বিজ্ঞাপন
উদয় রহমান
ক্রোয়েশিয়ার ছোট্ট মিডিভাল শহর। যেটাকে অনেকে কিংস ল্যান্ডিং নামেও চেনেন। তার আসল নাম ডুব্রোভনিক। এ শহরের পাশে ছোট্ট একটি দ্বীপ আছে, লোকরুম। পনেরো মিনিটের নৌকা ভ্রমণে পৌঁছে গেলাম। আর নেমে মনে হলো, টাইম মেশিন থেকে নামলাম। মধ্যযুগ চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে, পাথরের গায়ে, পুরোনো মঠের ভাঙা খিলানে।
গেম অব থ্রোনসের ভক্তরা হয়তো জায়গাটি চেনেন। খালিসির কার্থ শহরের দৃশ্যগুলো এখানেই শুট হয়েছিল। আর দ্বীপের ভেতরে আসল আয়রন থ্রোনের একটা রেপ্লিকাও বসানো আছে। ভক্ত হিসেবে আমি বেশ উত্তেজিত হয়েই গিয়েছিলাম, প্রিয় টিভি সিরিজের লোকেশন দেখব বলে।
গিয়ে আবিষ্কার করলাম, স্ক্রিনের সেটটা এই দ্বীপের সৌন্দর্যের তুলনায় কিছুই না।
নুড়িপাথরের সৈকত, বিশাল বিশাল পাথরে আছড়ে পড়া ঢেউ। আর সেই ঢেউয়ের শব্দের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধরনের শান্তি। পুরো দ্বীপজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ময়ূর। মানুষ দেখে পালায় না, কারণ পালানোর প্রশ্নই নেই। জায়গাটা ওদের। আমরা অতিথি। ওরা নিজেদের মতো করে এগিয়ে আসে, পাশে পাশে হাঁটে, যেন বলছে, ‘আসছো যখন, ঘুরে দেখো, খালি মনে রেখো বাড়িটা কার।’
আমরা যে জলপাই বাগানটায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, সেখানে স্কুলের ক্লাসরুমের মতো একটা জায়গা পাই। সেখানের বেঞ্চিতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসলে একটা ময়ূরও এসে আমাদের সাথে বিশ্রাম নেয়। কিছুক্ষণ আলাপ করে।
দ্বীপটির একটি পুরোনো গল্প আছে। শত শত বছর এখানে ছিল বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসীরা। তাদের যখন জোর করে উচ্ছেদ করা হয়, শেষরাতে তারা নাকি মোমবাতি উল্টা করে ধরে পুরো দ্বীপ প্রদক্ষিণ করেছিল, আর বলে গিয়েছিল, ‘এই দ্বীপ নিজের ভোগের জন্য যে দাবি করবে, সে সুখী হবে না।’
এরপর যারাই দ্বীপটার মালিক হতে চেয়েছে, ইতিহাস তাদের সাথে সদয় হয়নি। স্থানীয়রা এবং ট্যুরিস্টরা কেউই আজও সন্ধ্যার পরে এই দ্বীপে থাকে না।
গল্পটি সত্য না মিথ্যা, সেই তর্কে যাব না। মানুষের বানানো লোহার সিংহাসনটা ঘরের কোণায় খালি পড়ে আছে, পর্যটকেরা দুই মিনিট বসে ছবি তুলে চলে যায়। আর বাইরে ময়ূরগুলো মাথায় মুকুট নিয়ে সারা দিনরাত এই দ্বীপে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে। যে সিংহাসনের জন্য সিরিজে এত রক্ত, যুদ্ধ সেটা এখন শুধু ফটো বুথ। আর যারা কোনোদিন সিংহাসন চায়নি, এই দ্বীপটি তাদেরই রাজত্ব।
কিছু জায়গার মালিক হওয়া যায় না। খালি মেহমান হওয়া যায়।
লেখক: শব্দ প্রকৌশলী ও গল্পকার।
এসইউ
বিজ্ঞাপন