জাতীয়

পোশাক রপ্তানিতে ইউরোপের বাজারেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়া রপ্তানি খাতের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন মাসের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১৬.৪৩ শতাংশ কমে ৮.৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। অর্থাৎ ছয় মাসে কমেছে প্রায় ১.৭০ বিলিয়ন ইউরো। গতবছর একই সময়ে ১০.৩৪ বিলিয়ন ইউরো আয় করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৬.৪৩ শতাংশ পতন বৈশ্বিক গড় পতনের তুলনায় প্রায় ৬.৭৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে পণ্যের বৈচিত্র্য, দ্রুত সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে আরও জোর দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, তালিকায় থাকা প্রধান প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীনের রপ্তানি ৮.৮৮ শতাংশ কমে ১২.৯৭ বিলিয়ন থেকে ১১.৮২ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। তুরস্কের রপ্তানি ১৪.৬০ শতাংশ কমে ৪.২৭ বিলিয়ন থেকে ৩.৬৫ বিলিয়ন ইউরো এবং ভারতের রপ্তানি ১২.৪৯ শতাংশ কমে ২.৭০ বিলিয়ন থেকে ২.৩৬ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ‘বাংলাদেশে পোশাকের রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার পেছনে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের অনিশ্চয়তা, তীব্র জ্বালানি সংকট, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তন-সবকটি বিষয়ই একসঙ্গে কাজ করছে।’ তবে, ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে। দেশটির রপ্তানি ২০২৫ সালের ২.০৬ বিলিয়ন ইউরো থেকে সামান্য বেড়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুনে ২.০৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে, যা ০.৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য সরবরাহকারী দেশের রপ্তানিও কমেছে। সামগ্রিকভাবে, জানুয়ারি-জুন মাসের মধ্যে ইউরোপীয় বাজারে বিশ্বের শীর্ষ পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর রপ্তানিতে বড় ধরনের চাপ দেখা গেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় বিশ্ব থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানি কমেছে ৯.৭০ শতাংশ এবং আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪১.১০ বিলিয়ন ইউরোতে। আরও পড়ুন গ্যাস সংকট / স্থবির হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চল, ছাঁটাই আতঙ্কে দেড়লাখ শ্রমিক কমেছে মূল্যও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির কমার পাশাপাশি পণ্যের গড় ইউনিট মূল্যেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে রপ্তানি করা প্রতি কেজি পোশাকের মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৯৪ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, একই সময়ে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর পোশাক আমদানির গড় মূল্য কমেছে ৩.৫৩ শতাংশ। এই ব্যবধান বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের মূল্য কমলেও বাংলাদেশের পণ্যের ইউনিট মূল্যে পতন হয়েছে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে একদিকে রপ্তানিকারকদের আয় ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের মধ্যে ভিয়েতনাম এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউর বাজারে পোশাকের মূল্যে ১৩.৪৩ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সময়ে কম্বোডিয়া ও তুরস্কের রপ্তানিতেও যথাক্রমে ৫.৭২ শতাংশ ও ১.৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ‘আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তন, চীন ও ভিয়েতনামের বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের ওপর বাহ্যিক চাপ বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসার পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।’ বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্য সুবিধার পার্থক্য-সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। যে কারণে পতন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংকটও বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারক এবং অর্থনীতিবিদ। আরও পড়ুন গ্যাস সংকটের ধাক্কায় অস্থির চিনির বাজার তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক চাহিদায় কমতি বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর চীনের তৈরি পোশাক উৎপাদকরা তাদের পণ্যের একটি বড় অংশ ইউরোপীয় বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ইইউর বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভিয়েতনাম যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাচ্ছে, তা দেশটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশে পোশাকের রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার পেছনে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের অনিশ্চয়তা, তীব্র জ্বালানি সংকট, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তন-সবকটি বিষয়ই একসঙ্গে কাজ করছে। ‘বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রতিযোগিতার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ যদি এখনই উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তাহলে শুধু ইউরোপীয় বাজার নয়, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা ও রপ্তানি ব্যবস্থাপনা কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে নতুন অর্ডার দিতে সতর্ক হয়ে উঠছেন। হাতেম আরও বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গ্যাস ও জ্বালানির সংকটের কারণে কারখানাগুলো নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশের পণ্য জাহাজীকরণ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ক্রেতারা ইতোমধ্যে তাদের পরিকল্পিত অর্ডারের একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে অন্য সোর্সিং দেশগুলোতে নিয়ে গেছেন। আরও পড়ুন হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও ভিয়েতনাম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করেছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একই ধরনের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পোশাক খাতকে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বর্তমান পতনকে শুধু একটি কারণে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব চিত্রটি স্পষ্ট হবে না। ‘এটি মূলত বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ-দুই ধরনের ধাক্কার সম্মিলিত ফল।’ তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তন, ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তন, চীন ও ভিয়েতনামের বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের ওপর বাহ্যিক চাপ বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসার পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো-যেসব ক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন, তারা এখন ঝুঁকি কমাতে তাদের অর্ডারের একটি অংশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। একবার কোনো ক্রেতা বিকল্প সরবরাহকারীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করলে সেই অর্ডার পুনরুদ্ধার করা কঠিন হতে পারে। তাই সাময়িক রপ্তানি পতনকে শুধু বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা হিসেবে দেখলে চলবে না। তার মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিযোগিতা সক্ষমতার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত মোকাবিলা করা। শুধু রপ্তানিতে নগদ সহায়তা বা স্বল্পমেয়াদি প্রণোদনা দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি, সহজতর বাণিজ্য ও অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক পোশাক বাজারের প্রতিযোগিতার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ যদি এখনই উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তাহলে শুধু ইউরোপীয় বাজার নয়, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এনএইচআর
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>