেবে বোলিং করতে এসে ৪.৪ ওভার বল করে মাত্র ৪ রানে বাংলাদেশের ৬ ব্যাটারকে আউট করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন ভারতের মিডিয়াম পেসার স্টুয়ার্ট বিনি।
ভাবুন একবার, কপিল দেব, শ্রীনাথ, জহির খান, মোহাম্মদ সামি, জসপ্রিত বুমরাহ, অনিল কুম্বলে আর হরভজন সিংয়ের মত বাঘা বাঘা বোলার নয়, মেধা , যোগ্যতা, মানে তাদের ধারে কাছের নন, সেই স্টুয়ার্ট বিনিকেই ওয়ানডেতে ৬ উইকেট দিয়ে বসে আছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা।
এর বাইরে বাংলাদেশের বিপক্ষে তুলনামূলক কম পরিচিতির একঝাঁক বোলারের ৫ বা তার অধিক উইকেট আছে। এর মধ্যে সবার আগে চলে আসবে আরেক ভারতীয় দিপক চাহারের নাম। ভারতের এ ডানহাতি জেন্টাল মিডিয়াম পেসার ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর কানপুরে বাংলাদেশের বিপক্ষে টি টোয়েন্টি ম্যাচে হ্যাট্ট্রিক সহ ৭ রানে ৬ উইকেটের পতন ঘটিয়ে আলোড়ন তোলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, টি-টোয়েন্টিতে সেটা শুধু কোন ভারতীয় বোলারের সেরা স্পেলই নয়। টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে আরেক টেস্ট খেলুড়ে দেশের বা আইসিসির পুর্ণাঙ্গ দেশের মধ্যেই সেরা বোলিং ফিগারও।
এর বাইরে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং অলরাউন্ডার পল কলিংউডের ও বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ৬ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব আছে। সেটা ২০০৫ সালের ২১ জুন। ট্রেন্টব্রিজে ন্যাটওয়েষ্ট ট্রফিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে একই ম্যাচে ক্যারিয়ার সেরা এবং ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স দেখান কলিংউড। অনবদ্য শতক উপহার (৮৬ বলে ১১২ রান) দেয়ার পাশাপাশি নিজের মিডিয়াম পেস দিয়ে ৩১ রানে বাংলাদেশের ৬ উইকেট দখল করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেন কলিংউড।
ইংলিশ বোলারদের মধ্যে ওয়ানডেতে যাদের উইকেট বেশি, সেই জেমস অ্যান্ডারসন, ডারেন গফ, আদিল রশিদ, স্টুয়ার্ট ব্রড, ক্রিস্টোফার রজার, ওক্স আর এন্ড্রু ফ্লিনটফকে টপকে বাংলাদেশের বিপক্ষে কলিংউডের ওই ৩১ রানে ৬ উইকেট পাওয়া স্পেলটি ইংলিশ বোলারদের মধ্যে ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সেরা বোলিং নৈপুণ্য।
এর বাইরে আরও একটি বোলিং নৈপুণ্যের ঘটনা আছে বাংলাদেশের বিপক্ষে। সেটা বর্তমান প্রজন্মর জানা নেই। এমনকি ক্রিকইনফো, ক্রিকবাজের মত বিশ্বমানের ওয়েবসাইটেও পাওয়া দুষ্কর।
সেটা ১৯৮৬ সালের ঘটনা। সেবার পাকিস্তানের বিশ্বখ্যাত ধারাভাষ্যকার ওমর কোরেশির নামে ওমর কোরেশি একাদশ খেলতে এসেছিল বাংলাদেশে। ওমর কোরেশি একাদশ নাম শুনে ভাববেন না সেটা কোন ‘অ্যামেচার দল।’ নাহ সেটা ছিল পুরোদস্তু পাকিস্তান দল।
ইমরান খানের নেতৃত্বে সেই দলের ব্যাটিং লাইন ছিল রমিজ রাজা, শোয়েব মোহাম্মদ, মনসুর আখতার, সেলিম মালিকদের মত নামী ব্যাটারে সাজানো। আর বোলিং ডিপার্টমেন্ট ছিল চার দ্রুতগতির বোলার ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, মহসিন কামাল আর জাকির খান ও লেগস্পিনার আব্দুল কাদিরে গড়া।
