বিজ্ঞাপন
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত বিশ্বকাপ বাণিজ্যিক পরিকল্পনাকে ঘিরে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। এর মধ্যেই ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (চিফ অপারেটিং অফিসার- সিওও) কেভিন ল্যামুর দায়িত্ব ছাড়লেন। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ল্যামুরের বিদায়কে অনেকেই ইনফান্তিনোকে ঘিরে চলমান বিতর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি দাবি করেছিলেন, বিশ্বকাপ পরিচালনাকারী একটি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে ফিফার প্রশাসনকে ‘বিভ্রান্ত’ করা হয়েছিল।
ইনফান্তিনোর প্রস্তাব ছিল, বিশ্বকাপ আয়োজন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন কোম্পানি গঠন করে তার অংশীদারিত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা। তবে শুরু থেকেই পরিকল্পনাটি ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পড়ে। ফিফার তিনটি মহাদেশীয় কনফেডারেশন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং শেষ পর্যন্ত ইনফান্তিনোকে পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হতে হয়।
বিতর্ক এতটাই তীব্র আকার ধারণ করে যে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা একপর্যায়ে ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জনের হুমকিও দেয়। পরে তিন কনফেডারেশনের সভাপতি এক যৌথ খোলা চিঠিতে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার’ অভিযোগ তোলেন।
ফিফার এক মুখপাত্র সোমবার এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘ফিফা নিশ্চিত করছে যে কেভিন লামুরের সঙ্গে প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মসম্পর্ক ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে শেষ হয়েছে। গত দুই বছরের সেবার জন্য আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই এবং ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানাই।’
তবে ফিফা এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা পিএ জানিয়েছে, ল্যামুরের বিদায়ের আগে ফিফা মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম কর্মীদের কাছে একটি ই-মেইল পাঠান। সেখানে ল্যামুরের অবদান, বিশেষ করে ফুটবলের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তার ভূমিকার প্রশংসা করা হয়।
ল্যামুরের বিদায়ের দিনই ইনফান্তিনো আরেকটি বড় ধাক্কা খান। স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এসএফএ) প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়, তারা আগামী নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে সমর্থন করবে না।
এসএফএর প্রধান নির্বাহী ইয়ান ম্যাক্সওয়েল বলেন, ‘স্কটিশ এফএ জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ভোট দেবে না। এটি উয়েফার অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আমরা শুরু থেকেই একই অবস্থানে আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফুটবলের একজন প্রশাসকের এত ঘনঘন ক্যামেরার সামনে থাকার কথা নয়। যদি বিশ্বকাপের মতো সফল একটি টুর্নামেন্টের পর আলোচনা মাঠের খেলা থেকে সরে গিয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাগুলোতে চলে যায়, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও সমস্যা হয়েছে।’
ম্যাক্সওয়েলের মতে, ফিফার প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে যথেষ্ট যোগাযোগও রাখা হয়নি।
‘শাসনব্যবস্থায় দুর্বলতা ছিল, স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঘাটতি ছিল। এগুলো পরিবর্তন করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।
চাপের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ‘ফেয়ারস্কয়ার’ নামের একটি আন্তর্জাতিক অধিকারভিত্তিক সংগঠন। তারা প্রশ্ন তুলেছে, ইনফান্তিনোর আদৌ আবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার আছে কি না।
ফিফার বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একজন সভাপতি সর্বোচ্চ তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে ২০২২ বিশ্বকাপের আগে ফিফা দাবি করেছিল, ২০১৬ সালে সেপ ব্ল্যাটারের উত্তরসূরি হিসেবে ইনফান্তিনো যে প্রথমবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেটি পূর্ণ মেয়াদ হিসেবে গণ্য হবে না।
ফিফার সাবেক গভর্ন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান মিগুয়েল মাদুরো এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন। তার মতে, ২০২৭ সালের নির্বাচন হলে সেটি হবে ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচন, যা ফিফার গঠনতন্ত্রের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মাদুরো বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, গঠনতন্ত্রের ভাষা খুবই স্পষ্ট। ২০২৭ সালে নির্বাচন হলে সেটি কার্যত তার চতুর্থ মেয়াদের নির্বাচন হবে।’
ফেয়ারস্কয়ার ইতোমধ্যে ফিফার রিভিউ কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। এই কমিটিই সভাপতির প্রার্থীদের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে।
তবে ইনফান্তিনোর বিরোধীরা আপাতত দুই পথ খোলা রেখেছে। প্রথমত, তাকে পদত্যাগে রাজি করানো। দ্বিতীয়ত, তিনি পদত্যাগ না করলে আগামী ফিফা কংগ্রেসে তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রার্থী দাঁড় করানো।
সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন ইনফান্তিনো এখন নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন সময় পার করছেন। বিশ্বকাপ বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা, কনফেডারেশনগুলোর ক্ষোভ, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিদায় এবং পুনর্নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন- সব মিলিয়ে ফিফা সভাপতির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। আগামী মাসগুলোতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়।
আইএইচএস/
বিজ্ঞাপন