বিজ্ঞাপন
চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের বাইসাইকেল শিল্প। রপ্তানিতে অবদান রাখা এ শিল্পের উচ্চমূল্যের কাঁচামাল এখনো আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে ফ্রি-হুইল আমদানিতে বাড়ানো হয়েছে শুল্ক। দাম বাড়ায় কমছে বিক্রি। রপ্তানিও নানান কারণে খুব সুখকর অবস্থানে নেই।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও রাবারসহ সাইকেল তৈরির বিভিন্ন উপাদানের আন্তর্জাতিক বাজারদর এখন তুলনামূলক বেশি। এর বাইরে ফ্রি-হুইল, গিয়ার, চেইন সেট, হাব, ব্রেক সেট, বিয়ারিং ও মানসম্মত অ্যালয় ফ্রেমের অনেক উপাদানও আমদানি করতে হয়।
আর বাইসাইকেল শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে উচ্চমূল্যের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের এই আমদানিনির্ভরতা। চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতের উৎপাদকরা কম দামে ও কম সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সাইকেল রপ্তানি করায় বাংলাদেশের সাইকেল রপ্তানিতে তা প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
একই সঙ্গে সাইকেল রপ্তানিতে ইউরোপনির্ভরতাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশীয় সাইকেল শিল্প।
জানতে চাইলে বাইসাইকেল শিল্পের নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বাংলাদেশ বাইসাইকেল ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিবিপিএমইএ) মহাসচিব ও মেঘনা গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. লুৎফুল বারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের সাইকেল শিল্প এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশে সাইকেলের বিক্রি আগের চেয়ে কমেছে। চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারতের উৎপাদকরা কম দামে এবং দ্রুত সরবরাহ করতে পারায় রপ্তানি বাজারে বাড়ছে প্রতিযোগিতা।’
সাইকেল শিল্পের কাঁচামালে বিশেষত স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, রাবার ও বিভিন্ন কম্পোনেন্টের আন্তর্জাতিক বাজারদর এখনো তুলনামূলক বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উচ্চ সুদের হার ও অর্থায়ন সংকটের কারণে কার্যকর মূলধন সংগ্রহ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। পরিবহন ব্যয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা প্রভাব ফেলছে রপ্তানিতে।’
আরও পড়ুন
বাড়তে পারে বাইসাইকেলের দাম
সাইকেল শিল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট এখনো আমদানিনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমানো কঠিন জানিয়ে বলেন, ‘কোভিড-পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় অতিরিক্ত মজুতের কারণে নতুন অর্ডার আগের তুলনায় কম এসেছে।’
সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয়, দেশে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখের মতো বাইসাইকেল চলে। গবেষণা ও শহর পরিকল্পনার কিছু তথ্য অনুসারে, ঢাকা শহরে প্রায় দুই লাখ সাইকেল রয়েছে। মোট যানবাহনের তুলনায় এ সংখ্যা নগণ্য হলেও বর্তমানে ঢাকা শহরে পরিবেশবান্ধব দ্বিচক্রযানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
এখন বাসা থেকে অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করেন হাজারো সাইক্লিস্ট। পার্সেল পরিবহনেও সাইকেল এখন জনপ্রিয় বাহন। শহরের রাস্তায় প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে বাইসাইকেল।
সাইকেলের বাজার প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার
দেশে সাইকেলের বাজার নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশীয় বাজারের আকার আনুমানিক এক হাজার ৫শ থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। শুধু দেশ নয়, বিদেশে রপ্তানিও হয় বাংলাদেশি সাইকেল। রপ্তানিসহ এ বাজারের আকার প্রায় দুই হাজার ৫শ কোটি টাকা বলে মনে করেন কেউ কেউ।
দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ ইউনিট, যদিও প্রকৃত উৎপাদন অর্ডার ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে। বাংলাদেশের বড় উৎপাদকরা দেশীয় বাজারের পাশাপাশি ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কিছুটা কম থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না, তবে বাজার স্বাভাবিক হলে উৎপাদন ও রপ্তানি উভয়ই বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতাই সাইকেল শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের বাইসাইকেল শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চমূল্যের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে আমদানিনির্ভরতা। ডলারের বিনিময় হার, এলসি খোলার জটিলতা ও আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন
বাজারে এলো প্রথম দেশি ই-বাইক আরএফএলের ‘দুরন্ত’
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের কম্পোনেন্ট তৈরির প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতি, অটোমেশনে বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়, দক্ষ ওয়েল্ডার ও টেকনিশিয়ানের অভাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক মান পরীক্ষার পর্যাপ্ত ল্যাব না থাকা শিল্পটির বড় প্রতিবন্ধকতা।
ফ্রি-হুইলের শুল্কে দাম কতটা বাড়লো
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বাইসাইকেলের ফ্রি-হুইল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি আরোপ করেছে। সরকারের উদ্দেশ্য দেশি ফ্রি-হুইল উৎপাদকদের সুরক্ষা দেওয়া।
বাজেটে শুল্ক বাড়ানোয় সব ধরনের সাইকেলের দাম বেড়েছে। ছোট সাইকেলের দাম বেড়েছে ১২শ থেকে ১৫শ টাকা। বড় সাইকেলের দাম বেড়েছে প্রায় দুই হাজার টাকা।-সাইকেল স্টোরের মালিক আশফাকুল ইসলাম জিশান
পুরান ঢাকার বংশালের কাজী আলাউদ্দিন রোডের জোনাকী সাইকেল স্টোরের মালিক আশফাকুল ইসলাম জিশান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজেটে শুল্ক বাড়ানোয় সব ধরনের সাইকেলের দাম বেড়েছে। ছোট সাইকেলের দাম বেড়েছে ১২শ থেকে ১৫শ টাকা। বড় সাইকেলের দাম বেড়েছে প্রায় দুই হাজার টাকা।’
বাজার ধস নেমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিক্রি এখন খুবই খারাপ। ক্রেতাদের কাছে দাম চাইতেও এখন লজ্জা লাগে। কারণ কয়েক মাস কিংবা দুই সপ্তাহ আগে নিলাম, এখন এত দাম বেশি। ভালোর মধ্যে ছোট সাইকেল এখন ৮ হাজার টাকার নিচে নেই।’
সাদ সাইকেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. সাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে সাইকেলের বাজারের অবস্থা সবার জন্য একরকম না। কারও ভালো যাচ্ছে, আবার কারও খারাপ যাচ্ছে। বিশেষ করে সাধারণ দোকানগুলোতে ব্যবসা কিছুটা খারাপ যাচ্ছে, যদিও ভিআইপি সাইডে কিছুটা ভালো আছে। তবে সব মিলিয়ে আগের তুলনায় ব্যবসা ডাউন।’
তিনি বলেন, ‘সাইকেলের দাম অনেক বেড়েছে, ধারণার বাইরে বেড়েছে। আগে প্রতি কেজিতে ডিউটি ছিল ২ ডলার, এখন সেটা ৩ ডলার হয়েছে। অর্থাৎ ডিউটি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে একটি সাইকেলের দাম স্বাভাবিকভাবেই প্রায় ১৩শ থেকে ১৪শ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।’
এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘একটি ৬ হাজার টাকার সাইকেল যখন ৭ হাজার বা ৮ হাজার টাকায় চলে যায়, তখন যেসব মধ্যবিত্ত মানুষ সাইকেল কিনতে আসেন, তাদের জন্য বিষয়টি খুবই অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে। ছোট সাইকেলের দাম প্রায় দেড় থেকে ২ হাজার টাকা বেড়েছে। আর বড় সাইকেলের দাম বেড়েছে প্রায় আড়াই হাজার টাকা।’
আরও পড়ুন
বায়ুদূষণ সচেতনতায় স্বীকৃতি পেলো দুরন্ত বাইসাইকেলের ‘বিষবায়ু’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বাইসাইকেল ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিবিপিএমইএ) মহাসচিব এবং মেঘনা গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. লুৎফুল বারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো আমদানি করা ফ্রি-হুইলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ফলে সাধারণ সাইকেলের খুচরা দাম প্রতি সাইকেলে কয়েকশ থেকে এক হাজার টাকার মতো বাড়তে পারে, যা নির্ভর করবে মডেল ও ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের ওপর।’
পুরোনো মজুত শেষ হয়ে নতুন শুল্কে আমদানি করা পণ্য বাজারে এলে প্রভাব বেশি বোঝা যাবে। একটি আমদানি করা ফ্রি-হুইলের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৫শ থেকে ১৫শ টাকা হলে অতিরিক্ত শুল্ক, ভ্যাটের ধারাবাহিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক মার্জিন মিলিয়ে এর খরচ প্রায় একশ থেকে ৩শ টাকা বাড়তে পারে।-দূরন্ত বাইসাইকেলের ডিজিএম (মার্কেটিং) মো. শরীফুল ইসলাম