ঢাকা স্টেডিয়ামে হওয়া সেই ম্যাচে ওমর কোরেশি একাদশের প্রথম ইনিংসে তোলা ৪০৮ (৮ উইকেটে ডিক্লেয়ার) রানের জবাবে প্রথম ইনিংসে ১৮৯ রান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৪৮ রানে অলআউট হয় বিসিবি একাদশনামী বাংলাদেশ জাতীয় দল। পাকিস্তান ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের দুই অন্যতম সেরা পেস বোলার ওয়াসিম আকরাম আর ইমরান খান নন। তাদের টপকে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটাররা নাকানিচুবানি খান মহসনি কামালের বলে।
পরবর্তীতে বাংলাদেশের কোচ হয়ে আসা মহসিন কামাল হ্যাটট্রিকসহ মাত্র ২৬ রানে ৬ উইকেটের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে মাত্র ৪৮ রানে অলআউট করে দেন। তৃতীয় ও শেষ দিন লাঞ্চের পরে ব্যাটিংয়ে নেমে দুই ঘন্টার মধ্যে অলআউট হয়ে যায় বিসিবি মোড়কে অংশ নেয়া বাংলাদেশ জাতীয় দল।
কি আশ্চর্য! তিনদিন আগে অস্ট্রেলিয়ায় ৩ দিনের প্র্যাকটিস ম্যাচে ক্রিকেট অষ্ট্রেলিয়ার অখ্যাত ফাষ্টবোলার ক্যাম্পবেল টম্পসন ২৫ রানে ৮ উইকেটের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে ৫৪ রানে অলআউট করে দেন। ম্যাচে ইনিংস ও ৩৮ রানে হার মানে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
ওপরের তথ্য উপাত্ত ও পরিসংখ্যান সাক্ষী দিচ্ছে সেই টেস্ট মর্যাদা পাবার আগে থেকে এখন পর্যন্ত তুলনামূলক কম পরিচিতি ও মাঝারি মানের বোলারদের বোলিংয়েই বারবার নাকানিচুবানি খেয়েছে এবং খাচ্ছে বাংলাদেশ।
কেন এমনটা ঘটছে? খুঁজে বের করা দরকার।
আরও পড়ুন
মাত্র ৫৪ রানে অলআউট, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাস্তবতা টের পেলো বাংলাদেশ
টেকনিক, ব্যাটিং শৈলিতে ঘাটতি থাকলে তো প্রতিপক্ষের প্রথমসারির বোলারদের বলেই খাবি খাবার কথা। কিন্তু ইতিহাস জানাচ্ছে তা হয়েছে কম। দেখা যাচ্ছে প্রতিপক্ষের বিশ্বমানের বোলারদের খেলে সাধারণ মানের বোলারদের অযথা ও অকারণে একের পর এক উইকেট দিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। সেটা যে মনোযোগ ও মনোসংযোগে ঘাটতির কারণেই হয়েছে, তা কি ভেঙে বলার দরকার আছে?
দীর্ঘদিন বিদেশের হাই প্রোফাইল হেড কোচ ও নামিদামি ব্যাটিং কোচরা কাজ করেছেন। বারবার কেন প্রতিপক্ষর দ্বিতীয়সারির ও সাধারণ মানের বোলারদের বলে বিপর্যয় ঘটছে? কেনই বা বার বার পচা শামুকে পা কাটছে? তার কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকারের এখনই সময়। প্রধান কোচ ফিল সিমন্স ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সোনালি সময়ের অন্যতম ব্যাটার হিসেবে খেলেছেন। বর্তমান ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলও দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সব সময়ের অন্যতম দক্ষ ব্যাটার। তারা কি এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন না? প্রশ্নটা থেকেই যায়।
এআরবি/আইএন
বিজ্ঞাপন