বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই ভেঙে পড়ে। দ্রুত বাড়তে থাকে নানান অপরাধ ও সহিংসতামূলক কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যায় বহু অপরাধী। এই সুযোগ কাজে লাগায় এক শ্রেণির অপরাধী চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাময়িক ছন্দপতনে উত্থান ঘটে তাদের। সারাদেশে শুরু হয় ‘মব’ কালচার।
এমনই এক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শুরু হয় রাষ্ট্র সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের কাজ। দফায় দফায় চলে ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযান। কিন্তু অবস্থার দৃশ্যমান তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল ও ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। সারাদেশে মবের বিস্তার ঘটে। খুন-নির্যাতনের মতো অপরাধ বেড়ে যায় বহুগুণ। জননিরাপত্তা নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
সাধারণ মানুষ তখন ভাবতে শুরু করে—দেশে নির্বাচিত সরকার এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
কিন্তু তাতেও আগের ১৮ মাসের অপরাধ চক্রের ধারাবাহিকতায় তেমন ছেদ পড়েনি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। যদিও বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা ছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে অপরাধের মাত্রা কমবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু এখন তাদের চোখে বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। তারা মনে করছেন, বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে ‘মব’ কালচার কিছুটা কমলেও সার্বিকভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চিত্র অনেকটাই ‘হতাশাজনক’।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সারাদেশে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় মোট ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকায় মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ৪৪টি।—পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে অপরাধের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এসময়ে সারাদেশে ছোট-বড় বিভিন্ন অপরাধে ঘটনায় মোট ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে শুধু ঢাকায় সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় মামলার সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৪৪টি।
এর আগের ছয় মাস অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে অপরাধের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসময়ে সারাদেশে অপরাধের ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ৮৯ হাজার ১২টি। একই সময়ে ঢাকায় অপরাধের ঘটনায় মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ৬৬৫টি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই যে দিন দিন অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে, এর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বিভিন্ন সময়ে হওয়া হামলা ও সেগুলোর দৃশ্যমান বিচার না হওয়া। তাদের মতে, পুলিশ বাহিনীর ওপর এসব হামলায় মনোবল হারিয়েছে বাহিনীর সদস্যরা। যার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অপরাধী চক্র।
আরও পড়ুন
মোহাম্মদপুরে ১৬ গ্যাং, অপরাধ রাজ্যে তারাই ‘রাজা’
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানানো হলেও কার্যত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সফলতা কতটুকু এসেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন সে প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক সেগুলো নির্মূল করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সেদিন বলেন, ‘আমরা এদেশে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের স্থান দেবো না।’
গত ৮ জুন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ের তথ্য গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আমার কাছে যে পরিসংখ্যান এসেছে তাতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই অপরাধ কমেছে।’
আরও পড়ুন
ক্ষমতার লড়াইয়ে ঘটছে রাজনৈতিক সহিংসতা, ২২ মাসে প্রাণ গেছে ২১৩ জনের
