বিজ্ঞাপন
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। তবে বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধীর হার, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের সংকট, কম বিদেশি বিনিয়োগ ও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি- সব মিলিয়ে এই লক্ষ্য অর্জনের পথে রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতির বর্তমান আকার অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দ্বিগুণ করতে যেখানে বছরে প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, সেখানে সাম্প্রতিক হার রয়েছে ৪ শতাংশের নিচে। ফলে শুধু বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, বাড়াতে হবে বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতাও। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য রেখে জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন কতটা বাস্তবসম্মত এবং তা অর্জনে কী ধরনের নীতি ও সংস্কার প্রয়োজন, এসব নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন।
আরও পড়ুন
১২০ দিনের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে এফবিসিসিআই নির্বাচন আয়োজনই প্রথম অগ্রাধিকার
জাগো নিউজ: বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় এই লক্ষ্য কতটা অর্জনযোগ্য?
এম এম আকাশ: নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ছিল প্রায় ৫০ হাজার ১০০ কোটি (৫০১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। অর্থাৎ আগামী আট বছরে অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে।
এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় সাড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ জানিয়েছে।
অর্থাৎ এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার প্রায় তিনগুণ বাড়াতে হবে। এখানে বড় প্রশ্ন হলো- আমরা কি শুধু সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেব, না কি বিদ্যমান বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবো? আমার বিবেচনায় দ্বিতীয় বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
জাগো নিউজ: এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এম এম আকাশ: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে বৈদেশিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। বাকি অংশ নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর। বাংলাদেশ যেহেতু মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করে, তাই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে কী ঘটছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে, সেটির ওপর আমাদের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন
হবিগঞ্জে ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনীতির মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে কোনো বড় অর্থনৈতিক লক্ষ্যই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে হলে রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।
রপ্তানি আয় দ্বিগুণ করতে হলে আমাদের দেখতে হবে, কোন ভূ-রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে ভালোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে এমন উৎপাদন কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে পণ্যের দাম ও মান দুদিক থেকেই আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারি।
জাগো নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাংলাদেশের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার পথে কতটা সহায়ক হতে পারে?
এম এম আকাশ: বাংলাদেশ যদি এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে চায়, তাহলে আমি মনে করি সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি করলে আমাদের সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। ফলে আমদানিনির্ভর রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়বে।
উদাহরণ হিসেবে এলএনজির কথা বলা যায়। ভারত বা চীন থেকে এলএনজি আমদানি করলে যে ব্যয় হবে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে একই পণ্য আমদানি করলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় বেশি হতে পারে। এর সঙ্গে পরিবহন ও লিড টাইমের (সময়কাল) বিষয়ও রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোথা থেকে সবচেয়ে কম ব্যয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায়, তা বিবেচনা করা। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোথা থেকে সবচেয়ে কম ব্যয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচামাল সংগ্রহ করা যায় তা বিবেচনা করা
জাগো নিউজ: তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ভারতের মতো কোনো একটি দেশের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিত নয়?
এম এম আকাশ: অবশ্যই নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হওয়া উচিত- ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ সব দেশের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখা। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের কৌশল হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী।
জাগো নিউজ: সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন?
এম এম আকাশ: অবশ্যই। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি হয়ে থাকলে বা হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকলে, সেটির প্রতিটি দিক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো সামরিক চুক্তিকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। বিশেষ করে যদি বিদেশি যুদ্ধজাহাজের বাংলাদেশের বন্দরে এসে জ্বালানি বা লজিস্টিক সহায়তা নেওয়ার মতো বিষয় থাকে, তাহলে এর কৌশলগত তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে।
আমি মনে করি, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় সংসদে উন্মুক্ত ও গভীর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
শিল্পখাতের টেকসই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করতে চাই
জাগো নিউজ: চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন?
এম এম আকাশ: অবশ্যই প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো সামরিক বা কৌশলগত সম্পর্কে যায়, যেটিকে চীন তার স্বার্থের বিরুদ্ধে মনে করে, তাহলে চীনের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আমরা যে সহযোগিতা আশা করছি তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশের অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে অংশগ্রহণ, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ ও বঙ্গোপসাগরে সহযোগিতার মতো বিষয়ও রয়েছে। তাই কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে গিয়ে অন্য একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ভালো হবে না।
জাগো নিউজ: বৈদেশিক অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা কীভাবে দেখছেন?
এম এম আকাশ: অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বর্তমানে বেশকিছু গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি। আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তারা কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য- প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করছে। কেউ কেউ ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছে, কিন্তু তা পরিশোধ করেনি। ফলে ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়েছে এবং ঋণখেলাপি সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
আরও পড়ুন
কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতায় ঘুরছে দেশি সাইকেলের চাকা
আমাদের অর্থনীতিকে এই সংকীর্ণ মালিকানা ও ক্ষমতার কাঠামো থেকে বের করে আনতে হবে। সঞ্চয় ও পুঁজি যেন বৃহৎ কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়ে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
জাগো নিউজ: বিনিয়োগের বর্তমান পরিস্থিতি কি এক ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট?
এম এম আকাশ: মোটেও নয়। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিডিপিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অনুপাত ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জুন, ২০২৬-এ বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ এখনো অনুকূল নয়। বিনিয়োগ না বাড়িয়ে ১০ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, বিনিয়োগ কতটা উৎপাদনশীল এবং কতটা মূল্য সংযোজন করছে, সেটিও দেখতে হবে।
শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ/ছবি: জাগো নিউজ
জাগো নিউজ: বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন?
এম এম আকাশ: এখানেও আমরা খুব ভালো অবস্থানে নেই। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ১৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। এটি মোট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ।
বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত অন্তত ৩ শতাংশ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটি শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। আরেকটি বিষয় হলো, যে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে তার একটি বড় অংশই পুনঃবিনিয়োগ। অর্থাৎ নতুন গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা এখনো বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারিনি।
জাগো নিউজ: তাহলে গ্রিনফিল্ড (নতুন প্রকল্প) বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধান বাধা কোথায়?
এম এম আকাশ: স্থানীয় বিনিয়োগের পরিবেশই যখন দুর্বল, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন। বিদেশি উদ্যোক্তারা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেখানে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
শিল্প স্থাপনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্য এমন পর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে আমাদের শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বেশি হয় এবং উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক না থাকে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী হবেন না।
আরও পড়ুন
‘ভিসিয়াস সাইকেলে’ আটকে গেছে দেশের অর্থনীতি
জাগো নিউজ: শিল্পের জ্বালানি ব্যয় কমাতে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি?
এম এম আকাশ: প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট শিল্পে, নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট শর্তের আওতায় জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো।
বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ সব সময় এ ধরনের উদ্যোগ সমর্থন নাও করতে পারে। কারণ তাদের অর্থনৈতিক দর্শনের বড় অংশ বাজারনির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশের নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা থাকা জরুরি।
জাগো নিউজ: এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব কতটা?
এম এম আকাশ: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। শুধু জিডিপি বাড়ালেই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে হবে। বাংলাদেশের বড় শক্তি হচ্ছে বিপুল শ্রমশক্তি। কিন্তু শুধু সস্তা শ্রম থাকলেই হবে না, সেই শ্রমশক্তিকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল করতে হবে।
আরও পড়ুন
সানলাইফে ‘কাগুজে’ সম্পদের পাহাড়, গ্রিন ডেল্টার ৮৫০ কোটি টাকা উধাও
এখানে ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে এবং ভিয়েতনাম তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও ভিয়েতনাম দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশের শ্রমিকদের তুলনায় বেশি। একজন ভিয়েতনামি শ্রমিক বছরে জিডিপিতে প্রায় চার হাজার ৭০০ থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার মূল্য সংযোজন করেন। বাংলাদেশের একজন শ্রমিকের ক্ষেত্রে তা প্রায় চার হাজার ১০০ থেকে চার হাজার ২০০ ডলার। অর্থাৎ উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম আমাদের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এগিয়ে।
জাগো নিউজ: ভিয়েতনামের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেশি হওয়ার কারণ কী?
এম এম আকাশ: শুধু কারিগরি প্রশিক্ষণ নয়, এর সঙ্গে জীবনযাত্রার মানও জড়িত। ভিয়েতনাম শ্রমিকদের জীবনধারণ উপযোগী মজুরি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন ও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। একজন শ্রমিক যদি পুষ্টিহীনতায় ভোগেন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা না পান, ভালো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না পান, তাহলে তার উৎপাদনশীলতা বেশি হবে কীভাবে?
বাংলাদেশকেও শ্রমিকের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারলে একই সঙ্গে দুটি সুবিধা পাওয়া যাবে। দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠিয়ে রেমিট্যান্স আয়ও বাড়ানো যাবে।
বিভিন্ন দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান/ছবি: এআই নির্মিত
জাগো নিউজ: ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা কীভাবে দেখছেন?
এম এম আকাশ: বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়নস্তরে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ বা সিএমএসএমই খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিকে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং শিল্প খাতের মোট শ্রমশক্তির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত এখাতে নিয়োজিত। কিন্তু জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ২৭ শতাংশের মতো।
অন্যদিকে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে এসএমই খাতকে বৃহৎ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। জাপানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ, চীনে ৬০ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। বাংলাদেশেও বৃহৎ শিল্পের সঙ্গে সিএমএসএমই খাতের কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে।
আরও পড়ুন
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা-আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ
জাগো নিউজ: ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী?
এম এম আকাশ: ব্যাংকিং খাত ঋণখেলাপি সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হবে। সামান্য কয়েকজন বৃহৎ পুঁজিপতির স্বার্থে ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালিত হলে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্যাংকের সঞ্চয় ও পুঁজি উৎপাদনশীল খাতে যেতে হবে। বিশেষ করে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়াতে হবে। বর্তমানে সম্ভাবনাময় অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মূলধন ও সরকারি অবকাঠামোর অভাবে এগোতে পারছে না।
ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ ও কার্যকর না করতে পারলে বিনিয়োগ বাড়বে না, আর বিনিয়োগ না বাড়লে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্নও বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
জাগো নিউজ: আপনি অর্থনীতিতে ‘নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের’ প্রয়োজনের কথা বলেছেন। কেন?
এম এম আকাশ: বর্তমানে দেশের অর্থনীতির ওপর অতি ধনী, সংকীর্ণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও স্বজনতোষণকারী আমলা-ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদদের একটি ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামোর প্রভাব রয়েছে। এই কাঠামো থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক নীতি এমন হতে হবে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আমাদের এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দরকার, যারা অর্থনীতিকে বৃহৎ কয়েকটি গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালনা না করে দেশের উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী, উদ্যোক্তা ও শ্রমশক্তিকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করবেন।
আরও পড়ুন
রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচকে ফেরাই হবে বড় প্রাপ্তি
জাগো নিউজ: ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে সরকারের সবচেয়ে জরুরি করণীয় কী হওয়া উচিত?
এম এম আকাশ: প্রথমত, শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করলে হবে না, উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতকে ঋণখেলাপি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, সিএমএসএমই খাত ও আধুনিক কৃষিকে অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, নিরবচ্ছিন্ন ও প্রতিযোগিতামূলক দামে গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। ষষ্ঠত, গ্রিনফিল্ড বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো বিশেষ দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত- কারও ওপরই এককভাবে নির্ভর করা ঠিক হবে না। সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল সাজাতে হবে।
শুধু সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করলে হবে না। আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হবে ও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি শুধু স্বপ্ন হয়ে থাকবে না, বাস্তবে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এমএএস/একিউএফ/ এমএফএ
বিজ্ঞাপন