বিজ্ঞাপন
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করে ভূমধ্যসাগরে অন্তত এক হাজার ৬৬৮ জন অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সমুদ্র পাড়ি দেওয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ, ইরিত্রিয়া, সুদান, পাকিস্তান ও মিশরের অভিবাসীরা।
ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা এবং সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতায় বাধা এই সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুটা ছিল বিশেষভাবে প্রাণঘাতী।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করে ভূমধ্যসাগরে এক হাজার ৬৬৮ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩৫ জন।
নিহত বা নিখোঁজদের মধ্যে ৮৭২ জন সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে বিভিন্ন পথে যাত্রা করার সময় প্রাণ হারিয়েছেন। এসব রুটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পথটি উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো বিশেষ করে লিবিয়া থেকে লাম্পেদুসা দ্বীপ হয়ে ইতালির সঙ্গে যুক্ত।
আরও পড়ুন
বৈধ পথে বাংলাদেশি শ্রমিক নিতে চায় যুক্তরাজ্য
লিবিয়া ইউরোপে যাওয়ার জন্য অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট ও যাত্রার দেশ হিসেবে এখনো প্রথম অবস্থানে রয়েছে। ৯ আগস্ট প্রকাশিত এনজিও অ্যালার্ম ফোনের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এনজিও এসওএস মেদিতারানের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে যাত্রা করা অভিবাসীদের মধ্যে শীর্ষে আছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীরা। যা মোট অভিবাসীর ২৬ শতাংশ। এরপর রয়েছেন ইরিত্রিয়ার ১৬ শতাংশ, সুদানের ১৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ শতাংশ এবং মিশরের ৯ শতাংশ নাগরিক।
২০১৬ সাল থেকে নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, গিনি এবং মালি থেকেও এই পথে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে লিবিয়া ও টিউনিশিয়া থেকে যাত্রা করে ২৬ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ ইউরোপে পৌঁছেছেন। আগের বছরগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা কমেছে। তবে এর সঙ্গে নিহত বা নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েছে।
এপ্রিলের শুরুতে সমুদ্রপথে অভিবাসন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আরনো বানস ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেছিলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহির্সীমান্তে অভিবাসীদের যাত্রা ঠেকানো হচ্ছে ক্রমবর্ধমানভাবে। একই সময়ে আমরা দেখছি, সমুদ্রপথে যাত্রা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ইউরোপের উপকূলে পৌঁছাতে পারছেন কম মানুষ। কিন্তু মারা যাচ্ছেন বেশি।”
অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা ব্যবহার, পাশাপাশি সমুদ্রপথের দূরত্ব বেড়ে যাওয়া নৌকাডুবির অন্যতম প্রধান কারণ।
লিবিয়ার পশ্চিম উপকূলে নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় এখন আরও বেশি মানুষ “তব্রুক রুট” ব্যবহার করছেন। এই পথটি লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সঙ্গে যুক্ত।
এই রুটটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষক আরনো বানসের মতে, ইউরোপে পৌঁছাতে এই পথে যাত্রার দূরত্ব “তিন থেকে চার গুণ” পর্যন্ত বেড়েছে। গত ১৩ ও ১৪ জুলাই তব্রুক শহরের উপকূলে দুটি নৌকা ডুবে যায়। একটি নৌকায় প্রায় ৬০ জন এবং অন্যটিতে প্রায় ৩০ জন অভিবাসী ছিলেন। এরপর ৫০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ হন।
সাধারণভাবে, যাত্রার দেশগুলোর উপকূলে নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় অভিবাসীরা ক্রমেই বেশি ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আবহাওয়া খারাপ থাকলেও তারা শীতের সময় সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন।
চলতি বছরের শুরু থেকে জানুয়ারি মাসেই সবচেয়ে বেশি অভিবাসী মারা গেছেন। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে প্রায় ৪৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ঝড় হ্যারি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আঘাত হানার সময় তিউনিশিয়া থেকে প্রায় ৩০টি নৌকা যাত্রা করেছিল। বেশ কয়েকটি এনজিওর তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় এক হাজার অভিবাসী নিখোঁজ হন।
সমুদ্রে অভিবাসীদের উদ্ধারে নিয়োজিত জাহাজগুলোর কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার নীতির বিষয়টিও নিয়মিতভাবে সামনে আনছে বিভিন্ন এনজিও।
২০২৩ সালে ইতালির গৃহীত পিয়ান্তেদোসি ডিক্রি কার্যকর হওয়ার পর মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এই আইনে উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার পর জাহাজগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত বন্দরের দিকে রওনা হতে বলা হয়।
অনেক সময় এসব বন্দর উদ্ধার ও অনুসন্ধান এলাকার বা এসএআর জোন থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হয়।
এর ফলে এনজিওগুলোকে অনেক সময় উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ করতে হয় এবং পরে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বন্দরে পৌঁছাতে হয়। এমনকি জাহাজে থাকা অভিবাসীদের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও এই নিয়ম থেকে ছাড় পাওয়া যায় না।
এপ্রিলের শুরুতে এসওএস মেদিতেরানের অপারেশন পরিচালক সোয়াজিক দুপুই বলেন, “পিয়ান্তেদোসি ডিক্রি আমাদের কার্যক্রম জটিল করে তুলেছে। ১০ বছরে আমরা সমুদ্রে ৫৯১ দিনের কার্যক্রম হারিয়েছি। এসএআর জোন থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের অজুহাত ব্যবহার করা হয়।”
২০২৫ সালে এসওএস মেদিতেরানের মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে ৭১ বার দূরবর্তী বন্দরের দিকে যেতে বাধ্য করা হয়। এতে তাদের ১১৭ হাজার ৫০৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এবং অতিরিক্ত ৩১৮.৫ দিন সমুদ্রে থাকতে হয়েছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় লিবিয়ার কোস্টগার্ডের নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসীদের আটকানোর কার্যক্রম জোরদার করার বিষয়টিও সমালোচনার মুখে রয়েছে। লিবিয়ার কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিবাসী বা উদ্ধারকারী জাহাজের দিকে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
এনজিও অ্যালার্ম ফোন জানায়, গত ছয় মাসে আমরা বারবার দেখেছি যে অভিবাসীদের নৌকা এবং মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলো লিবিয়ার বাহিনী ও বিভিন্ন মিলিশিয়ার হামলার শিকার হয়েছে।
জার্মান এনজিও সি-ওয়াচ অভিযোগ করেছে, মে মাসে লিবিয়ার কোস্টগার্ড তাদের সি-ওয়াচ ৫ জাহাজের ক্রুদের লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি চালিয়েছে। ওই সময় জাহাজটির কর্মীরা সমুদ্রে ৯০ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে তাদের সহায়তা করছিলেন।
এমআরএম
বিজ্ঞাপন