জাতীয়

ওপারে ‘অদৃশ্য চোখ’, ‌‌এপারে উঠানেও আতঙ্ক

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
6 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
  সীমান্তে বিএসএফের কড়া নজরদারি উঠান-ক্ষেতেও তাড়া করে ভয় দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত নিজের উঠানে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন একজন নারী। পাশেই খেলছে শিশুরা। একটু দূরে নিজের জমিতে ধান কাটছেন কৃষক। দৃশ্যগুলো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একটি গ্রামের খুবই স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবন। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে অস্বস্তি। সীমান্তের ওপার থেকে কেউ ‌‘তাকিয়ে আছে’ কি-না—এই প্রশ্ন এখন তাড়া করে বেড়ায় তাদের। দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী নয়াপাড়া, বোয়ালদাড়, খটবাড়ি, চন্ডিপুর ও মাথাভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় তাদের স্বাভাবিক চলাফেরাতেও তৈরি হয়েছে ভীতি। কাঁটাতারের ওপারে উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, দূরবীন ও বিভিন্ন ধরনের নজরদারি সরঞ্জামের মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকার মানুষের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তে নিরাপত্তার বিষয়টি তারা বোঝেন। কিন্তু সেই নজরদারি যখন ঘরের উঠান, কৃষিজমি কিংবা শিশুদের খেলাধুলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে তাদের মনে হয়, তখন নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নটিও সামনে আসে। আরও পড়ুন বৃদ্ধকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ, জবাবে ভারতীয়কে ধরে আনলেন স্থানীয়রা     হিলি স্থলবন্দর ও জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি নয়াপাড়া গ্রাম। ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বাগমারা এলাকা। সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতাও এখানে জটিল। কয়েকটি পরিবারের বাড়িঘর ও স্থাপনার অবস্থান এমন যে, বসতভিটার এক অংশ বাংলাদেশে, অন্য অংশ ভারতের ভূখণ্ডে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। ‘আমাদের কোনো অপরাধ নেই। তারপরও সব সময় মনে হয় কেউ যেন দূর থেকে দেখছে। উঠানে কাজ করার সময়ও মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াতে হয়’—স্থানীয় বাসিন্দা নয়াপাড়ার গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের কোনো অপরাধ নেই। তারপরও সব সময় মনে হয় কেউ যেন দূর থেকে দেখছে। উঠানে কাজ করার সময়ও মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াতে হয়।’ আরও পড়ুন পরিচয়পত্র দেখিয়েও রেহাই পাননি শাহিদা, ঠেলে দেওয়া হলো বাংলাদেশে   তার ভাষ্য, গ্রামের একমাত্র মসজিদ বাংলাদেশের অংশে হলেও সেখানে যেতে ভারতের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে চলাচলের প্রয়োজন পড়ে। ফলে সীমান্তের এই অস্বাভাবিক ভৌগোলিক অবস্থান তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও জটিল করে তুলেছে। বোয়ালদাড় গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জমিতে কাজ করার সময় ওপারের দিকে তাকালে অনেক সময় দূরবীন হাতে সদস্যদের দেখা যায়। নিজের জমিতে কাজ করছি, তবু মনে হয় ভুল কিছু করছি কি-না। কখন কী হয়, সেই ভয় থাকে।’ চন্ডিপুরের গৃহবধূ রোজিনা আক্তার বলেন, ‘বিকেলে সন্তানদের নিয়ে বাইরে বসতে গেলেও এখন সতর্ক থাকতে হয়। ছেলেমেয়েদের বলি বেশি সময় বাইরে থেকো না। আগে উঠানে বসে খেলত। এখন নিজেরাই ভয় পায়।’ ‘বিকেলে সন্তানদের নিয়ে বাইরে বসতে গেলেও এখন সতর্ক থাকতে হয়। ছেলেমেয়েদের বলি বেশি সময় বাইরে থেকো না। আগে উঠানে বসে খেলত। এখন নিজেরাই ভয় পায়’—স্থানীয় বাসিন্দা সীমান্তের এমন পরিস্থিতি শুধু হাকিমপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। পাশের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামেও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আরও পড়ুন সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড, এক বছর পরও শোকে স্তব্ধ দুই পরিবার   লালদীঘি গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “সীমান্তের কাছাকাছি জমিতে কাজ করার সময় ক্যামেরা বা টাওয়ারের দিকে চোখ পড়ে। তখন মনে হয়, ‘আমরা যেন অপরাধী’।” স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি আটকের ঘটনাকে ঘিরেও। তাদের দাবি, একবার বিরল উপজেলার ধর্মপুর সীমান্তে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সময় দুই বাংলাদেশি কৃষককে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। একইভাবে পাটগ্রামের গাটিয়ারভিটা সীমান্তে বেড়াতে যাওয়া দুই বাংলাদেশিকেও ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে বলে তারা জানান। আরও পড়ুন ‘সীমান্তে সবাই সজাগ আছি’   সীমান্তবাসীর অভিযোগ, এসব ঘটনার পর মাঠে কাজ করা, সীমান্তের কাছাকাছি যাওয়া কিংবা সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে থাকার ক্ষেত্রেও সতর্কতা বেড়েছে। হিলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের মাঠে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে কয়েকজন শিশুকে দেখা যায়। অন্য সময় যেখানে তাদের খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেদিন তারা অনেকটাই গুটিয়ে ছিল। সাকিব নামের এক শিশু বলে, ‘আম্মু বলে ওপারের দিকে তাকিয়ে থাকবি না। কেউ দেখে ফেলতে পারে। তাই এখন খেলতেও ভয় লাগে আমাদের।’ ‘আগে সীমান্তে বিএসএফের উপস্থিতি ছিল, কিন্তু এখনকার মতো সারাক্ষণ নজরদারির অনুভূতি ছিল না। টাওয়ারে দাঁড়িয়ে দূরবীন দিয়ে তাকায়। কখনো অস্ত্র তাক করতেও দেখি। এতে ছোটরা ভয় পায়’—স্থানীয় বাসিন্দা চন্ডিপুরের এক কিশোরীও জানায়, আগে বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে উঠানে বসে সময় কাটাত। এখন মা বারবার ঘরের ভেতরে ডেকে নেন। তার ভাষায়, মনে হয় আমাদের কেউ দেখছে। বয়স্কদের কাছেও পরিবর্তনটি স্পষ্ট। চন্ডিপুরের সত্তরোর্ধ্ব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে সীমান্তে বিএসএফের উপস্থিতি ছিল, কিন্তু এখনকার মতো সারাক্ষণ নজরদারির অনুভূতি ছিল না। টাওয়ারে দাঁড়িয়ে দূরবীন দিয়ে তাকায়। কখনো অস্ত্র তাক করতেও দেখি। এতে ছোটরা ভয় পায়।’ আরও পড়ুন শেরপুর / পুশ-ইন ঠেকাতে রাতভর পাহারায় গ্রামবাসী   সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে প্রায় আট হাজার পরিবারের বসবাস। তাদের বড় অংশ কৃষিকাজ ও ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়দের দাবি, হিলি সীমান্তের ভারতীয় অংশে চিরি, সুলতানপুর ও দৌলতপুর এলাকার বিপরীতে বিএসএফের নজরদারি আগের তুলনায় বেড়েছে। আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দুই বছর আগে হিলির পাশের একটি এলাকায় নজরদারির মধ্যে রশিদুল নামের এক কৃষক বিএসএফের গুলিতে আহত হন। সেই ঘটনা স্থানীয়দের মনে এখনো দাগ কেটে আছে। ওপারে গরু চলে গেলে আর ফেরত না এলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।’ জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার কয়েকটি সীমান্ত এলাকাতেও কাঁটাতারের বেড়া না থাকার বিষয়টি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, উচনা ঘোনাপাড়া সীমান্তে মেইন পিলার ২৮১-এর সাব পিলার ৩৩, ৩৪ ও ৩৫-এর কাছাকাছি কিছু এলাকায় এখনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। এসব এলাকায় বিএসএফ সদস্যদের আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে বেড়া নির্মাণের চেষ্টা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। ‘সীমান্ত নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে অতিরিক্ত নজরদারি উদ্বেগের বিষয়। নারী ও শিশুরা যদি নিজের উঠানেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে ভয় পায়, তাহলে বিষয়টি শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে আসে’ জয়পুরহাট ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লতিফুল বারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বিএসএফ সদস্যরা কয়েকবার ঘোনাপাড়া, পূর্ব উচনা ও সোনাতলা সীমান্তে প্রবেশ করে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিজিবির বাধায় তারা তা পারেনি। অহেতুক নজরদারির বিষয়টি দুই দেশের পতাকা বৈঠকে আলোচনা করা হবে।’ আরও পড়ুন ‘এক পাও সরবো না এখান থেকে’ বিএসএফকে বিজিবির কড়া হুঁশিয়ারি   হাকিমপুর বিজিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিএসএফের এমন আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে নিয়মিত চিঠি দেওয়া হয় এবং ফ্ল্যাগ মিটিংয়েও (পতাকা বৈঠক) বিষয়টি তোলা হয়। সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।’ সীমান্তবর্তী মানুষ যাতে আতঙ্কের মধ্যে না থাকে, সেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে জানান হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিত্র চাকমা। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আরও পড়ুন ৩ লাখ টাকা ঘুস না দেওয়ায় পুশ-ইন করেছে বিএসএফ: ভারতীয় নারী   সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পেছনে নিরাপত্তা ও চোরাচালান দমনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।স্থানীয়দেরও অনেকে বলছেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু, মাদক ও বিভিন্ন পণ্য পাচার ঠেকাতে বিএসএফের তৎপরতা বেড়েছে। সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ‘সীমান্ত নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে অতিরিক্ত নজরদারি উদ্বেগের বিষয়। নারী ও শিশুরা যদি নিজের উঠানেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে ভয় পায়, তাহলে বিষয়টি শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে আসে।’ এলবি/এসআর        
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>