তবে স্বল্পমেয়াদে ভোক্তারা মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনুভব করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশি ফ্রি-হুইল উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দেবে এবং স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রাণ আরএফএল গ্রুপের দূরন্ত বাইসাইকেলের ডিজিএম (মার্কেটিং) মো. শরীফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরোনো মজুত শেষ হয়ে নতুন শুল্কে আমদানি করা পণ্য বাজারে এলে প্রভাব বেশি বোঝা যাবে। একটি আমদানি করা ফ্রি-হুইলের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৫শ থেকে ১৫শ টাকা হলে অতিরিক্ত শুল্ক, ভ্যাটের ধারাবাহিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক মার্জিন মিলিয়ে এর খরচ প্রায় একশ থেকে ৩শ টাকা বাড়তে পারে।’
পুরো ব্যয় ক্রেতার ওপর চাপানো হলে সাধারণ সাইকেলের দাম আনুমানিক ১৫০-৫০০ টাকা এবং উচ্চমূল্যের গিয়ারযুক্ত সাইকেলের দাম আরও বেশি বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।
সাইকেল শিল্পের পরিসর বাড়াতে করণীয়
দেশীয় শিল্প বড় করতে শুধু আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো যথেষ্ট নয়। শুল্ক-সুরক্ষার পাশাপাশি উৎপাদনের মান, মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা- গিয়ার, হাব, ফ্রি-হুইল, ব্রেক, রিমসহ আরও বেশি যন্ত্রাংশ দেশে উৎপাদন করতে হবে। রপ্তানি প্রণোদনা ও সহজ অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। কম সুদে শিল্পঋণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।-বিবিপিএমইএ মহাসচিব ও মেঘনা গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. লুৎফুল বারী
দেশের সাইকেল শিল্পকে কীভাবে আরও বড় করা যেতে পারে এ বিষয়ে লুৎফুল বারী বলেন, ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তোলা- গিয়ার, হাব, ফ্রি-হুইল, ব্রেক, রিমসহ আরও বেশি যন্ত্রাংশ দেশে উৎপাদন করতে হবে। রপ্তানি প্রণোদনা ও সহজ অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। কম সুদে শিল্পঋণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
আরও পড়ুন
সাইকেল কমাতে পারে ঢাকার দূষণ, দরকার আলাদা লেন-পার্কিং
তিনি বলে, ‘নতুন আন্তর্জাতিক বাজার যেমন- মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশের উদ্যোগ বাড়াতে হবে। গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রবেশ করতে হবে উচ্চমূল্যের মাউন্টেন, গ্রাভেল, ই-বাইক ও প্রিমিয়াম সেগমেন্টে। ব্র্যান্ড উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশি সাইকেলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। দেশীয় সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সাইকেল লেন, পার্কিং ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’
রপ্তানির ৮০ শতাংশ ইউরোপনির্ভর
দেশের বাইসাইকেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এককভাবে সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ইতালি, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, স্পেন, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাইসাইকেল রপ্তানি হয়।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরোপীয় বাজারনির্ভর হওয়ায় ইউরোপে চাহিদা কমলে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’
বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রপ্তানির শুরু হয় আলিটা (বিডি) লিমিটেডের হাত ধরে। বর্তমানে এ খাতে যুক্ত রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রাণ-আরএফএল ও আকিজ গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩০ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলারের সাইকেল রপ্তানি হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি ১৬৭ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪২ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৬ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলার ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ১৩৮ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলারের সাইকেল রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। পরে ফ্রেইট (জাহাজ ভাড়া) খরচ স্বাভাবিক হওয়া, ইউরোপে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ও ই-বাইসাইকেলের চাহিদা বাড়ায় রপ্তানি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
সম্পূর্ণ তৈরি সাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ প্রায় ১১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারের সাইকেল আমদানি করে। ২০২৪ সালে আমদানি বেড়ে প্রায় ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এর বড় অংশই এসেছে চীন থেকে।
দেশীয় উৎপাদনের সাম্প্রতিক চিত্র হিসেবে ২০২৫ সালে মেঘনা, আরএফএল ও আকিজের স্থানীয় বাজারে সম্মিলিত বিক্রি ছিল প্রায় ৫৯৫ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা। দেশে বিক্রি হওয়া সাইকেলের অর্ধেকের বেশি বর্তমানে স্থানীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
