বিজ্ঞাপন
রাজধানীর রাস্তায় নামছে গোলাপি বাস। দূর থেকে দেখলে আর দশটি বাসের মতোই—চাকা আছে, জানালা আছে, হর্ন আছে, যাত্রী উঠবে-নামবে, যানজট ঠেলে এগিয়ে যাবে। কিন্তু গল্পটা একটু আলাদা।
কারণ এই বাসের স্টিয়ারিংয়ে থাকবেন একজন নারী, টিকিট কাটবেন একজন নারী, আর যাত্রীও হবেন মূলত নারীরা।
১৮ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের উদ্যোগে চালু হয়েছে বিশেষ এই ‘পিংক বাস’ বা মহিলা বাস সার্ভিস। রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রামেও চালু হচ্ছে এ সেবা। উদ্দেশ্য একটাই—নারীর নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং পরিবহন খাতে নারীর অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো।
সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও দূরের। একদিন যেন পিংক বাসের প্রয়োজনই না থাকে। একদিন যেন নারীকে নিরাপদ রাখতে আলাদা বাস দিতে না হয়; বরং পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাটাই নিরাপদ হয়। একদিন যেন একজন নারী বাসে উঠলে তাঁকে আলাদা নিরাপত্তা খুঁজতে না হয়।
খবরটি শুনতে যতটা সহজ, এর ভেতরের গল্পটা ততটাই গভীর।
কারণ প্রশ্ন হলো, একটি শহরে নারীর নিরাপদ চলাচলের জন্য আলাদা বাসের প্রয়োজন হলো কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের সমাজের আয়নায় তাকাতে হয়।
একটি গোলাপি বাস, আর আমাদের পুরুষতান্ত্রিক আয়না
নারী বাস চালাবেন—এই একটি তথ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
কেউ উচ্ছ্বসিত। কেউ বলছেন, ‘এটাই তো দরকার ছিল।’ কেউ আবার হাসছেন, ঠাট্টা করছেন। কেউ বাসের রং নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, কেউ নারী চালকের দক্ষতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। আবার কেউ আগেভাগেই ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, ‘কয়েক দিন পর আর থাকবে না।’
এসব মন্তব্যকে শুধু ফেসবুকের বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এগুলো সমাজের ভেতরে থাকা চিন্তার ছোট ছোট জানালা।
নারী ডাক্তার, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, এমনকি পাইলট—এসব এখন আর খুব বেশি বিস্ময়ের বিষয় নয়। কিন্তু গণপরিবহনের চালকের আসনে নারী এখনো অনেকের কাছে ব্যতিক্রম।
কারণ আমাদের সামাজিক কাঠামো এখনো অনেক কাজকে লিঙ্গ দিয়ে মাপতে অভ্যস্ত। কিছু কাজ পুরুষের, কিছু কাজ নারীর—এই অদৃশ্য বিভাজন আমাদের মাথার ভেতরে বহুদিন ধরে বসবাস করছে।
একজন নারী যখন বাসের স্টিয়ারিং ধরেন, তিনি শুধু গাড়ি চালান না; চ্যালেঞ্জ করেন সেই পুরোনো ধারণাকেও।
সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ—নিরাপত্তার জন্য নারীকে আলাদা করতে হচ্ছে
তবু আনন্দের পাশাপাশি প্রশ্ন থাকবেই, নারীকে নিরাপদ রাখতে কি তাকে আলাদা করতেই হবে?
একটি নিরাপদ শহরের স্বাভাবিক চিত্র তো এমন হওয়ার কথা ছিল, যেখানে একই বাসে নারী-পুরুষ সবাই উঠবেন, সবাই নিরাপদ থাকবেন, কেউ কাউকে হয়রানি করবেন না এবং একজন নারী একা বাসে উঠলেও তাঁর মনে ভয় থাকবে না।
কিন্তু আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। তাই আলাদা বাসের প্রয়োজন হচ্ছে। এখানে পিংক বাসকে ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার ওপর একটি প্রয়োজনীয় ব্যান্ডেজ। কিন্তু আমাদের কাজ শুধু ব্যান্ডেজ নিয়ে খুশি হওয়া নয়; ক্ষতটাও সারাতে হবে।
গোলাপি বাস, নাকি আলাদা করে চেনানোর সংস্কৃতি?
আরেকটি প্রশ্নও আছে, নারীর বাস মানেই গোলাপি কেন?
হয়তো এটি সহজে চেনার জন্য। হয়তো ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ। কিন্তু প্রতীকী প্রশ্নটি থেকেই যায়, আমরা কি এখনো নারীকে আলাদা করে চেনাতে ভালোবাসি?
তবে আমার কাছে বাসের রঙের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসা নারীটি।
কারণ গোলাপি বাস একদিন হয়তো সাদা হবে, রুট বদলাবে, নাম বদলাবে। এমনকি একসময় হয়তো এই আলাদা বাসের প্রয়োজনও থাকবে না।
কিন্তু একজন নারী যদি আজ বাস চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, কাল আরও দশজন নারী যদি এই পেশায় আসেন, তাহলে সেই পরিবর্তনটাই থেকে যাবে।
টিকবে তো?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পিংক বাস কতদিন টিকবে?
