বিজ্ঞাপন
দুই বছর আগে ছাত্র জনতার এক দফা দাবি ‘সরকারের পতন’ উচ্চারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। বাংলাদেশের এ অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর তরুণদের আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ও শ্রীলংকাও সফল হয়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক ভিত্তি গড়তে না পারায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সীমিত অগ্রগতিই দেখা দিয়েছে, বরং বিভিন্ন সময় নানা দাবিতে তরুণদের আবারো সড়কে নামতে হচ্ছে। নাগরিক সমাজ, মূলধারার রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির সঙ্গে ব্যাপকভিত্তিক জোট গড়তে পারলে টেকসই পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। সেটি হয়ে ওঠেনি বলে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা আজও অসম্পূর্ণ বলেই নানা মহলের পর্যবেক্ষণ।
দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কার ও চাকরিতে বৈষম্য দূর করার সীমিত দাবি থেকে। তা যেভাবে শাসন ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলা অভ্যুত্থানে পরিণত হয় এর নেপথ্যে ছিল বহুমুখী সংকট। অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছরে ভোটাধিকার ফিরেছে, নতুন সংসদও বসেছে। কিন্তু প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারে রূপান্তরের যে প্রতিশ্রুতি জুলাই দিয়েছিল, তা এখনো অসম্পূর্ণ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থান চরম পরিণতির দিকে এগোয় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর কারণে। তারও আগে এ অভ্যুত্থানের শিকড় প্রোথিত ছিল দেড় দশকের শাসন কাঠামোর ভেতরে। একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম-খুনের সংস্কৃতি রাষ্ট্রের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অর্থনৈতিক সংকট। স্মরণকালের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, রিজার্ভের ক্ষয়, ব্যাংক খাতে ভয়াবহ খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে লুটপাট। জবাবদিহি না থাকায় দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল। কোটা ব্যবস্থার বৈষম্য তরুণদের জন্য এক ভয়াবহ প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছিল। তাই আন্দোলন যখন এক দফায় রূপ নিল, তখন সব শ্রেণী-পেশার মানুষ তাতে শামিল হতে দ্বিধা করেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতে, শাসনের বৈধতায় চূড়ান্ত ফাটল ঘটেছিল জুলাইয়ে।
জুলাই স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার নাগপাশ থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার কাজ এখনো বাকি। বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হোক—এটিই হোক ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। এর কোনো বিকল্প নেই।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এ সময়ে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, অনেক কমিশন গঠন হয়। ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলোচনার পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণীত হয়। সংস্কার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ অবস্থায় রেখেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে বাধ্য হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের ওপর অনুষ্ঠিত হয় সাংবিধানিক গণভোট, যেখানে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় আসে। এ নির্বাচনে দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে; জামায়াতে ইসলামী হয় প্রধান বিরোধী দল। অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কয়েকটি আসনে জয়ী হয়। ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং একটি কার্যকর সংসদ ও বিরোধী দল প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এ ফল একটি বাস্তবতাও স্পষ্ট করে দিয়েছে: জুলাইয়ে মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়া তরুণরাই নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমিত প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে। ক্ষমতার মূল কাঠামো ফিরে গেছে ঐতিহ্যবাহী দলের কাছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও চিত্রটি মিশ্র। জুলাই সনদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার মতো সুপারিশ ছিল। প্রায় সবই গণভোটে জনসমর্থন পেয়েছে। তবে বিশ্লেষক ও আন্দোলন কর্মীদের একটি বড় অংশের পর্যবেক্ষণ বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন কিংবা ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বদলে পুরনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেকাংশে অক্ষত থেকে গেছে। আমলাতন্ত্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এখনো রয়েছে। অর্থনীতিতে স্বস্তি এখনো অধরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা এবং ক্রয়ক্ষমতার সংকট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিত্যসঙ্গী। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির মতো বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবেলায় কূটনৈতিক সাফল্য এসেছে বটে, কিন্তু কাঠামোগত রূপান্তর অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, রফতানি বহুমুখী করা ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়।
জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়বিচারভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার। দুই বছর পর সে অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট অগ্রগতি জরুরি। প্রথমত, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদের বিধানগুলো অর্থাৎ বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর স্বাধীনতা, ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের মতো বিষয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে না দিয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। রাষ্ট্রের অংশীজনরা যেন অন্যায়, বৈষম্য বা বিচারহীনতার কারণে আবারো শোষিত না হয় এবং পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী কাঠামোর উত্তরাধিকার বহন না করেন—সেটিই সরকারের মূল দায়বদ্ধতা। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতিতে কাঠামোগত সংস্কার দরকার। ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, রাজস্ব খাতের সক্ষমতা ও বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাস্তব স্বস্তি আনতে হবে। না হলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল প্রতিশ্রুতিই অর্থহীন হয়ে পড়বে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার প্রশ্নে ন্যূনতম ঐকমত্য বজায় রাখা জরুরি, যাতে ক্ষমতার পালাবদল ভবিষ্যতেও সংস্কারের ধারাবাহিকতা ভেঙে না দেয়। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখনো উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশাগ্রস্ত। জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের সুবর্ণ এ সময়ে তরুণ প্রজন্মের স্থবিরতা দূর করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে না পারলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো গণ-অভ্যুত্থানই তার সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে না। কিন্তু ব্যর্থতা এড়ানোর একমাত্র পথ হলো প্রতিশ্রুতিগুলোকে জীবন্ত রাখা। জুলাই স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার নাগপাশ থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার কাজ এখনো বাকি। বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হোক—এটিই হোক ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সাংবাদিক।
এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন