বিজ্ঞাপন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার বাংলাদেশের মতো নিম্নদক্ষ অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী এআই সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
সোমবার (১০ আগস্ট) ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জ্যঁ লুই আরকাঁ। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘এআই, উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা ও শ্রম পুনর্বণ্টন’ শীর্ষক পাবলিক লেকচারে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকায় সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এই পাবলিক লেকচারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান।
বাংলা ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষায় এআই মডেলের ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক জ্যঁ লুই আরকাঁ বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ শক্তিশালী মডেলে ইংরেজি ও কয়েকটি প্রভাবশালী ভাষার আধিপত্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী এআই সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
বিদেশি এআই মডেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
আরও পড়ুন
হিলিয়াম ডিপ্লোমেসি / এআই বিপ্লবের টিকি বাঁধা মধ্যপ্রাচ্যের অদৃশ্য গ্যাসে!
অধ্যাপক আরকাঁ বলেন, এআই কিছু ক্ষেত্রে শ্রমকে প্রতিস্থাপন করলেও এর প্রভাব শুধু কর্মসংস্থান কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কাজের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন কাজ ও শ্রমের চাহিদা তৈরি করতে পারে। সামগ্রিকভাবে এআইয়ের প্রভাব ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
পাশাপাশি এআই ডেটা সেন্টার ব্যবহারে পরিবেশেত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে- সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত উচ্চদক্ষ অর্থনীতির তুলনায় নিম্নদক্ষ অর্থনীতিগুলো এআই থেকে বেশি লাভবান হতে পারে। যেসব খাতে উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম, সেসব খাতে এআই গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, একটি প্রতিষ্ঠানে এআই ব্যবহারের ফলে কিছু কাজের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কাজ আরও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে। ফলে এসব কাজে শ্রমের চাহিদা বাড়তে পারে। অর্থাৎ এআই শ্রমকে প্রতিস্থাপন করলেও পুরোপুরি শ্রমের প্রয়োজনীয়তা শেষ করে দেবে— এমন ধারণা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, এআইয়ের কারণে কাজের ধরনে পরিবর্তন আসবে এবং শ্রমকে নতুন নতুন কাজে পুনর্বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের জন্য এআইয়ের অন্যতম বড় সম্ভাবনা হিসেবে কোডিং ও সফটওয়্যার খাতের কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক আরকাঁ।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে কোডিং ও প্রোগ্রামিংয়ে ভারত বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতের আইআইটি থেকে আসা দক্ষ কোডাররা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
আরও পড়ুন
এআইয়ের সুফল লুফে না নিলে উন্নয়নশীল দেশগুলো পিছিয়ে পড়বে: বিশ্বব্যাংক
অধ্যাপক আরকাঁ বলেন, এআইয়ের কারণে পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোড রাইটিংসহ বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহারের মাধ্যমে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও এখন ভালো মানের কোড তৈরি করতে পারছেন। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য প্রযুক্তিখাতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার বা ‘লিপফ্রগ’ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, গবেষণার মডেল অনুযায়ী, কোনো কাজে দক্ষতা বা সফলতার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলে এআই সেই কাজের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বেশি কার্যকর হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশের কোডিং খাতে এআই বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারে।
তৈরি পোশাক খাতে অটোমেশন, রোবট নিয়ে প্রচলিত উদ্বেগের প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক আরকাঁ বলেন, স্বয়ংক্রিয়করণের ফলে ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি হবে—এমন ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার পুরোপুরি মিল নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, অটোমেশন অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে বিভিন্ন কাজের মধ্যে শ্রম পুনর্বণ্টন করে এবং নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করে। ফলে প্রযুক্তির প্রভাবকে শুধু চাকরি কমে যাওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। তবে বিশ্বব্যাপী এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কীভাবে বদলাবে, সেটি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, অধ্যাপক আরকাঁর ভাবনা হচ্ছে এআইকে যদি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো যায়; যে কাজটা সবচেয়ে কঠিন সেখানে যদি এআই আনা যায়, তাহলে কি এআই সব কাজ নিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যে এআই চাকরি প্রতিস্থাপন করবে। তবে আরকাঁ বলছেন, দুর্বল বা সহজ কাজে এআই আসলে সেখানে হয়তো চাকরি কমাচ্ছে। কিন্তু এটা যেহেতু অন্যান্য জায়গায় উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে; সেখানে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে। এআই চাকরি প্রতিস্থাপন না-ও করতে পারে। অন্য জায়গায় কাজের সুযোগ বাড়াবে।
এসএম/কেএসআর
বিজ্ঞাপন