জ্বালানি সংকটে সাইকেলের বিক্রিতে ইতিবাচক হাওয়া
তথ্য বলছে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের বছরে প্রায় ১০ লাখ সাইকেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ সাইকেল ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। বাকি সাইকেল দেশের বাজারে বিক্রি করা হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ ডলারের সাইকেল রপ্তানি করেছে। বর্তমানে আরএফএলের সাইকেল ১৫টির বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। হবিগঞ্জ ও রংপুরে প্রতিষ্ঠানটির সাইকেল উৎপাদন কার্যক্রম রয়েছে। রংপুরে আরও একটি কারখানা স্থাপনের কাজ চলমান।
রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপের ওপর নির্ভরতা আমাদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। বরং ইউরোপ আমাদের জন্য খুবই ভালো একটি বাজার। অন্যদিকে চীন-তাইওয়ান অনেক দেশের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে রেখেছে। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। কারণ চীন খুব দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে।-আলিটা (বিডি) লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক এ এইচ এম ফেরদৌস
জানতে চাইলে আলিটা (বিডি) লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক এ এইচ এম ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাইকেল রপ্তানিতে এই মুহূর্তে আমাদের খুব একটা বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা নেই। গত দুই-তিন বছর আমাদের সবারই অবস্থা খুব খারাপ ছিল। মূলত ইপিজেডের বায়াররা তাদের নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কারণে পণ্য নিচ্ছিল না। এখন সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়েছে এবং বায়াররা আবার পণ্য নেওয়া শুরু করেছে।’
গত বছর থেকে বাংলাদেশের যারা সাইকেল রপ্তানি করছে, তাদের সবারই রপ্তানি বাড়ছে, অর্থাৎ খাতটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
এ এইচ এম ফেরদৌস বলেন, ‘রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপের ওপর নির্ভরতা আমাদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। বরং ইউরোপ আমাদের জন্য খুবই ভালো একটি বাজার। অন্যদিকে চীন-তাইওয়ান অনেক দেশের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে রেখেছে। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। কারণ চীন খুব দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারে।’
আরও পড়ুন
জীবিকার উৎস যখন বাইসাইকেল
ইউরোপের কোনো বায়ার বাংলাদেশে সাইকেলের অর্ডার দিলে পণ্য পেতে প্রায় ৯০ দিন সময় লাগে। কিন্তু চীন থেকে অর্ডার করলে ৩০ দিনের মধ্যে, সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের মধ্যে পণ্য পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
ফেরদৌস আরও বলেন, ‘শিপমেন্টের ক্ষেত্রেও চীনের কিছু বাড়তি সুবিধা আছে। চীন থেকে আমেরিকায় ট্রানজিট টাইম বাংলাদেশের তুলনায় কম। বাংলাদেশ থেকে পণ্য পাঠাতে প্রথমে সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন রুটে যেতে হয়, এরপর আমেরিকায় যায়। চীন থেকে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি শিপমেন্টের সুবিধা পাওয়া যায়। এগুলো আমাদের জন্য প্রতিযোগিতায় কিছুটা অসুবিধা তৈরি করে।’
ইউরোপের বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইউরোপের বাজার আমাদের জন্য খুবই ভালো। সেখানে ব্যবসার প্রফিট মার্জিনও তুলনামূলক বেশি। ইউরোপের বায়াররা হয়তো আমেরিকার মতো বড় পরিমাণে অর্ডার দেয় না, কিন্তু প্রতি ইউনিটে লাভের পরিমাণ বেশি থাকে। ইউরোপের অর্থনীতি খারাপ থাকায় মাঝখানে তাদের বাইং কমে গিয়েছিল। এখন আবার বাইং রিভাইভ করছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে সাইকেল খাতে আবার সুদিন ফিরে আসবে বলে আমরা মনে করি।’
সব মিলিয়ে, বাড়তি শুল্কে স্বল্পমেয়াদে সাইকেলের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় কম্পোনেন্ট শিল্প গড়ে উঠলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। তবে একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমানো, দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ করতে না পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাইকেল শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
ইএইচটি/এএসএ
বিজ্ঞাপন