বিজ্ঞাপন
ঋণের বোঝা ৭০৪ কোটি টাকা
সুদেই যাচ্ছে বছরে কোটি কোটি টাকা
কমেছে আখচাষির সংখ্যা
বিকল্প পণ্য উৎপাদনে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা
একসময় হাজারো আখ চাষির পদচারণায় মুখর থাকত জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেড। দেশের অন্যতম উৎকৃষ্ট মানের চিনি উৎপাদনকারী এ প্রতিষ্ঠানটির আখ থেকে চিনি আহরণের হারও তুলনামূলক বেশি। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের ঋণ ও তার সুদের বোঝায় আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মিলটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০৪ কোটি ৭ লাখ টাকার বেশি।
মিল থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের জুনে জিল বাংলা চিনিকলের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। চার বছরের ব্যবধানে সুদসহ সেই ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০৪ কোটি ৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৫৪ কোটি টাকা।
শুধু ঋণের পরিমাণই নয়, প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। মিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসেই ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ফলে উৎপাদন থেকে আয় হলেও তার বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।
উৎপাদন ভালো, তবু কাটছে না আর্থিক সংকট
জিল বাংলা চিনিকলের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো আখ থেকে চিনি আহরণের হার। দেশের অন্যান্য চিনিকলের তুলনায় এ মিলে আখ থেকে চিনি আহরণের হার তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছে মিল কর্তৃপক্ষ।
২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে মাত্র ৭৮ দিনে ৭০ হাজার টনের বেশি আখ মাড়াই করে প্রায় ৪ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা একেবারে হারিয়ে যায়নি। পর্যাপ্ত আখ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঋণ ও তার সুদ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আরও পড়ুন
বছরে গচ্চা ৩ কোটি / বন্ধ চিনিকলে খোশগল্পে কাটে সময়, নষ্ট হচ্ছে শত কোটির যন্ত্রপাতি
মিল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো ঋণের ওপর প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ সুদ যোগ হচ্ছে, সেটিই এখন প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ। ঋণের সুদের বোঝা কমানো না গেলে উৎপাদন বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত লাভ করা কঠিন।
জানা গেছে, ২০২১ সালের জুনে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটি চলছিল, চার বছর পর সেই ঋণ বেড়ে ৭০৪ কোটি ৭ লাখ টাকার বেশি হয়েছে। ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সুদের চাপও। মিল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালের জুন মাসে প্রায় ৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে। এতে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটির আয় থেকে বড় একটি অংশ উৎপাদন সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়নের পরিবর্তে চলে যাচ্ছে পুরোনো ঋণের সুদ মেটাতে।
কর্তৃপক্ষের মতে, পুঞ্জীভূত ঋণের সুদের একটি বড় অংশ মওকুফ করা হলে মিলটির লোকসান প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
কমেছে আখচাষির সংখ্যা
মিলের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি বড় সংকট তৈরি হয়েছে কাঁচামাল আখ নিয়ে। একসময় জিল বাংলা চিনিকলের কমান্ড এরিয়ায় প্রায় ১১ হাজার আখচাষি থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারে।
পুঁজি সংকট, মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চাষিদের সমন্বয়হীনতা, আখ চাষে তুলনামূলক বেশি সময় লাগা এবং নানা জটিলতার কারণে কৃষকদের মধ্যে আখ চাষের আগ্রহ কমেছে বলে জানা গেছে। ফলে একদিকে কমছে আখচাষির সংখ্যা, অন্যদিকে কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে চিনিকলের উৎপাদন ব্যবস্থায়।
আরও পড়ুন
থামছেই না লোকসান, অস্তিত্ব সংকটে নর্থ বেঙ্গল ও নাটোর সুগার মিল
