জাতীয়

শামসুর রাহমানের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
6 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯-১৭ আগস্ট ২০০৬) বাংলাদেশের জনপ্রিয় কবি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপসহীন মনোভাব এবং সমাজের বিভিন্ন অসংগতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কবিতার লড়াই তাঁকে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা দিয়েছে। শামসুর রাহমানের বিভিন্ন কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের আগের বিভিন্ন পর্যায়, একাত্তরের রণাঙ্গণ, বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংগ্রামী চেতনার লড়াই এবং স্বাধীনতার প্রতি তীব্র আকুতিসহ সামাজিক দায়বদ্ধতায় অসাম্যের বিরুদ্ধে ঝাঁঝালো বক্তব্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও শিল্পসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে। এ সংক্রান্ত কবিতার আধিক্য ও জোরালো বক্তব্যের জন্যই এবং সংগতকারণেই শামসুর রাহমানকে স্বাধীনতার কবি বলা হয়ে থাকে।‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,তোমাকে পাওয়ার জন্যেআর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?’(তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা) বিশ্বসাহিত্যে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের পক্ষে ও শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে বিখ্যাত কবিরা কবিতা লিখেছেন। সংগ্রামের কবিতা হলো শক্তিশালী পঙক্তি, যা নিপীড়নের প্রতিবাদ, জাতীয় গর্বে অনুপ্রেরণা এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত মানুষের আত্মত্যাগকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে রচিত। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিখ্যাত কবিতা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘সুবাহে আজাদি’ (স্বাধীনতার ভোর, ১৯৪৭) ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের সময় রচিত উর্দু কবিতাটি ব্যাপক রক্তপাত ও দুঃখের মাঝে অর্জিত স্বাধীনতার তিক্তমধুর এবং বেদনাদায়ক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মাখনলাল চতুর্বেদীর ‘পুষ্প কি অভিলাষা’ (একটি ফুলের ইচ্ছা) ১৯২২ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের সময় রচিত একটি বিখ্যাত হিন্দি দেশাত্মবোধক কবিতা; যেখানে মাতৃভূমির জন্য লড়াইরত সাহসী সৈন্যদের পদতলে পিষ্ট হওয়ার একটি ফুলের ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে। শামসুর রাহমান বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন ও আগে-পরের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে কবিতা লিখেছেন। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর নৃশংস দমন-পীড়ন, সে থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম—সর্বোপরি একটি স্বাধীন জাতির জন্মকে প্রতিফলিত করে মর্মস্পর্শী কবিতা লিখেছেন। ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থের বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, হরতাল, আসাদের শার্ট, সন্ধ্যা, রাজকাহিনী, একপাল জেব্রা, দুঃস্বপ্নের একদিন প্রভৃতি কবিতায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন অসংগতি, অত্যাচার, স্বাধীনতা আন্দোলন বা আদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের সংগ্রাম উঠে এসেছে। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে জোরালো উচ্চারণ। এই বইয়ের কবিতাগুলো তৎকালীন মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনে গভীর সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতা দুটি সর্বকালের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও কালজয়ী। এই কবিতাগুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার আবেগ দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। এ ছাড়া তুমি বলেছিলে, গেরিলা, সন্ধ্যা আইন প্রভৃতি কবিতায় বাঙালির সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায় আলোচিত হয়েছে। স্বাধীনতার মহানতা ও জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আরও পড়ুন ‘সালিশ’ শেষ হয় কিন্তু শেষ হয় না হুরবানুর কথার রেশ ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’, ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’, ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’, ‘প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে’, ‘মাতাল মল্লিক’, ‘আমার কোনো তাড়া নেই’, ‘হে অন্ধ সুন্দরী’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো সমাজের বিভিন্ন অনাচার, অত্যাচার, চাপানো-বিষয়াদির কথা উঠে এসেছে—দেশপ্রেম ও মানবতার টানে। বিবেকবান নাগরিক হিসাবে কবিকে অগ্রগামী থাকতে হয়। শামসুর রাহমান এসব কবিতায় সামাজিক দায়বদ্ধতার দিক থেকে মানবতা, সংকট এবং সংকট থেকে উত্তরণ, স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তৈরি করার প্রয়াস ইত্যাদি মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। কিছু কবিতাংশ উল্লেখ করা হলো—(১)‘...মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্টশহরের প্রধান সড়কেকারখানার চিমনি-চুড়োয়গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচেউড়ছে, উড়ছে অবিরামআমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।’(আসাদের শার্ট) (২)‘স্বাধীনতা তুমিরবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।স্বাধীনতা তুমিকাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানোমহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-স্বাধীনতা তুমিশহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভাস্বাধীনতা তুমিপতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।’(স্বাধীনতা তুমি) আরও পড়ুন মহাদেব সাহার কবিতায় নারী ও প্রেম (৩)‘স্বাধীনতা শব্দ এত প্রিয় যে আমারকখনো জানিনি আগে। উঁচিয়ে বন্দুক,স্বাধীনতা, বাংলাদেশ—এই মতো শব্দ থেকে ওরাআমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে সর্বদা।অথচ জানে না ওরা কেউগাছের পাতায়, ফুটপাতেপাখির পালকে কিংবা নারীর দু’চোখেপথের ধুলায়বস্তির দুরন্ত ছেলেটারহাতের মুঠোয়সর্বদাই দেখি জ্বলে স্বাধীনতা নামক শব্দটি।’(বন্দী শিবির থেকে) মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্রে রেখে কাব্যচর্চা বাঙালির এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যয়। বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানও এ ক্ষেত্রে অগ্রগামী এবং প্রতিশ্রুতিশীল। এ ছাড়া সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি, অসাম্য দেখে নিজেকে লুকিয়ে রাখেননি। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অনেক কবিতা লিখেছেন। স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অমানবিকতা থেকে অধিকার আদায় ও মুক্তির জন্য প্রচুর কবিতা লিখেছেন। স্বাধীনতার প্রতি তীব্র আকুলতা লক্ষ্য করা যায়; যখন তিনি বলেন—কীভাবে তাঁকে উপেক্ষা করা যায়:‘পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তেজ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলেনতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিকএই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবেহে স্বাধীনতা’(তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা) এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>