জাতীয়

নায়ক ফারুকের নামের সঙ্গে যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
10 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। দর্শকের কাছে যিনি ‘মিয়াভাই’ নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। আজ (১৮ আগস্ট) এ নায়কের জন্মদিন। ফারুক দীর্ঘ অভিনয়জীবনে কখনো প্রতিবাদী যুবক, কখনো প্রেমিক, কখনো কৃষক কিংবা সংগ্রামী সাধারণ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে মুগ্ধ করেছেন দর্শককে। তবে ‘ফারুক’ নামটি যে তার জন্মনাম নয়, সেটি হয়তো অনেকেরই অজানা। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফারুক। ছবি: সংগৃহীত ফারুকের প্রকৃত নাম ছিল আকবর হোসেন পাঠান দুলু। ষাটের দশকের উত্তাল সময়ে ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে একপর্যায়ে পুলিশের খাতায় ‘ওয়ান্টেড’ হয়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করার সময় নিজের আসল নাম ব্যবহার করা নিরাপদ মনে করেননি তিনি। তখনই বন্ধু ও সহকর্মীদের পরামর্শে তার নাম হয়ে যায় ‘ফারুক’। ২০১৬ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের নাম পরিবর্তনের সেই গল্প জানিয়েছিলেন এই অভিনেতা। তিনি বলেছিলেন, ছয় দফা আন্দোলনের পর তিনি পুলিশের কাছে ‘ওয়ান্টেড’ ছিলেন। তাই চলচ্চিত্রে নতুন নামে পরিচিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের জন্য ছোট ও সহজ নাম রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় রাজ্জাক, উজ্জ্বলদের মতো সংক্ষিপ্ত নামের উদাহরণও সামনে এসেছিল। একসময় নিরাপত্তার প্রয়োজনে নেওয়া সেই নামই পরে হয়ে ওঠে তার স্থায়ী পরিচয়। ‘আকবর হোসেন পাঠান দুলু’ নামটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়, আর কোটি দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ফারুক’। চলচ্চিত্রে ফারুকের অভিষেক হয় ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে। তবে অভিনয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে খুব দ্রুতই তিনি দর্শকের নজরে আসেন। ১৯৭৫ সালে খান আতাউর রহমানের ‘সুজন সখী’ সিনেমায় অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। সিনেমাটিতে সুজন চরিত্রে তার আবেগঘন অভিনয় এবং কবরীর সঙ্গে জুটি দর্শকের মনে বিশেষ জায়গা করে নেয়। আরও পড়ুন সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেলের আলোচনায় ভাইরাল হয়েছে যে গান এরপর আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ সিনেমায় নয়ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন ফারুক। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বউ’ সিনেমায় কদম সারেং চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। গ্রামীণ মানুষের জীবন, আবেগ, সংগ্রাম ও বঞ্চনার গল্পে ফারুক যেন হয়ে উঠতেন সেই মানুষেরই একজন। সত্তর ও আশির দশকে একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি। ‘লাঠিয়াল’, ‘আবির্ভাব’, ‘লাল কাজল’, ‘নয়নমণি’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বউ’সহ অসংখ্য সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার দক্ষতা, সংলাপ বলার স্বাভাবিক ভঙ্গি এবং চোখের ভাষা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। আরও পড়ুন প্রবীর মিত্রের স্ত্রী কেন চাননি তাদের সন্তানরা অভিনয়ে আসুক? অভিনয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন ফারুক। ‘লাঠিয়াল’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান তিনি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের সম্মান হিসেবে ২০১৮ সালে তাকে দেওয়া হয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা। তবে ‘ফারুক’ নামের সঙ্গে আরেকটি পরিচয় এমনভাবে মিশে গেছে, যা আজও দর্শকের মুখে মুখে- ‘মিয়াভাই’। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘মিয়াভাই’ সিনেমার মাধ্যমে এই নামটি তার সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী সেই চরিত্র দর্শকের কাছে এতটাই আপন হয়ে উঠেছিল যে বাস্তব জীবনেও ফারুককে অনেকে ‘মিয়াভাই’ বলে ডাকতেন। অভিনয়ের বাইরে ফারুক ছিলেন রাজনীতিসচেতন ও সমাজসচেতন মানুষ। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জীবনের শেষ অধ্যায় অবশ্য ছিল নানা শারীরিক জটিলতায় ঘেরা। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৩ সালের ১৫ মে মারা যান এই কিংবদন্তি অভিনেতা। ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার এক গ্রামে জন্ম নেওয়া ফারুক বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকায়। শৈশব-কৈশোরের অভিজ্ঞতা, মানুষের জীবনযাপন এবং চারপাশের সমাজ তাকে পরবর্তী সময়ে একজন শক্তিশালী অভিনেতা হয়ে উঠতে সহায়তা করে। আজ তার জন্ম ও মৃত্যুর দিন ঘিরে, কিংবা তার অভিনীত সিনেমা ফিরে দেখার সময়, দর্শকের মনে বারবার ফিরে আসে ‘মিয়াভাই’ ফারুকের কথা। তবে তার নামের গল্পটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাল সময়, পুলিশের চোখ এড়িয়ে নতুন পরিচয়ে চলচ্চিত্রে প্রবেশ এবং সেই নামেই কিংবদন্তি হয়ে ওঠা- ‘ফারুক’ নামের সঙ্গে তাই জড়িয়ে আছে ব্যক্তিজীবন, চলচ্চিত্র ও বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়। একসময় নিরাপত্তার প্রয়োজনে নেওয়া যে নামটি ছিল কেবল একটি পরিচয়, সময়ের পরিক্রমায় সেটিই হয়ে ওঠে কোটি মানুষের প্রিয় নায়ক ফারুকের নাম। আর ‘মিয়াভাই’ পরিচয়ের মধ্য দিয়ে সেই নাম আজও বেঁচে আছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে। এমএমএফ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>