প্রশ্নটি এসেছে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই। বাংলাদেশে অনেক উদ্যোগ জাঁকজমক করে শুরু হয়। উদ্বোধনের দিন ক্যামেরা থাকে, ব্যানার থাকে, বক্তৃতা থাকে। কয়েক মাস পর পড়ে থাকে শুধু স্মৃতি।
পিংক বাসের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা অমূলক নয়। কারণ সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত সেবার ওপর।
সময়মতো বাস পাওয়া যাবে কি না, পর্যাপ্ত বাস থাকবে কি না, রুট কার্যকর হবে কি না, রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক থাকবে কি না, চালক ও কন্ডাক্টররা প্রশিক্ষণ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ পাবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, পিংক বাস সাময়িক আয়োজন নাকি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা।
প্রথম কয়েক দিন কৌতূহল নিয়ে মানুষ বাসে উঠবেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এক মাস পরও যদি একজন অফিসগামী নারী বলতে পারেন—‘আমি জানি, এই সময় এই জায়গায় গেলে পিংক বাস পাব’, তখনই বলা যাবে, উদ্যোগটি সফল হয়েছে।
নারী চালককে শুধু ‘নারী’ হিসেবে দেখলে চলবে না
পিংক বাসের নারী চালকদের নিয়েও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
একজন পুরুষ বাস চালালে আমরা বলি, তিনি চালক। একজন নারী বাস চালালে কেন বলব, ‘নারী চালক’?
শুরুতে পরিচয়টি হয়তো প্রয়োজন, কারণ এটি নতুন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে নারী চালকও কেবল ‘চালক’। একইভাবে নারী কন্ডাক্টরকে কৌতূহলের বস্তু বানানোও ঠিক নয়।
তারা কোনো প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন না। তারা কাজ করছেন। তাঁদের শ্রমের মূল্য আছে, পেশাগত মর্যাদা আছে, দায়িত্ব আছে। পিংক বাস যদি সত্যিই নারীর ক্ষমতায়নের প্রকল্প হয়, তাহলে নারীকে ‘ব্যতিক্রম’ নয়, ‘পেশাজীবী’ হিসেবে দেখার সংস্কৃতিও তৈরি করতে হবে।পঙ্কিল সময়ে এক টুকরো সুবাতাস
আমাদের চারপাশের সময়টা খুব নির্মল নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা দ্রুত ছড়ায়। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল, বিদ্রূপ, অপমান—সবকিছুই যেন বিনোদনের অংশ হয়ে গেছে। নারীর পোশাক, চলাফেরা, কথা বলা, পেশা—সবকিছু নিয়েই মন্তব্য করার অধিকার যেন সবাই নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। এমন সময়ে রাস্তায় একটি গোলাপি বাস নামা তাই শুধু পরিবহনসেবার খবর নয়।
এটি একটু অন্যরকম দৃশ্য।
একজন নারী সকালে বেরিয়ে বাসের স্টিয়ারিং ধরছেন। আরেকজন নারী টিকিট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে বসে থাকা নারী যাত্রী হয়তো অফিসে যাচ্ছেন, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ হাসপাতালে, কেউ নিজের ব্যবসার কাজে। দৃশ্যটি হয়তো খুব বড় কোনো বিপ্লব নয়।
কিন্তু পরিবর্তন সবসময় বজ্রপাতের মতো আসে না। কখনো কখনো পরিবর্তন আসে নিঃশব্দে—একটি বাসের ইঞ্জিনের শব্দে, একজন নারীর হাতে ধরা স্টিয়ারিংয়ে, একজন যাত্রীর নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তায়।
পঙ্কিল সময়ে হঠাৎ বয়ে যাওয়া এক টুকরো সুবাতাসের মতো।
শেষ পরীক্ষা আমাদেরপিংক বাস কতদিন চলবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এর ভবিষ্যৎ শুধু বিআরটিসির হাতে নেই। আমাদের হাতেও আছে।
নারী যাত্রীকে আমরা কীভাবে দেখি, নারী চালককে কীভাবে দেখি, নারী কন্ডাক্টরের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করি—তার ওপরও নির্ভর করবে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ।
তবে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও দূরের। একদিন যেন পিংক বাসের প্রয়োজনই না থাকে। একদিন যেন নারীকে নিরাপদ রাখতে আলাদা বাস দিতে না হয়; বরং পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাটাই নিরাপদ হয়। একদিন যেন একজন নারী বাসে উঠলে তাঁকে আলাদা নিরাপত্তা খুঁজতে না হয়।
আর সেই দিন, হয়তো গোলাপি বাস থাকবে না। কিন্তু থাকবে তার রেখে যাওয়া পরিবর্তন। প্রশ্নটা তাই শুধু পিংক বাস টিকবে কি না, তা নয়। বরং পিংক বাস আমাদের কতটা বদলাতে পারবে?
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন