বিজ্ঞাপন
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হয়েও পরাধীন থাকার সম্ভাবনা বহুদিন আগে অনুধাবন করেছিলেন তানজানিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা জুলিয়াস নায়ারে। নায়ারে ছিলেন গান্ধীবাদী। ব্রিটিশদের তানজানিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি ভাষণে বলেছিলেন, “ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে দুটি ধাপ পার হতে হয়। একটি হলো যখন মধ্যরাত আসে; ঘড়ির ঘণ্টা বাজে, আর আপনি স্বাধীন হয়ে যান। বেশ। কিন্তু তারপর পরিস্থিতি বদলানোর এবং মানুষকে বদলানোর একটা পুরো প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের বলেছি যে দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি সহজ নয়।
মধ্যরাতের পর একটা বিষয় অবশ্যই বদলাতে হবে, তা হলো ঔপনিবেশিকদের মানসিকতা, আফ্রিকানদের তুচ্ছজ্ঞান করার দৃষ্টিভঙ্গি। ঔপনিবেশিক শাসনাধীন মানুষেরা এখন নিজেরাই শাসক, এবং সেটা সাধারণ পথচারীকেও দেখতে হবে, বুঝতে হবে! তারা যদি তার মুখে থুথু ছিটিয়ে থাকে, তবে এখন তা বন্ধ হতে হবে! মধ্যরাতের পর!” কিছুই পাল্টায় নাই মধ্যরাতের পর। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানুষেরাও এখনো নায়ারের কথা বুঝতে পারেনি। এখনো তারা নিজেদের দুর্বলতার কারণে পশ্চিমাদের ছোড়ানো থুথু মুখে নিয়ে হাঁটছে।
এখনো পশ্চিমারা সভ্য দেশ হয়েও দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি এত অসভ্য আচরণ ধারণ করে কী করে! অসংখ্য উদাহরণ আছে তাদের হায়েনার মতো দাঁত প্রদর্শনের। কথা নেই, বার্তা নেই—কী সুন্দর ভেনেজুয়েলায় সেনা পাঠিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তাঁর স্ত্রীসহ ধরে নিয়ে কারাগারে পুরে রাখল। তাও সেটা যদি আদর্শের সংঘাতের কারণে হতো, এক কথা ছিল। না, দেশটিতে বিশাল তেলের ভান্ডার; যুক্তরাষ্ট্র খাবে, পেটে অনেক ক্ষুধা!
ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে কীভাবে আরব দেশগুলোকে চোখের সামনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে, দেখলাম। কীভাবে আফ্রিকায়, পূর্ব ইউরোপে এবং এশিয়ায় দেশগুলোর সরকার পছন্দ না হলেই ছলে-বলে-কৌশলে, নিষ্ঠুরতায়, মিথ্যাচার করে রেজিম চেঞ্জ করে দেয়, তা-ও আমরা দেখে আসছি। এই পশ্চিমের দেশগুলো ভৌগোলিকভাবে কলোনি ছেড়ে গেলেও গাউনের নিচে লুকিয়ে রাখা ছোরাটা এখনো লুকানো আছে, সুযোগ পেলেই বা স্বার্থে আঘাত লাগলেই ব্যবহার করে।
কিন্তু কী অদ্ভুত বৈপরীত্য, এই দেশগুলোতেই নিজের ঘরে অবারিত বাক্স্বাধীনতা মানুষ উপভোগ করে! নাগরিক থেকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো যে স্বাধীনতা ভোগ করে, তা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অকল্পনীয়। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মেয়ারশায়ার বা কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেফ্রি স্যাকসের মতো অসংখ্য উদাহরণ আছে। এমনকি অতি সাধারণ মানুষের বাক্স্বাধীনতাও ওই অধ্যাপকদের সমানই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ন্যূনতম ক্ষমতা নেই কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে আইনের বাইরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার। বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রধান সিনেট হিয়ারিং কমিটির সামনে গিয়ে থরথর করে কাঁপেন। তিনি কোনো দিন কল্পনাও করেন না যে একজন রাস্তার লোকের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হলে তিনি সেই লোকটিকে আইনের বাইরে কোনো সাজা দিতে পারবেন! যে কোনো নাগরিক রাষ্ট্রের যে কোনো অর্গানের তীব্র সমালোচনা করতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে। এমনকি অতি সাধারণ মানুষও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিসহ যে কোনো বিচারকের সমালোচনা করতে পারে। সে অধিকার দেশটির সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতেই দেওয়া আছে। এটাই পশ্চিমা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
