বিজ্ঞাপন
‘ঘোরা’ শব্দটি ঘুরা বা ঘোরাঘুরির চলিত রূপ। ঘুরতে ভালো লাগে না, এমন মানুষ খুব কম। কিন্তু ঘোরার সামর্থ সবার নেই। সময়, সংসার, চাকরি আর পকেট, সবকিছুকে একসঙ্গে ম্যানেজ করে বেড়াতে যাওয়া বাঙালি মধ্যবিত্তের জন্য বেশ কঠিন কাজ। তারপরও কিছু মানুষের ‘ঘোরা রোগ’ থাকে। ইচ্ছেটা এত প্রবল যে সামর্থকে প্রায়ই পাত্তা দেয় না। আমিও সেই রোগে আক্রান্ত। এই রোগের কিছু চেনা উপসর্গ আছে। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা উঠলেই প্রথম প্রশ্ন, কত কম খরচে যাওয়া যায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন, কীভাবে যাওয়া যায়? তৃতীয় প্রশ্ন, সঙ্গে কে কে যাবে?
একা কিংবা দুজন ঘুরে তেমন মজা নেই। দল হলে খরচ ভাগ হয়, গল্প-আড্ডা জমে। তবে দল বানানোই সবচেয়ে কঠিন। আপনি কোথাও ঘুরে এসে ফেসবুকে ছবি দিলে কেউ বলবে, ‘ইস্, আমাকে জানালে কী হতো! আমিও যেতাম।’ পরেরবার তাকে জানালে প্রথমে বলবে, ‘অবশ্যই যাব।’ এমন ভাব করবে যেন আপনার সঙ্গে না গেলে জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি হাতছাড়া হবে। তারপর দিন যত এগোবে, তার উৎসাহ তত কমবে। শেষে এমন এক মহামূল্যবান কারণ দেখাবে যে, তাকে ছাড়া আপনাকেই রওয়ানা হতে হবে।
এবারও তা-ই হলো। শেষ পর্যন্ত পাঁচজনের দল নিয়ে রওয়ানা হলাম কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও মিরিঞ্জা পাহাড়ের পথে। উদ্দেশ্য খুব সামান্য। কম খরচে প্রকৃতি দেখা, নদীর সঙ্গে একটু সময় কাটানো, পাহাড়ের কাছে যাওয়া এবং শহুরে ব্যস্ততা থেকে দুদিন পালিয়ে থাকা।
যাত্রা শুরু মোহাম্মদপুর থেকে। রাত অনেক। ঢাকার যানজট পেরিয়ে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভ্রমণের উত্তেজনার সঙ্গে ঘুমের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। রাত পৌনে বারোটায় ট্রেন ছাড়ল। কেউ গল্প করছে, কেউ মোবাইলে, কেউ ঘুমের প্রস্তুতিতে। আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছি, ঢাকা পেছনে পড়ছে, সামনে কী আছে কে জানে!
