বিজ্ঞাপন
বন্দরটির নির্মাণ ব্যয় ১৭৫ কোটি টাকা
প্রতিদিন আমদানি হয় ২০০-৩০০ ট্রাক চুনাপাথর
একচেটিয়া চুনাপাথর রপ্তানি করছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা
চুনাপাথর আমদানিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে সিলেটের ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর। প্রতিদিন ২০০-৩০০ ট্রাক চুনাপাথর আমদানি হচ্ছে এই বন্দর দিয়ে। আগে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর খালাস হতো, এখন হচ্ছে ডিজিটাল স্কেলের সাহায্যে। পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর ঘোষণার পর সুবিধা বলতে শুধু এটাই। এই একটি সুবিধা ছাড়া আরও কোনো সুফল পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। পাথর ছাড়া আর কোনো পণ্য আমদানি কিংবা রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়নি এখানে।
আরও পড়ুন
ভোমরা বন্দর দিয়ে এক বছরে ৩১৩ কোটি টাকার টমেটো আমদানি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে শুল্ক স্টেশনটিকে ‘ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর’ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। ভারতের অংশে একটি ‘টিনের ঘর’ ছাড়া আর কোনো স্থাপনা না থাকার পরও ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশের ২৪তম স্থলবন্দর হিসেবে ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন।
‘চুনাপাথর ছাড়া অন্য কোনো পণ্য আমদানি বা রপ্তানি হয় না ভোলাগঞ্জ দিয়ে। সেক্ষেত্রে ভারতের ব্যবসায়ীরা একচেটিয়া চুনাপাথর রপ্তানি করছেন। শুধু বাংলাদেশ পাথরের বিপরীতে রাজস্ব পাচ্ছে। চুনাপাথর কিনতে আমদানিকারকদের ডলারে দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে’
ওই সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা স্থলবন্দর নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেসময় ব্যবসায়ীরা দাবি করেছিলেন, লুটপাটের জন্যই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভারত থেকে শুধু চুনাপাথরের জন্য এত বড় বন্দরের প্রয়োজন নেই।
সূত্র জানায়, ২০০৫ সাল থেকে ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে চুনাপাথর আমদানি শুরু হয়। এতে ভোলাগঞ্জের ওপারে ভারতের খাসি হিলস জেলার মাজাই এলাকার ব্যবসায়ীরা পাথর রপ্তানি করছেন। তারা ১৬০ কিলোমিটার পথ ঘুরে সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর ব্যবহার না করে সহজে ভোলাগঞ্জ ব্যবহার করতে পারছেন। সেজন্য স্টেশনটি চালু করা হয়।
আরও পড়ুন
আখাউড়া স্থলবন্দর / তলানিতে রাজস্ব আয়, বন্ধ অনেক ব্যবসা
সূত্রের তথ্য বলছে, দুদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে চুনাপাথর আমদানি রপ্তানি শুরুর ২০ বছর পরও ভারত অংশে কোনো স্টেশন কিংবা বন্দর গড়ে ওঠেনি। অথচ বাংলাদেশ অংশে শুল্ক স্টেশন বিলুপ্ত করে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সেখানেও বন্দর থাকার কথা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুনাপাথর ছাড়া অন্য কোনো পণ্য আমদানি বা রপ্তানি হয় না ভোলাগঞ্জ দিয়ে। সেক্ষেত্রে ভারতের ব্যবসায়ীরা একচেটিয়া চুনাপাথর রপ্তানি করছেন। শুধু বাংলাদেশ পাথরের বিপরীতে রাজস্ব পাচ্ছে। চুনাপাথর কিনতে আমদানিকারকদের ডলারে দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে।
‘তৎকালীন সরকার ভারতকে খুশি করতে ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর নির্মাণ করেছে। ভোলাগঞ্জ দিয়ে চুনাপাথর ছাড়া অন্য কিছু আমদানি করা হয় না। তা জানার পরও স্থলবন্দর করা হয়েছে। মূলত লুটপাট করতেই এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে শেখ হাসিনার সরকার’—আমদানিকারক
২০১৯ সালে ভোলাগঞ্জ স্থলশুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর ঘোষণার চার বছর পর জমি অধিগ্রহণসহ নানা ঝামেলা চুকিয়ে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থলবন্দর নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেসময় তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার জানিয়েছিল, স্থলবন্দরটি উদ্বোধন হলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
আরও পড়ুন
ঢিমেতালে চলছে বিবিরবাজার স্থলবন্দর
উদ্বোধনের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর শুধু আমদানি-রপ্তানিকেন্দ্রিক নয়; এটি পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে ভ্রমণপিপাসুদের কথা মাথায় রেখে বন্দরের ভেতরে আধুনিক ক্যাফেটেরিয়া, মসজিদ, কাঁচঘেরা দোতলা পোর্ট ভবন, তিনতলা মাল্টি এজেন্সি ভবন, একটি গেস্ট হাউজ, দুটি ডরমেটরি ও একটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে।
পর্যটকদের সুবিধার জন্য রাখা হয়েছে পার্কিং, চিকিৎসাসেবা, খাবার ও থাকার ব্যবস্থা। প্রতিটি স্থাপনার জন্য আলাদা সড়ক ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
‘বন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদনি করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো পণ্য আমদানি না করায় শুধু চুনাপাথরই আমদানি করা হয়’—বন্দরের সহকারী পরিচালক
সরেজমিন দেখা গেছে, স্থলবন্দরটি উদ্বোধনের পর ক্যাফেটেরিয়া লিজ দেওয়া হয়েছে। সেখানে পানসী রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে। এই রেস্টুরেন্ট ও মসজিদ ছাড়া সেখানকার কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারেন না পর্যটকরা।
আরও পড়ুন
বেনাপোল বন্দর দিয়ে কমছে রপ্তানি, সংকটে সিঅ্যান্ডএফ-শ্রমিকেরা
স্থলবন্দরটি ঘুরে দেখা যায়, সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের ঠিক গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর। দৃষ্টিনন্দন তিনটি কাঁচের ভবন, সামনে খালি জায়গা-ফুলের বাগান। বন্দরের পেছনের অংশে ভারত-বাংলাদেশ শূন্যরেখা। সেখানে বিশাল খালি জায়গা।
আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও ভবনগুলোতে নেই কর্মচাঞ্চল্য। অনেকটা ফাঁকা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ চুনাপাথর আসে সেগুলো, ওইদিনই খালাস করে দেওয়া হয়।
ভোলাগঞ্জ চুনাপাথর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাহাব উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘তৎকালীন সরকার ভারতকে খুশি করতে ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর নির্মাণ করেছে। ভোলাগঞ্জ দিয়ে চুনাপাথর ছাড়া অন্য কিছু আমদানি করা হয় না। তা জানার পরও স্থলবন্দর করা হয়েছে। মূলত লুটপাট করতেই এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে শেখ হাসিনার সরকার।’
আরও পড়ুন
১৩ বছরেও চালু হয়নি ইমিগ্রেশন, সম্ভাবনা হারাচ্ছে সোনাহাট বন্দর
তিনি আরও বলেন, ‘শুল্ক স্টেশন থাকা অবস্থাতেও ২০০-৩০০ ট্রাক পাথর আমদানি করা হতো। এখনো একই পরিমাণে চুনাপাথর আমদানি হচ্ছে। স্থলবন্দরের সুবিধা বলতে আলাদা কিছু নেই। কর্মকর্তারা গেস্ট হাউজ ব্যবহার করেন। সব সুবিধা তাদের।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী মুর্শেদ আলম বলেন, ‘ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর দিয়ে শুধু চুনাপাথর আমদানি করা হয়। অন্য কোনো পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় না। ২০ বছর ধরেই শুধু চুনাপাথরই আমদানি হচ্ছে।’
এ বিষয়ে ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে স্থলবন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি চলছে। এখন প্রতিদিন তিন শতাধিক ট্রাক চুনাপাথর চুনাপাথর ভারত থেকে আমদানি করা হয়। প্রতিটি ট্রাকে ১১-১২ টন পাথর থাকে।’
আরও পড়ুন
বুড়িমারী বন্দর থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন পাথর ব্যবসায়ীরা
তিনি আরও বলেন, ‘বন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদনি করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো পণ্য আমদানি না করায় শুধু চুনাপাথরই আমদানি করা হয়।’
বন্দরের ক্যাফেটেরিয়া পানসি রেস্টুরেন্টকে চলতি বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে বন্দরের সহকারী পরিচালক বলেন, ‘প্রতিমাসে দুই লাখ ১৯ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। এছাড়া বন্দরের মসজিদসহ অপারেশন এলাকা ছাড়া অন্যান্য স্থান পর্যটকরা ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।’
এসআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন