বিজ্ঞাপন
যে মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভা; সেই মাটিতেই আজ যেন বিস্মৃতির ধুলো জমছে। যে বাড়ির উঠানে একদিন বেড়ে উঠেছিলেন মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ; সেই বসতভিটাই এখন হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়। নেই পাঠাগার, নেই স্মৃতিকেন্দ্র, নেই কবিকে ঘিরে নিয়মিত সাহিত্যচর্চার কোনো দৃশ্যমান আয়োজন।
১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝআইল গ্রামে জন্ম নেন কবি ফররুখ আহমদ। তাঁর কলমে উচ্চারিত হয়েছে জাগরণ, মানবতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী বার্তা। ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘সিরাজাম মুনিরা’সহ তাঁর অসংখ্য সাহিত্যকর্ম বাংলা কবিতার ভান্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ।
শুধু একটি বিশেষ ভাবধারার কবি হিসেবে নয়, ফররুখ আহমদ ছিলেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ এক সাহিত্যিক। তাঁর কবিতায় ছিল স্বপ্ন, দ্রোহ, মানবিকতা এবং নতুন দিনের প্রত্যাশা। অথচ তাঁর জন্মভূমিতেই আজ তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব নিয়ে আক্ষেপ স্থানীয়দের।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে কবির বসতভিটা ঘিরে। পরিবারের দাবি, এই বাড়ির ওপর দিয়ে রেললাইন নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে কবির শেষ স্মৃতিচিহ্নও হারিয়ে যেতে পারে।
কবির ভাতিজি দিলরুবা আক্তার ফাতেমা বলেন, ‘ফররুখ আহমদ আমার বড় চাচা। অথচ তাঁর এই বসতবাড়িতে আজ পর্যন্ত কোনো পাঠাগার বা ফাউন্ডেশন গড়ে ওঠেনি। এখন যদি বাড়িটিও ভেঙে যায়, তাহলে কবির স্মৃতি ধরে রাখার মতো আর কী থাকবে?’
তিনি বলেন, ‘কবির শেষ স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় প্রয়োজনে রেললাইনের পথ কিছুটা পরিবর্তন করা যেতে পারে। এতে উন্নয়নও হবে, আবার কবির স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিও রক্ষা পাবে।’
কবির ভাতিজা শিপন আহমেদ বলেন, ‘কবির স্মৃতি একেবারেই শেষের দিকে। আমরা চেষ্টা করছি ধরে রাখার। কবির স্মৃতি লাইব্রেরি আছে; সেটাও জরাজীর্ণ অবস্থায়। যদি সরকারিভাবে একটু এদিকে লক্ষ্য করা হয়, তাহলে মুসলিম রেনেসাঁর কবি সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারবে।’
কবির ভাবি মোছা. ফাতেমা আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘কবির শেষ স্মৃতিটুকু যেন থাকে। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, বাড়িটি যেন ভেঙে না যায়।’
স্থানীয়দের দাবি, একজন কবির জন্মভিটা কেবল একটি পরিবারের সম্পত্তি নয়; এটি ইতিহাসের অংশ, সাহিত্য-সংস্কৃতির সম্পদ। এই স্মৃতিচিহ্ন টিকে থাকলে আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ের পাতায় ফররুখ আহমদের নাম পড়বে না, তাঁর জন্মভূমিতে এসে তাঁর শেকড়ের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবে।
প্রবীণ মো. আকরাম প্রত্যাশা করে বলেন, ‘কবির জন্মভিটাকে ঘিরে গড়ে উঠুক একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিকেন্দ্র, পাঠাগার ও গবেষণাগার। সংরক্ষণ করা হোক তাঁর ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্ন ও বসতভিটা। উন্নয়নের প্রয়োজনে রেললাইন নির্মাণ হলেও যেন তা কবির শেষ স্মৃতির ওপর দিয়ে না যায়।’
একজন কবি তাঁর কবিতায় বেঁচে থাকেন কিন্তু তাঁর জন্মভূমি, স্মৃতি আর শেকড় হারিয়ে গেলে ইতিহাসের একটি অধ্যায়ও ধীরে ধীরে মুছে যায়। মাগুরাবাসীর প্রশ্ন, ফররুখ আহমদের স্মৃতির শেষ আশ্রয়টুকুও কি হারিয়ে যাবে, নাকি সময় থাকতেই সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে রাষ্ট্র?
মাগুর জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, ‘কবির বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাথে কথা বলেছি। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে কবির বাড়ি সংরক্ষণের কাজ করে, সেদিকে চেষ্টা আছে। কবির নামে একটি লাইব্রেরি এবং কবির স্মৃতিবিজড়িত যেসব প্রয়োজনীয় জিনিস আছে। সেগুলো কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং পরবর্তী জেনারেশন এ বিষয়ে জানতে পারে; সে দিকটাও আমরা খেয়াল করছি।’
এমএমআইজে/এসইউ
বিজ্ঞাপন