কী বলছে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সারাদেশে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় মোট ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকায় মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ৪৪টি।
অপরাধ ও মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে সারাদেশে ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনায় ১১,৭৭৫টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এলাকায় ১০৪১টি। মার্চে সারাদেশে ১৬,১৫৭টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৩০৫টি। এপ্রিলে সারাদেশে ১৭,১৮০টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৪৮৮টি। মে মাসে সারাদেশে ১৮,১৪৯টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৩৬৫টি।
জুনে সারাদেশে ১৮,৮২০টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৪১১টি। জুলাইয়ে সারাদেশে ১৭,৯১১টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৪৩৪টি মামলা দায়ের হয়েছে।
এর আগের ছয় মাস অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে অপরাধ ও মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসময়ে সারাদেশে ছোট-বড় নানান অপরাধে মোট ৮৯ হাজার ১২টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ৬৬৫টি।
শুধু নিয়মিত অভিযান নয়, পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার এবং অপরাধ দমনে নতুন চিন্তা ও কৌশল প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারি বক্তব্য, অপরাধ পরিসংখ্যান ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান থেকেই যাবে।—অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সারাদেশে ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ১৪ হাজার ৫৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। যার মধ্যে ডিএমপিতে মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩৫২টি।
এর আগে ২০২৫ আগস্টে সারাদেশে ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ১৫,৬৫৬টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ডিএমপিতে ১৬০৬টি। সেপ্টেম্বরে সারাদেশে বিভিন্ন অপরাধে ১৫,৪৩১টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ডিএমপিতে ১,৫২৯টি। অক্টোবরে সারাদেশে ১৬,১৭০টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ডিএমপিতে ১,৫৩১টি। নভেম্বরে সারাদেশে হওয়া ১৪,৪৬৫টি মামলার মধ্যে ডিএমপিতে ১৩৮৩টি। ডিসেম্বরে সারাদেশে ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ১৩,২৩২টি মামলার ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে ডিএমপিতে মামলার সংখ্যা ছিল ১২৬৪টি।
ঢাকায় সক্রিয় ১৩৮৭ ছিনতাইকারী
ডিএমপির তথ্য বলছে, বর্তমানে ঢাকায় এক হাজার ৩৮৭ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন ওয়ারী বিভাগে। সবচেয়ে কম ৫৩ জন মিরপুরে। এছাড়া রমনায় ১৫২, লালবাগে ১৫৯, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, গুলশানে ৬৭ ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন সক্রিয় রয়েছে। এসব ছিনতাইকারীর ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার আসামি।
পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, অপরাধের বাস্তবতা, মামলার সংখ্যা এবং গ্রেফতারের পরিসংখ্যানের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্য দেখা যায় না। অনেক অপরাধী গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আবার অনেক মামলায় অপরাধের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপস্থাপন না হওয়ায় সহজে জামিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
ঢাকায় চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই ঠেকাতে নাজেহাল পুলিশ
তিনি বলেন, পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনায় কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অপরাধীরা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত হয়।
‘শুধু নিয়মিত অভিযান নয়, পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার এবং অপরাধ দমনে নতুন চিন্তা ও কৌশল প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারি বক্তব্য, অপরাধ পরিসংখ্যান ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান থেকেই যাবে’—যোগ করেন তিনি।
অপরাধের আগে ও পরে—দুইভাবেই কাজ করছে পুলিশ
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, পুলিশের কার্যক্রম মূলত দুই ধরনের। এক প্রতিরোধমূলক এবং দুই অপরাধ সংঘটনের পরবর্তী ব্যবস্থা। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতা ও নজরদারি তৈরি করা হচ্ছে।
পুলিশের মনোবল চাঙা করার বিষয়টি গত দুই বছর ধরে বলা হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি অনেক ভালোর দিকে। এ মুহূর্তে পুলিশ বেশ চাঙা। তবে আইন মানার প্রতি মানুষের প্রবণতা বাড়ালে পুলিশের মনোবলও আরেকটু চাঙা হবে।—শাহাদাত হোসাইন
তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটিত হলে জড়িতদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বড় শহর। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের জনবল, যানবাহন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত। সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠা গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।
এক জেলায় অপরাধ, অন্য জেলায় আত্মগোপন
অপরাধ সংঘটনের পরপরই যেন মিলিয়ে যায় অপরাধীদের উপস্থিতির সব চিহ্ন। অপরাধীরা এক জেলায় অপরাধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে দ্রুত আশ্রয় নেয় অন্য জেলা কিংবা শহরে। পরিচয় গোপন, অবস্থান পরিবর্তন আর কৌশলী চলাফেরার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই এভাবে আত্মগোপনে থাকেন অপরাধচক্রের সদস্যরা।
ধারাবাহিকভাবে ঘটা বিভিন্ন ঘটনার পর্যালোচনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, রাজধানী ঢাকার অপরাধীরা ঢাকার ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে গা-ঢাকা দিচ্ছে। আর ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর অপরাধীরা অপরাধ করে আত্মগোপনের জন্য চলে আসছে ঢাকায়।
আরও পড়ুন
ছোট বয়সে ‘বড়’ অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা
অপরাধ দমনে র্যাবের একটি ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১ জুন থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ করে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে আত্মগোপন করা ২৪৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করে র্যাব-৪। তাদের মধ্যে হত্যা মামলার ৯৮ জন, ধর্ষণ মামলার ৪৫ জন, সাজাপ্রাপ্ত ৪৯ জন, অপহরণ মামলার ২৫ জন, দস্যুতার ১০ জন, ডাকাতির ৯ জন, প্রতারণার দুজন এবং চুরির মামলার একজন আসামি রয়েছেন। এছাড়া এজাহারনামীয় একজন, ছিনতাইকারী একজন, মানবপাচারকারী একজন ও জাল টাকা প্রস্তুতকারী একজনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন পুলিশের মনোবল বাড়ানো
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, পুলিশের হামলার শিকার হওয়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যতটুকু বল প্রয়োগ করা দরকার পুলিশ সদস্যরা ওই স্ট্যান্ডার্ড ফলো করছে। এক্ষেত্রে জনসাধারণকে আইন মানার প্রবণতা বাড়াতে হবে। আইন মান্য করা নিজের জন্যই জরুরি। কারণ, কেউ যদি আইন ভঙ্গ করে পুলিশের ওপর আঘাত করে, দিনশেষে সে নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
তিনি বলেন, পুলিশের ওপর হামলার প্রতিটি ক্ষেত্রেই মামলা রুজু হয়েছে। বিগত সময়ে পুলিশের ওপর যারা হামলা করেছে তাদের অনেকেই গ্রেফতারও হয়েছে। যারা গ্রেফতার হয়নি, তাদের ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।
‘পুলিশের মনোবল চাঙা করার বিষয়টি গত দুই বছর ধরে বলা হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি অনেক ভালোর দিকে। এ মুহূর্তে পুলিশ বেশ চাঙা। তবে আইন মানার প্রতি মানুষের প্রবণতা বাড়ালে পুলিশের মনোবলও আরেকটু চাঙা হবে’—যোগ করেন এআইজি শাহাদাত হোসাইন।
বর্তমান সরকারের ছয় মাসে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে জানতে চাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, জনগণের প্রত্যাশার ক্ষেত্রে, যেভাবে পূরণ হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি। তবে দেশজুড়ে যে মব কালচারটা ছিল সেটা আপেক্ষিকভাবে কমেছে। আগে যেভাবে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ছিল, সেটা তুলনামূলক একটু বেটার হয়েছে, ভালো হয়েছে। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সেভাবে হয়নি।
ট্রান্সফার আতঙ্ক, ফোর্স লিভ—এগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানে যোগ্যতা এবং মেধা অনুযায়ী সবকিছু হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনীতিকীকরণ করা যাবে না। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর প্রতিটি হামলার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।—অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধের তথ্য তুলে ধরলে তিনি বলেন, ডিএমপি একটা কন্ট্রোলিং অথরিটি। এই মুহূর্তে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা ভালো করছে। কিন্তু ছিনতাই এবং অন্য জায়গাগুলো এতো ভালো করতে পারেনি।
তিনি বলেন, ডিএমপির ক্ষেত্রে মামলা করার বিষয়টা, অ্যাক্সেস টু জাস্টিস (সবার জন্য ন্যায়বিচারের সমান অধিকার) একটু কম। আপনি যে কোনো সমস্যায় থানায় গেলেই যে একটা জিডি নেবে বা মামলা নেবে এটা কিন্তু না। একশোটা কোয়ারি করে, মানুষ হয়রানির শিকার হয়। টাকা-পয়সার ব্যাপার থাকে। ফলে ডিএমপিতে অ্যাক্সেস টু জাস্টিসের জায়গাটা কম। আর দেশের অন্যান্য জায়গাতে জাস্টিসের জায়গাটা আছে এবং রাজনৈতিক ইনফ্লুয়েন্সের মাধ্যমে সেটা হয়। এই ভেরিয়ারগুলোর ওপরই ক্রাইম কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া নির্ভর করে।
তিনি বলেন, ক্রাইম বেড়েছে, কমেছে—এটা আমরা আসলে সংখ্যাগত জায়গা থেকে বলি। কিন্তু ক্রাইম বেড়েছে, কমেছে সেটা তো দেখতে হবে ওই এলাকার পপুলেশন (জনসংখ্যা) অনুযায়ী। জনসংখ্যার মধ্যে কত মানুষ ক্রাইমে এফেক্ট হয় এবং শিকার হয়, সে আলোকে দেখতে হয়।
‘পুলিশের দেওয়া তথ্য ‘নম্বর অব ইন্সিডেন্ট’, শুধু ঘটনা দিয়ে বিচার করলে এটা সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা হবে না অথবা এটা সঠিকতার জায়গায় যাবে না। ক্রাইম বেড়েছে কি কমেছে এটা বুঝতে হবে জনসংখ্যার হারের তুলনায় ক্রাইম কত পরিমাণ কমেছে এবং বেড়েছে সেটা বিবেচনায় নিয়ে।’
আরও পড়ুন
ঢাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জে পুলিশ
এ অপরাধ বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, ক্রাইম প্রিভেনশনের জন্য তিন ধরনের স্ট্র্যাটেজি আছে—প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, টারশিয়ারি। টারশিয়ারি লেভেলটা আমরা গুরুত্ব দিই রাষ্ট্রের দিক থেকে। কারণ, রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আরও আইনগুলোকে যথাযথভাবে রুল অব ল বেশি পরিমাণে প্রয়োগ করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্বের জায়গা থেকে তাদের কাজ করতে হবে। রাজনীতিমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে। যে কোনো অপরাধ মোকাবিলার জন্য যদি তারা আইনের আলোকে শক্তিশালী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।
‘এছাড়াও পারিবারিক, সামাজিক পরিবেশে আমরা যারা আছি, এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধের বিষয়গুলো আছে, সচেতনতার জায়গা থেকে সেগুলো থাকতে হবে। ক্রাইম শুধু নিয়ন্ত্রণ করলে হবে না, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে।’
তিনি বলেন, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তাহলে সমাজকে নিরাপত্তামূলক করা সম্ভব বলে মনে করি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন হামলা শিকার হয়েছেন। সেগুলোর বিচার না হওয়ায় তারা ডিমোরালাইজড হয়েছে। তাদের ভেতর কনফিডেন্স তৈরি করা দরকার।
অধ্যাপক ড. ওমর ফারুকের মতে, (আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের) সাইকোলজিক্যালি (মনস্তাত্ত্বিকভাবে) কাউন্সেলিং দরকার। তাদের প্রশিক্ষণ দরকার। আর একটা ফোর্সকে ইউনাইটেড ফোর্স হিসেবে তৈরি করার জন্য রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ এখানে স্পেসটা দিতে হবে। রাষ্ট্রকে এটা এনশিওর করতে হবে যে, পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্র চলবে না, রাষ্ট্র ছাড়া পুলিশ থাকবে না। অতএব, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পুলিশ একান্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে পুলিশের পাশে থাকতে হবে।
‘এই যে ট্রান্সফার আতঙ্ক, ফোর্স লিভ—এগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানে যোগ্যতা এবং মেধা অনুযায়ী সবকিছু হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনীতিকীকরণ করা যাবে না। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর প্রতিটি হামলার বিচার নিশ্চিত করতে হবে’—যোগ করেন তিনি।
কেআর/এমকেআর
বিজ্ঞাপন