রাতের ট্রেনযাত্রার মজাই আলাদা। চারপাশে অন্ধকার, মাঝে মাঝে স্টেশনের আলো এসে জানালায় পড়ে আবার মিলিয়ে যায়। কখন যে রাত কেটে ভোর হলো, টেরই পেলাম না। ভোরে পৌঁছালাম চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী ট্রেনে চকরিয়া। জানালার বাইরে বৃষ্টিস্নাত পাহাড়, সবুজ আর গ্রামবাংলা দেখতে দেখতে চকরিয়া স্টেশনে নামলাম। অটোরিকশায় চকরিয়া বাজার। এতক্ষণে পাঁচজনের পেট পাঁচ রকম ভাষায় প্রতিবাদ করছে। তাই প্রথম কাজ নাশতা।
আরও পড়ুন
ঘুরে আসুন অনিন্দ্য সুন্দর বোয়ালিয়া ঝরনায়
নাশতা শেষ করে জিপ বা চান্দেরগাড়িতে লামাবাজার। শহুরে চেহারা ধীরে ধীরে বদলে গেল। চারপাশে সবুজ, পাহাড়, নদী আর মানুষের সহজ জীবন। লামাবাজারে গাড়ি ছেড়ে হাঁটা শুরু। গন্তব্য নৌঘাট। শহরে হাঁটা মানে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া। এখানে হাঁটা মানে পথটাকেও উপভোগ করা। কিছুদূর পর নৌঘাট। নৌকায় উঠে নদীর বুক চিরে রওয়ানা দিলাম রিভারভিউ রিসোর্টের দিকে।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে নদীর পাড়ে রিভারভিউতে পৌঁছানোর মুহূর্তটাই ছিল ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ। সামনে নদী, ওপারে পাহাড়, মাথার ওপর বিশাল আকাশ। কাঠ, বাঁশ, খোলা বারান্দা আর প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা দেখে মনে হলো, এখানে ঘর বানানো হয়েছে থাকার চেয়ে প্রকৃতিকে দেখার জন্যই বেশি।
রিসোর্টের মাচাংটি বিশেষ আকর্ষণ। নদীর দিকে মুখ করে বসলে সামনে শুধু নদী, তার ওপারে পাহাড় আর আকাশ। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, আলো বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যও বদলায়। ওয়েলকাম ড্রিংকস, ফ্রেশ হওয়া, দুপুরের খাবার এবং একটু বিশ্রামের পর বের হলাম মাতামুহুরীতে নৌভ্রমণে।
মাতামুহুরী যেন আমাদের জন্য আলাদা গল্প সাজিয়ে রেখেছিল। নৌকা কখনো শান্ত পানিতে, কখনো নদীর বাঁক ঘুরে এগোয়। দূরে সাদা পাহাড়, কোথাও আদিবাসী গ্রাম, কোথাও নদীর পাড়ের বসতি, কোথাও শিশুদের খেলাধুলা। নদী, পাহাড়, সবুজ আর মানুষের জীবন মিলে অন্যরকম এক ভূগোল। নৌকায় বসে মনে হলো, প্রকৃতি দেখতে সব সময় নামি পর্যটনকেন্দ্রে যেতে হয় না। চেনা মানচিত্রের বাইরে থাকা একটি নদী, পাহাড়ি গ্রাম কিংবা নির্জন ঘাটও কখনো বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যায় রিসোর্টে ফিরে মাচাংয়ে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছু সময় কেউ কথা বললাম না। ভ্রমণে এমন মুহূর্ত আসে, যখন প্রকৃতিই কথাবার্তার দায়িত্ব নেয়। তারপর শুরু হলো পাঁচজনের আড্ডা। কে কোথায় ভয় পেয়েছে, কে ছবি তুলতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল, কে কী দেখেছে, এসব নিয়ে হাসাহাসি। ভ্রমণের জায়গাগুলো অনেক সময় ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু এই হাসাহাসিগুলো থেকে যায়।
আরও পড়ুন
একদিনের ভ্রমণে চন্ডিছড়া চা বাগানে যা দেখবেন
রাতে পাহাড়ি স্বাদের খাবার। ভাত, মুরগি, ভর্তা, ডালসহ নানা পদ। শহরের নামি রেস্তোরাঁর খাবার যত দামিই হোক, পাহাড়ের পাশে বসে খাওয়া এক প্লেট সাধারণ ভাত-ভর্তার স্বাদ অনেক দিন মনে থাকে। খাওয়ার পরও ঘরে ঢোকার তাড়া নেই। খোলা আকাশের নিচে বসে তারা দেখা। সঙ্গী ত্রিদিব গান শোনাল। নদীর হাওয়ার সঙ্গে গান মিশে যাচ্ছিল। শহরেও আকাশ আছে, তারা আছে, শুধু দেখা যায় না। আলো, ধোঁয়া আর দালানের আড়ালে তারা হারিয়ে থাকে। এখানে আকাশটা নিজের মতো, তারাগুলোও যেন একটু বেশি উজ্জ্বল।
শেষ পর্যন্ত ঘুমের কাছে হার মানলাম। সকালে অ্যালার্মের দরকার হলো না। পাখির ডাকেই ঘুম ভাঙল। বাইরে এসে দেখি, সকালের আলোয় নদী, পাহাড় আর সবুজ আগের চেয়েও সুন্দর। দূরের পাহাড়ে হালকা কুয়াশা, নদীর ওপর নরম আলো। বারান্দায় এক কাপ চা হাতে এই দৃশ্য দেখার আনন্দের সঙ্গে শহরের সকালের কোনো তুলনা নেই।
নাস্তা করে নৌকায় ঘাটে ফিরলাম। এবার গন্তব্য মিরিঞ্জা ভ্যালি। ঘাট থেকে সিএনজি। পথের দৃশ্য দেখতে দেখতে মিরিঞ্জায় পৌঁছালাম। সিএনজি যতদূর যেতে পারে গেল। এরপর পায়ে হাঁটা। প্রায় আধা ঘণ্টার পাহাড়ি পথ। কোথাও কাঁচা রাস্তা, কোথাও কাদা। তখন বুঝলাম, শহুরে জুতা পাহাড়ের জন্য তৈরি হয়নি। একবার পা পিছলে গেলে জুতা, প্যান্ট আর আত্মসম্মান, তিনটিই কাদায় সমানভাবে আক্রান্ত হতে পারে।
তবু হাঁটা থামেনি। শেষ পর্যন্ত পৌঁছালাম মায়ারুন রিসোর্টে। রিভারভিউ আর মায়ারুনের সৌন্দর্যের তুলনা চলে না। রিভারভিউ নদী আর পাহাড়কে সামনে আনে, মায়ারুন নিয়ে যায় পাহাড়ের কোলে। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা মায়ারুনের সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড়। একটার পর একটা সবুজ ঢেউ। কোথাও গাছের ফাঁকে আকাশ, কোথাও পাহাড়ের গায়ে মেঘ। মনে হয়, হাত বাড়ালেই পাহাড় ছোঁয়া যাবে। সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠল সামনের কফি শপ। বড় কোনো আয়োজন নেই। সাদামাটা বসার জায়গা, সামনে পাহাড়। কিন্তু এখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যায়। এক কাপ কফি সামনে রেখে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা, মাঝেমধ্যে কথা বলা, আবার দীর্ঘসময় চুপ থাকা, সবই এখানে স্বাভাবিক।
রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক ছাত্র ও শিল্পী পুলক আমাদের আড্ডার সঙ্গী হলেন। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে জায়গাটার গল্প, পাহাড়ের গল্প, শিল্পের গল্প, আড্ডা আরও জমে উঠল। বোঝা গেল, জায়গাটি শুধু ব্যবসার জন্য নয়, ভালোবাসা দিয়েও তৈরি। এখানে এসে আমাদের ঘোরার সংজ্ঞাই বদলে গেল। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। বসে থাকাটাই যেন ভ্রমণের অংশ।
সারাদিন বারান্দায় বসে মেঘ, বৃষ্টি আর রোদ দেখেছি। কখনো পাহাড়ের গায়ে মেঘ নেমে এসেছে, কখনো রোদ এসে সবুজের রং বদলে দিয়েছে। একসময় আকাশে উঠল রংধনু। মনে হলো, প্রকৃতি নিজেই সামনে বসে একের পর এক দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে। শহরে বিনোদনের জন্য টেলিভিশন, মোবাইল, সিনেমা লাগে। এখানে কোনো পর্দা লাগে না। সামনে পাহাড়, ওপরে আকাশ, মাঝে মেঘ-বৃষ্টি-রোদ। প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় সিনেমা।
আরও পড়ুন
সীতাকুণ্ডের কমলদহ ট্রেইলে একদিন
বিকেলের পর পাহাড়ে মেঘ নামল। দূরের পাহাড় অস্পষ্ট হয়ে গেল। মনে হলো, কেউ জলরঙে আঁকা ছবি ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে। আবার বাতাস বদলাতেই পাহাড় পরিষ্কার। প্রকৃতির এই প্রদর্শনীর কোনো টিকিট নেই, সময়সূচিও নেই। শুধু বসে থাকতে হয়। সন্ধ্যা পেরিয়েও বারান্দা ছাড়িনি। পাঁচজন মানুষ, কিছু গল্প, সামনে পাহাড় আর মাথার ওপর আকাশ, এই ছিল আমাদের বিনোদন। বড় আয়োজনের প্রয়োজনই পড়ল না।
পরদিন সকালে নাস্তা করে ফেরার পালা। মিরিঞ্জা থেকে সিএনজি করে চকরিয়া, সেখান থেকে বাসে চট্টগ্রাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে বিকেল পাঁচটার ট্রেনে ঢাকার পথে। ফেরার ট্রেনে বসে মনে হলো, ভ্রমণটা আসলে খুব বড় কিছু ছিল না। বিদেশে যাওয়া হয়নি, দামি হোটেল হয়নি, বিলাসবহুল গাড়িও হয়নি। কিন্তু প্রকৃতির কাছে থাকার আনন্দে কোনো ঘাটতি ছিল না। বরং মনে হলো, বিলাসিতা ভ্রমণকে আরামদায়ক করতে পারে, সুন্দর নয়। সৌন্দর্যের জন্য দরকার সময়, সঙ্গ আর মনটা একটু খোলা রাখা।
রাত সাড়ে দশটার দিকে ঢাকায় পৌঁছালাম। বিমানবন্দর থেকে মোহাম্মদপুরের পথে আবার সেই পরিচিত শহর। গাড়ির শব্দ, আলো, মানুষের ভিড়, ব্যস্ততা। মনে হলো, কয়েক ঘণ্টা আগেও আমরা নদী-পাহাড়-মেঘের মধ্যে ছিলাম, এখন আবার ঢাকার বাস্তবতায়। এই ভ্রমণে আমরা পাঁচজন। শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল খরচ কম রাখা। থাকা সাধারণ, খাবার পাহাড়ি ঘরানার, যাতায়াতে ট্রেন, অটোরিকশা, সিএনজি, বাস আর নৌকা। একেবারে মধ্যবিত্তের ভ্রমণ। কিন্তু ভ্রমণের আনন্দের সঙ্গে টাকার সম্পর্ক আসলে কতটুকু?
যার ঘোরার রোগ আছে, সে জানে, ভ্রমণ মানেই বিলাসিতা নয়। রাতের ট্রেনে দূরের শহরের দিকে যাত্রাও ভ্রমণ। অচেনা বাজারে নাশতা করাও ভ্রমণ। কাদা মাড়িয়ে পাহাড়ে ওঠাও ভ্রমণ। নদীতে নৌকা চালিয়ে সাদা পাহাড় দেখা, পাহাড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া, মাচাংয়ে বসে নদী দেখা, মায়ারুনের বারান্দায় বসে মেঘের আসা-যাওয়া দেখা কিংবা রাতের আকাশে তারা গোনা, সবই ভ্রমণ।
কখনো ভ্রমণ মানে কোথাও না গিয়ে শুধু বসে থাকা। এক কাপ কফি হাতে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা। বন্ধুর গান শোনা। অনেকক্ষণ চুপ থাকা। কিংবা পুরোনো কোনো গল্প মনে পড়ে হঠাৎ হেসে ওঠা। গরিবের ‘ঘোরা রোগ’ তাই বড় অদ্ভুত রোগ। এর কোনো ওষুধ নেই। টাকা কম থাকলে রোগ সারে না, বরং নতুন বুদ্ধি বের করে। পাঁচতারা হোটেল না হলেও চলে। জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখা না গেলেও চলে। সামনে যদি একটা নদী থাকে, একটা পাহাড় থাকে, কয়েকজন আপন মানুষ থাকে, তাহলেই চলে।
আরও পড়ুন
বর্ষায় ঘুরে আসুন বৃষ্টিভেজা গারো পাহাড়ে
শুধু দরকার ইচ্ছেটুকু। আর সঙ্গে যদি থাকে আরও চারজন ‘ঘোরাপাগল’ মানুষ, তাহলে কম খরচের ভ্রমণও হয়ে উঠতে পারে জীবনের দারুণ এক গল্প!
এসইউ
বিজ্ঞাপন