বিজ্ঞাপন
লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। চারদিক থেকে ভেসে আসে সুগন্ধ, আর শোনা যায় চায়ের কাপে চামচ নাড়ার টুংটাং শব্দ। এই কোলাহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি চায়ের দোকান, \'হযরত টি স্টল’।
গত সাত বছর ধরে লালমনিরহাটের চা-প্রেমীদের কাছে এ চায়ের দোকানটি আস্থার প্রতীক। বিশেষ করে এখানকার ‘মালাই চা’ যেন পুরো জেলার মানুষের কাছে এক ভালোবাসার নাম।
হযরত টি স্টলের মালিকের সফলতার পেছনের গল্পটা হার না মানা এক সংগ্রামের। দোকানের স্বত্বাধিকারী হযরত আলী একসময় পেশায় ছিলেন একজন বাবুর্চি। রান্নাবান্নার পাশাপাশি চালাতেন ছোট একটি পানের দোকান। কিন্তু একসময় কর্মক্ষেত্রে মন্দাভাব দেখা দেয়। জীবন-জীবিকার তাগিদে কাজের সন্ধানে তাকে ছুটতে হয় বগুড়ায়।
সেখানে হাড্ডিপট্টি এলাকায় একদিন চা খেতে গিয়ে তার চোখে পড়ে মালাই চায়ের অভাবনীয় জনপ্রিয়তা। মানুষের চা-প্রীতি দেখে তিনি শুধু অবাকই হননি, বরং নিজের ভাগ্য বদলের একটি পথও খুঁজে পান। সময় নিয়ে নিপুণভাবে আয়ত্ত করেন মালাই চা তৈরির বিশেষ কারিগরি।
এরপর ফিরে আসেন নিজ শহর লালমনিরহাটে। স্টেশন এলাকার প্ল্যাটফর্মে ভাড়া নেন একটি দোকান। লালমনিরহাট জেলায় তিনিই প্রথম শুরু করেন মালাই চা বিক্রি। শুরুতে হযরত আলী আর তার ছেলে ফরিদ হাসান মিলেই দোকান চালাতেন। কিন্তু চায়ের স্বাদ এতটাই অনন্য ছিল যে, ধীরে ধীরে ক্রেতার ঢল নামতে শুরু করে।
বাধ্য হয়েই বাড়াতে হয় জনবল। একসময়ের ছোট্ট সেই দোকানটি আজ ছয়টি পরিবারের জীবিকার উৎস। মেন্যুতেও এসেছে বৈচিত্র্য। মালাই চায়ের পাশাপাশি এখন পাওয়া যায় হরলিক্স চা, কফি, দুধ চা এবং লাল চা। ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ টাকা পর্যন্ত দামের চা বিক্রি হয় এখানে।
হযরত আলী তার সফলতার গল্প বলতে গিয়ে বলেন, বগুড়া থেকে শিখে এখানে এসে যখন শুরু করি, তখন আমি আর ছেলেই ছিলাম। এখন ভিড় এত বেড়েছে যে বাধ্য হয়ে আমরা মোট ছয়জন এখানে কাজ করি। চায়ের পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসও এখানে বিক্রি হয়। সব খরচ আর কর্মচারীদের বেতন দিয়ে মাসে আমার প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো সঞ্চয় থাকে। মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি, এটাই বড় কথা।
কারিগর ও ক্রেতাদের চোখে হযরত টি স্টল দোকানের অন্যতম কারিগর সুকুমার চন্দ্র বর্মন। গত তিন বছর ধরে তিনি হযরত আলীর নিপুণ হাতের ছোঁয়াকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, দোকানে যে-ই আসুক না কেন, সবার প্রথম পছন্দ এই চা। মালিক আমাকে যে কায়দায় চা বানানো শিখিয়ে দিয়েছেন, আমি সেভাবেই তৈরি করি। মানুষের মালাই চা খুব পছন্দ। সন্ধ্যার পর তো এখানে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না।
সন্ধ্যা নামলে হযরতের চায়ের দোকান রূপ নেয় এক মিলনমেলায়। দূর-দূরান্ত, এমনকি আশেপাশের জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসে কেবল এক কাপ চায়ের টানে।
শহর থেকে একটু দূরে সাপটিবাড়ি এলাকা থেকে আসা চা-প্রেমী শাওন ইসলাম বলছিলেন, গরমেও চা খেতে ইচ্ছে করছে বলে চলে এসেছি। এখানকার মালাই চা আমার খুব প্রিয়। তারা যেভাবে যত্ন নিয়ে কাস্টমারদের সেবা দেয়, সেটা সত্যিই মন কাড়ে। সময় পেলেই পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসি।
আরেকজন নিয়মিত ক্রেতা কাওসার মাহমুদ বলেন, এই দোকানটা যেন এখন আমাদের একটা মিলনমেলা। এখানকার মালাই চা, দুধ চা বা হরলিক্স চা, সবই দারুণ। আমরা বন্ধুরা মিলে প্রায় প্রতিদিনই আসি, আর সুযোগ পেলে পরিবার নিয়েও চলে আসি।
একটি মানুষের দূরদর্শিতা আর একাগ্রতা কীভাবে একটি পুরো এলাকার মানুষের সান্ধ্যকালীন আড্ডার রূপ পাল্টে দিতে পারে, হযরত আলী তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মহসীন ইসলাম শাওন/কেজে/এএসএম
বিজ্ঞাপন