বিজ্ঞাপন
শেরপুরে দুদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা। বুধবার (১২ আগস্ট) রাত ১০টা থেকে গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসচালিত যানবাহন চলাচলও বন্ধ রয়েছে। রান্না করতে না পারায় কেউ কেউ গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন বলে তথ্য এসেছে।
কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরে প্রায় চার হাজার আবাসিক গ্রাহক ও ২২টি বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এছাড়া জেলায় একটি সিএনজিচালিত পাম্প রয়েছে। জেলার মাসিক গ্যাসের চাহিদা ২৭-৩২ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের চাপ থাকে ২০ -২২ পিএসআই। শেরপুরে গ্যাসের সরবরাহ আসে মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মাতারবাড়ী অঞ্চল থেকে।
শহরের তিনানি বাজার, কলেজ মোড়, নিউমার্কেট, নয়ানী বাজার, খরমপুর, থানারমোড়, চকবাজার, পুরাতন গরুহাটি, বটতলা এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার রাত থেকে হঠাৎ করে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোতে রান্নাবান্না প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। কেউ কেউ মাটির বা লাকড়ির চুলা ব্যবহার করে কোনোভাবে রান্নার ব্যবস্থা করছেন।
আরও পড়ুন
লোডশেডিংয়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখপ্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী
তবে শহর এলাকায় হঠাৎ করে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। রান্না সমস্যার কারণে অনেকেই গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।
শেরপুর শহরের খরমপুর এলাকার বাসিন্দা মিলি আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বাসায় টোটালি রান্নাবান্না বন্ধ। গ্যাস না থাকায় চুলা জ্বলছে না। হোটেলেও তরকারি পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রাম থেকে আম্মা রান্না করে পাঠিয়ে দিচ্ছে। জানি না কবে গ্যাস আসবে।’
তিনি বলেন, ‘দিনে অন্তত দুই ঘণ্টা হলেও গ্যাস দেওয়া উচিত, যাতে জরুরি গৃহস্থালি কাজগুলো করা যায়। তা নাহলে মুশকিলে পড়ে যাব।’
মাধবপুর মহল্লার শিল্পী রাণী ভৌমিক বলেন, ‘আমার তিনজন বাচ্চা স্কুলে পড়াশোনা করে। তাদের জন্য রান্না করা খাবার জোগাড় করতে পারছি না। গ্যাস নেই, চুলা জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে আগামীকাল শ্রীবরদী গ্রামের বাড়িতে চলে যাব।’
একই দুরবস্থার কথা জানান হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকরাও। গ্যাস না থাকায় তারা খাবার প্রস্তুত করতে পারছেন।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। জেলার একমাত্র সিএনজি স্টেশনটিতে গ্যাস না থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে আন্তঃসড়ক ও লোকাল রুটে পরিবহন সংকট তৈরি হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘গ্যাস না থাকলে আমরা কেমনে সিএনজি চালাব? এটা চালিয়েই আমাদের সংসার চলে। কয়েকদিন ধরে গ্যাস একদমই নেই। আমরা দিন আনি দিন খাই। সিএনজি চালাতে না পারলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। আমরা চাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ চালু হোক।’
রেইনটেকারে গাড়ি চালান মানিক মিয়া। তিনি বলেন, ‘এভাবে চললে তো সর্বনাশ। একে তো গাড়িতে গ্যাস তুলতে পারছি না, আবার বাসায় গেলেও খাবার নেই, রান্না বন্ধ। ছেলেমেয়ে নিয়ে বিপদে আছি।’
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের শেরপুর জেলার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. বদরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বুধবার রাত ১০টা থেকে শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মাতারবাড়ী ও মহেশখালী অঞ্চলের এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও ৫-৭ দিন সময় লাগতে পারে। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক করতে আমাদের চেষ্টা চলমান।’
আরও পড়ুন
নারায়ণগঞ্জ / গ্যাস সংকটে কমেছে উৎপাদন, বাড়ছে কারখানা বন্ধের শঙ্কা
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মিডিয়া ও জনসংযোগ শাখার জনসংযোগ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. আল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহের জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি। আমাদের সব পাইপলাইন ঠিক আছে। কিন্তু আমরা পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছি না বলে সম্মানিত গ্রাহকদের গ্যাস দিতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘এটি একটি জাতীয় সমস্যা। খুব শিগগির এর সমাধান হবে। যেহেতু এটি জাতীয় সমস্যা, তাই নির্দিষ্ট করে সময় বলা সম্ভব নয় কবে স্বাভাবিক হবে।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক জাগো নিউজকে বলেন, ‘শেরপুর জেলায় একেবারে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। দেশের গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি তিতাস গ্যাস ভালোভাবে বলতে পারবে। তবে এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সমস্যা। খুব শিগগির এর সমাধান হবে।’
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে অবস্থিত সামিট এলএনজি টার্মিনাল বা ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে পুনরায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গতকাল সন্ধ্যা কিছুটা সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে গ্যাস সংকটেরও সমাধান হবে।’
মো. নাঈম ইসলাম/এসআর
বিজ্ঞাপন