বিজ্ঞাপন
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার ফলাফলে ভয়াবহ ধস নেমেছে। বিগত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে শিক্ষার্থীরা। এ নিম্নমুখী ফলের নেপথ্যে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিতের দুর্বলতা সামনে এসেছে। ফেল করা অধিকাংশ পরীক্ষার্থীই এ দুটি বিষয়ে খারাপ ফল করেছে।
শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিত ভীতির কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গণিত ও ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের অধিকাংশ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নয়।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষকরা ক্লাসে বছরের পর বছর বিশেষায়িত এ দুটি বিষয় পড়াচ্ছেন। অথচ এ দুটি বিষয়ই অনুশীলনমূলক। কিন্তু গণিত ও ইংরেজির মতো বিষয় দুটিও শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে পাবলিক পরীক্ষায় পার হওয়ার চেষ্টা করে হোঁচট খাচ্ছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়গুলোতে গণিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭ জন। এর মধ্যে গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ছাড়াই শিক্ষার্থীদের বিষয়টি শেখাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক।
একই চিত্র দেখা গেছে ইংরেজি বিষয়ের ক্ষেত্রেও। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট ইংরেজি শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের মধ্যে ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মাত্র ৯ হাজার ৩৭৬ জন, শতাংশের হিসাবে যা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো- বর্তমানে স্কুলে যারা ইংরেজি পড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের অন্য বিষয়ে ডিগ্রিধারী।
খোদ রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্লাসে শিক্ষকরা গণিত অনুশীলন কম করান। অধিকাংশ শিক্ষকই অনেকটা মুখস্থ করানোর মতো করে গণিত শেখান।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রধান শিক্ষক জানান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে বাংলার শিক্ষককে ইংরেজি ক্লাসে পাঠাতে হচ্ছে। আবার ইসলাম শিক্ষার শিক্ষকও গণিত পড়াচ্ছেন। ভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের অধিকাংশের কাছে গণিত দুর্বোধ্য। তাদের গণিত শেখানোর পদ্ধতিও মুখস্থনির্ভর। শিক্ষার্থীরা মুখস্থ শেখা গণিতের থেকে পরীক্ষায় কিছুটা হেরফের করে প্রশ্ন আসলেই ভুল করে বসে। আর উত্তর মেলাতে পারে না।
ইংরেজিতে বেশিরভাগ বোর্ডে পাস কম
ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ বোর্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পাসের হার কম ময়মনসিংহ বোর্ডে। এ বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে মাত্র ৬৬.৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। গণিতে পাস করেছে ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, ফলাফলের তলানিতে থাকা ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে প্রতি ১০০ জনে ৩৩ জন ফেল করেছে। আর গণিতে প্রতি ১০০ জনে ৩০ জন ফেল করেছে।
আরও পড়ুন
ভিকারুননিসায় এসএসসিতে ফেল ৪৩ ছাত্রী
শুধু ময়মনসিংহ নয়, ইংরেজিতে ৭০ শতাংশের নিচে পাসের হার বরিশাল ও সিলেট বোর্ডেও। বরিশাল বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৬৯ দশমিক ২৪ শতাংশ, সিলেটে ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ। ইংরেজিতে ৭০ শতাংশ পাসের হার রয়েছে আরও ছয়টি বোর্ডে। সেগুলো হলো- যশোরে ইংরেজিতে পাস ৭১ দশমিক ৮৪ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৭২ দশমিক ২৭ শতাংশ, রাজশাহীতে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, ঢাকা বোর্ডে ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং মাদরাসা বোর্ডে ৭৯ দশমিক ২১ শতাংশ।
ইংরেজি বিষয়ে ৮০ শতাংশের ওপরে (যা মোটামুটি সন্তোষজনক ধরা হয়) পাসের হার রয়েছে শুধু কুমিল্লা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। কুমিল্লা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং কারিগরিতে ৯৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।
গণিতেও লেজেগোবরে অধিকাংশ বোর্ড
ময়মনসিংহ ও মাদরাসা বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৬৯ শতাংশের ঘরে। আরও পাঁচ বোর্ডে পাসের হার সত্তর শতাংশের ঘরে। সেগুলো হলো- কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে গণিতে পাস ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ, দিনাজপুরে ৭১ দশমিক ০৫ শতাংশ, সিলেটে ৭৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ৭৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, বরিশালে ৭৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। গণিতে ৮০ শতাংশের (মোটামুটি সন্তোষজনক বিবেচিত) ওপরে পাস করেছে ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, চট্টগ্রাম বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ কারণে এ বোর্ডগুলোর পাসের হার তুলনামূলক ভালো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক আব্দুল হালিম বলেন, বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের এ সংকট দীর্ঘদিনের। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি স্কুলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। সরকার উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারে না। এ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। কীভাবে দক্ষ শিক্ষকদের পেশায় আনতে হবে, সে ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষক সংকট প্রকট। বিশেষ করে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। আবার গ্রামের শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবে খুবই অসচ্ছল। তারা চাইলেও কোচিং-প্রাইভেটে যেতে পারে। ফলে তাদের ফলও খারাপ হচ্ছে। গ্রাম ও শহরের বৈষম্যও এখানে বিদ্যমান। শিক্ষক সংকট কাটিয়ে ওঠা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং বৈষম্য কমাতে পারলে ফেল ও খারাপ ফলাফলের প্রবণতা কমবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি- দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানেই বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট রয়েছে। খুব শিগগির সরকারি স্কুলে শূন্যপদগুলো যাচাই করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলমান। কোথায়, কতজন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পদ শূন্য আছে, তার তালিকা করে পর্যায়ক্রমে সেসব পদ পূরণে চেষ্টা করছে সরকার। এ কাজে কিছুটা সময় লাগবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সচেষ্ট, দ্রুতই সংকট কাটাতে কাজ চলছে।’
এএএইচ/এমআরএম
বিজ্ঞাপন