মেলমগঞ্জ এলাকার কৃষক মোরাদুজ্জামান ভেদু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে আমাদের এলাকায় অনেক কৃষক আখ চাষ করতেন। এখন আগের মতো কেউ আখ করতে চায় না। আখের পেছনে টাকা খরচ হয়, আবার মিল থেকে সময়মতো সুযোগ-সুবিধা না পেলে কৃষকের কষ্ট আরও বাড়ে। তাই অনেকেই এখন অন্য ফসল করে। মিলটা যদি কৃষকদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আবার আখ চাষ বাড়ানো সম্ভব।’
চর আমখাওয়া এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আখ চাষ করতে সময় বেশি লাগে। জমিতে অনেকদিন আখ থাকে। এই সময়ে অন্য ফসল করলে কৃষক দ্রুত টাকা পায়। তাই অনেকে আখ ছেড়ে অন্য ফসল করছে। মিল যদি কৃষকদের সুবিধা বাড়ায় আর সময়মতো আখের টাকা দেয়, তাহলে আমরা আবার আখ চাষে আগ্রহী হব।’
শুধু চিনি নয়, বিকল্প পণ্য উৎপাদনের তাগিদ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু চিনি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে আখ থেকে চিনি উৎপাদনের পর পাওয়া উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট কাজে লাগিয়ে বিকল্প পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কমবে, অন্যদিকে বাড়বে অতিরিক্ত রাজস্ব। দীর্ঘদিনের লোকসান কাটিয়ে মিলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর জন্য প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আখ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
আরও পড়ুন
কেরু অ্যান্ড কোম্পানি / রেকর্ড মুনাফার আড়ালে শুভঙ্করের ফাঁকি, ১০ হাজার বিঘা জমির দাম ৫ লাখ!
মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, ঋণের সুদের বড় একটি অংশ মওকুফ করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে আখ সরবরাহ বাড়ানো এবং বিকল্প পণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা গেলে ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত লোকসানও কমানো সম্ভব।
অন্যদিকে আখচাষিরা বলছেন, মিলকে বাঁচাতে হলে শুধু ঋণের বোঝা কমালেই হবে না; কৃষকদেরও আস্থায় নিতে হবে। সময়মতো আখের মূল্য পরিশোধ, কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, মিলের চাকা সচল রাখতে যেমন অর্থের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পর্যাপ্ত আখ। আর সেই আখের জোগানদাতা কৃষকরাই যদি চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে বড় ঋণের বোঝা নিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
লাভজনক করার পরিকল্পনা
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের পক্ষ থেকে জিল বাংলা চিনিকলকে লাভজনক করার জন্য বিকল্প পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নতুন ইউনিট চালু করে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুরোনো ঋণের সুদের চাপ কমানো, আখচাষির সংখ্যা বাড়ানো, পর্যাপ্ত আখ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং চিনি ছাড়াও বিকল্প পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে জিল বাংলা চিনিকল আবারও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
আরও পড়ুন
বন্ধ চিনিকলে মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা
তবে ৭০৪ কোটি টাকার বেশি পুঞ্জীভূত ঋণের বোঝা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি ঋণ ও সুদের এই চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে লোকসানের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফেরদৌসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, এই পুঞ্জীভূত লোকসান কমানোর জন্য আমরা সরকারকে বিভিন্নভাবে অবগত করেছি। মূলত মিলে আখ সরবরাহ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি আখ দিয়ে বিকল্প কোনো পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে এই পুঞ্জীভূত লোকসান কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন
চিনিকলে ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ যুক্তরাজ্যের
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের পরিচালক ও যুগ্ম সচিব ড. আব্দুল আলীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কেরুর অধীনে আমরা যদি আরেকটি ইউনিট চালু করতে পারি এবং সেই লিকার তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে আমাদের পরিকল্পনা আছে এটি বিদেশে রপ্তানি করার। দেশীয় বাজারে বিক্রি না করে বিদেশে রপ্তানি করা গেলে এটিকে লাভজনক করা সম্ভব।’
হৃদয় আহম্মেদ/কেএইচকে/এএসএম
বিজ্ঞাপন