আর এই শক্তিতেই তারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে সবক দিয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, এই গণতান্ত্রিক শক্তি, বাক্স্বাধীনতার শক্তি ব্যবহার করেই কি তারা আফ্রিকা-এশিয়ার দেশগুলোতে গণতন্ত্র রপ্তানি করতে চায়? এক কথায় উত্তর হলো, না। এটি হলো তাদের একটি হাতিয়ার। নিজেদের দেশে এর সৎ ব্যবহার করে, উন্নয়নশীল দেশে একে ত্রিশূলের মতো ব্যবহার করে। তারা ভালো করেই জানে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতি লায়েক হয় নাই। কেউ করতে পারেননি। মহাত্মা গান্ধী পারেন নাই, নেলসন ম্যান্ডেলা পারেন নাই, জুলিয়াস নায়ারে পারেন নাই। তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সভ্য সমাজ গঠনের স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটেছে।
উন্নয়নশীল দেশে তারা দুটি জিনিস টিকিয়ে রাখে পাহারা দিয়ে: একটি বিদ্যালয়ের রাজনীতি, আরেকটি ধর্মের নামে অন্ধত্ব। সময় হলেই তারা এ দুটো জিনিসকে ব্যবহার করে। যে সমাজ যত নীতি-নৈতিকতাহীন থাকে, দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, শিক্ষা কম থাকে—তত সহজ হয় পশ্চিমাদের মুড়িঘণ্ট তৈরিতে। এই যাঁতাকল থেকে যাতে বের হতে না পারে, তার জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকাজে তারা সিস্টেম করে রেখেছে। এর থেকে মুক্তি তৃতীয় বিশ্বের জন্য ‘দিল্লি দূরস্ত’।
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের পথচারীরা তা বোঝে নাই এবং বুঝতে দেওয়া হয় নাই। দুর্বল জাতিগুলোর রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন এবং শীর্ষ পর্যায়ে যারা বসে থাকেন, তারা রাষ্ট্রীয় সমস্ত মেশিনারি ব্যবহার করেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে। এরা রাষ্ট্রীয় সম্পদের এত অপব্যবহার করেন এবং নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভারী করেন যে ক্ষমতা ছাড়তে ভয় পান। এই সকল জাতির বৈশিষ্ট্য হলো, এরা পুলিশকে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে। আর মিলিটারি থাকে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে। প্রশাসন চলে দলীয় কার্যালয়ের মতো। বিচার বিভাগ থাকে আজ্ঞাদাস হয়ে। বিচার বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয় দলদাসদের।
আর এই সুযোগটিই আজও গ্রহণ করে চলেছে পশ্চিমা সভ্য জাতিগুলো, যারা নিজেদের জনগণকে সভ্য বানিয়েছে, কিন্তু পিছিয়ে থাকা জাতিগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রকৃত অর্থে জনগণের কোনো শক্তি থাকে না শাসন পরিবর্তন করার। পরিবর্তন হয় শক্তিশালী দেশগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছায়। পরিবর্তন হয়ে যে নতুন সরকার আসে, তারা নিমগ্ন হয়ে পড়ে লুটপাট, আখের গোছানো এবং প্রতিশোধ গ্রহণের তাণ্ডবে। পশ্চিমা দেশগুলো এতে মৌন সমর্থন দিতে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের স্বার্থে ব্যাঘাত না ঘটে। তেল-গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদ, অভ্যন্তরীণ বাজারে অবাধে ব্যবসা এবং জিও-স্ট্র্যাটেজিক সহায়তা না পেলেই শুরু হয়ে যায় সরকার পতনের নতুন অধ্যায়।
ওরা খুব ভালো করেই জানে, গণতন্ত্রের মূল শক্তি ভোট নয়, ভোটের পেছনের প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি। যতক্ষণ ওই প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সুষ্ঠু নির্বাচন, বাক্স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার সম্পূর্ণ অধরা থেকে যাবে। লক্ষ্য করবেন, ওরা তৃতীয় বিশ্বের প্রকল্পের ঋণের টাকা কোথায় গেল, কোন খাতে কত খরচ করতে হবে, কতজন বিদেশি কনসালট্যান্ট রাখতে হবে—সে বিষয়ে ঋণগ্রহীতা দেশকে কড়া শর্ত দিয়ে থাকে। কিন্তু কখনো বলে না, তোমার দেশের সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ সঠিক হয়নি। তারা কখনো পরামর্শ দেয় না যে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের লোক নিয়োগ দেওয়া বন্ধ করো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করো।
উন্নয়নশীল দেশে তারা দুটি জিনিস টিকিয়ে রাখে পাহারা দিয়ে: একটি বিদ্যালয়ের রাজনীতি, আরেকটি ধর্মের নামে অন্ধত্ব। সময় হলেই তারা এ দুটো জিনিসকে ব্যবহার করে। যে সমাজ যত নীতি-নৈতিকতাহীন থাকে, দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, শিক্ষা কম থাকে—তত সহজ হয় পশ্চিমাদের মুড়িঘণ্ট তৈরিতে। এই যাঁতাকল থেকে যাতে বের হতে না পারে, তার জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকাজে তারা সিস্টেম করে রেখেছে। এর থেকে মুক্তি তৃতীয় বিশ্বের জন্য ‘দিল্লি দূরস্ত’।
লেখক: সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন