বিজ্ঞাপন
জিসান তাসফিক
আমাদের সমাজে নারী নির্যাতন শব্দটি পরিচিত হলেও পুরুষ নির্যাতন তেমন নয়। যদিও এটি একটি সম্পর্ক, পরিবার, সমাজের নেতিবাচক দিককেই তুলে ধরে। তবে এর জন্য সমাজে আইন আছে। যার আওতায় ন্যায় বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে ভুক্তভুগী নারীর জন্য।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পুরুষ নির্যাতন দমন আইন চেয়ে রীট করা হয়েছিল এবং রীটটি খারিজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচন জন্ম দিয়েছে।
যুগে যুগে মানুষের দ্বারা মানুষ নির্যাতিত হয়ে আসছে। কিন্তু সেখানে দেখা যায় যে নারীরা পুরুষের দ্বারা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে, যা বিশেষভাবে লক্ষণীয় । নির্যাতন যে কোনো ভাবে হতে পারে। শারীরিক, মানসিক, আর্থিক অথবা সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত।
আরও পড়ুন
প্রবাসীদের কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফেরার এই মিছিল আর কতদিন?
সেই নির্যাতনের মাত্রা অর্থাৎ এ ধরনের অন্যায়মূলক কাজের পরিমাণ নারীদের ক্ষেত্রে যখন বৃদ্ধি পেয়েছে তখনই আসছে নারী নির্যাতন দমন আইন। আমাদের রাষ্ট্রে অন্যায় ও অপরাধ প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন আইন আছে। যেমন সংবিধান, দণ্ডবিধি, অথবা বিশেষ অপরাধ সম্পর্কিত আইন এবং সম্পত্তি বা অর্থ সংক্রান্ত সিভিল আইন। এই সব আইনে বিভিন্ন ধরনের অন্যায় ও অপরাধ দমনে যথেষ্ট পরিমাণ প্রতিকার আছে।
নারী নির্যাতন দমন আইনের কিছু বিশেষত্ব আছে
যেমন নারী ও শিশু অপহরণ ও মুক্তিপণ, ধর্ষণ, যৌতুক, আত্মহত্যা, যৌন নিপীড়ন ও মৃত্যু, জোর পূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিসহ এ ধরনের অপরাধে বিশেষ বিচার, শাস্তি, প্রতিকার ও আদালতের ব্যবস্থা আছে।
এই ধরনের অপরাধের বিষয়ে অন্যান্য আইনেও সংজ্ঞা, শাস্তি ও প্রতিকারের বিধান আছে। তবে সেই আইন থাকা সত্ত্বেও এই আইন করার কারণ ছিল বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি এবং প্রচলিত আদালতের বাহিরে গিয়ে বিশেষ আদালত তৈরি করা। বিশেষ আদালত তৈরি করার ফলে নিয়মিত আদালতে মামলা জট কমে যায়, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং বিশেষ আদালতে বিচারের সুবিধা থাকে। তবে বাস্তবতা হলো এখনো এই আইনের বাস্তব প্রতিকার শতভাগ পূর্ণ হয়নি। এর ফলে নিয়মিত আদালত থেকে অনেক মামলা বিশেষ আইনের অধীনে বিশেষ আদালতে চলে গিয়েছে।
সেখানে আলাদাভাবে যদি পুরুষ নির্যাতন আইন তৈরি করা হয় তবে প্রচলিত আদালত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে, বিশেষ করে নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট বা সেশন কোর্ট। কারণ নারী ও শিশুদের বিশেষ ব্যবস্থা থাকলে আর বাকিটা থাকে পুরুষ এবং সেখানে পুরুষদের বিচার হচ্ছে। সুতরাং সেই মামলার জট নিয়মিত আদালতে আসে না।
নতুন আইনে যে ধরনের অপরাধের সংজ্ঞা, বিচার ও প্রতিকার করা হবে সেটিও জানার বিষয় আছে। সংবিধানের ডকট্রেইন অব একোয়ালিটি বা সমতার মতবাদ বিধানের বাধ্যবাধকতা তুলে ধরে বিশেষ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। যেটিকে বলে ডকট্রেইন অব পজেটিভ ডিস্ক্রিমিনেশন যা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) তে বর্ণিত। এটি মূলত পিছিয়ে পরা জাতির জন্য।
তবে ডকট্রেইন অব পজেটিভ ডিস্ক্রিমিনেশন প্রয়োগ করতে গিয়ে রাইট টু ইকুয়ালিটি তথা সমতা বিধানের অধিকার যাতে লঙ্ঘন না হয় সে দিকেও খেয়াল করা রাখতে হবে। কিন্তু এখানে নারীদের বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে প্রচলিত আইন ও আদালত ব্যবস্থার কোনো সমস্যা হয় নাই বরং মামলা জট কমে আরও সুবিধা হয়েছে এবং প্রচলিত আইন ও আদালত ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে উপরে বর্ণিত কোনো মূলনীতির সমস্যা হবে না বরং সমান্তরাল ভাবে চলতে পারবে। পুরুষদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হলে প্রচলিত আদালতের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
আরও পড়ুন
অক্সফোর্ডেরও ৫০০ বছর আগের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় কেন ধ্বংস করা হয়?
আবার পারিবারিক সম্পর্কে কোনো সমস্যা হলে সেই ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালত আছে, যার অধীনে পাচ ধরনের দেউয়ানী প্রকৃতি (সিভিল ন্যাচার) সংক্রান্ত সমস্যার বিচার ও প্রতিকার আছে। সেই আদালতে এখতিয়ার ও বিশেষ বিবেচনা সাপেক্ষে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। কেননা নারী ও পুরুষের অনেক সমস্যা পারিবারিক কেন্দ্রীক হয়ে থাকে। আবার আছে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন, যেখানে সহিংসতা দমনের প্রয়োজনে পারিবারিক আদালত বা বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তৈরি করা যেতে পারে। প্রচলিত আইন ও আদালত ব্যবস্থার পরিপূর্ণ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তখন অনেক অন্যায় ও অপরাধ দমন ও প্রতিরোধ ও প্রতিকার হবে।
তারপরে অপরাধে পরিসংখান, অবস্থা, বৈশিষ্ট্য, বর্তমানের অপরাধের যে সংজ্ঞা আছে তার দূর্বলতা বিবেচনা করে এবং সেগুলো ও সংশোধন করে দূর্বলতা দূর করা যেতে পারে। এছাড়াও সাধারণ আদালতের সংজ্ঞা বৃদ্ধি করে মামলার জট কমানো যেতে পারে।
লেখক: শিক্ষানবীস আইনজীবী, ঢাকা আইনজীবী সমিতি।
কেএসকে
বিজ্ঞাপন