বিজ্ঞাপন
বহুসংস্কৃতির এই সমাজে বিভিন্ন দেশ, ভাষা ও ধর্মের মানুষের ভিড়ে একজন মুসলিম হিসেবে কীভাবে আমরা আমাদের স্বকীয় পরিচয় বা আইডেন্টিটি বজায় রাখতে পারি, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। স্রোতের তালে তাল মিলিয়ে যাতে আমরা হারিয়ে না যাই, সেজন্য আমাদের প্রথম কাজ হলো ইমানকে সুদৃঢ় করা। মজবুত ইমান সহজে নষ্ট হয় না।
আমরা গ্রামবাংলায় মা-চাচিদের মাটির চুলায় রান্না করতে দেখি। সুদীর্ঘ ১০ বা ২০ বছর মাটির চুলায় রান্না করার পর চুলাটির ভেতরে ইটের মতো লালচে রঙ ধারণ করে। কিন্তু এই মাটি দেখতে ইটের রঙের হলেও তা যদি পানিতে ফেলা হয়, তবে সাধারণ মাটির মতোই গলে নিঃশেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে ইটের ভাটার ইট নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় যখন পোড়ানো হয়, তখন তা কেবল লালচে রঙই পায় না, বরং তা এতটাই শক্ত হয় যে শত বছর পানিতে থাকলেও গলে নষ্ট হয় না। একইভাবে কেবল মুসলমানের রং বা রূপ ধারণ করা আর ভেতরে সত্যিকারের ইমানদার বা শক্তিশালী মুসলমান হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
আমরা অনেকেই আছি যারা মুসলমান পরিবারে জন্ম নিয়ে কেবল বংশানুক্রমিক একটি পরিচয় বহন করছি। হয়তো জুমার নামাজ পড়ি, মাঝে মাঝে টুপি-পাঞ্জাবি পরি বা জিকির-আজকার করি; কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে গেলেই আমাদের এই দুর্বল ইমান হারিয়ে যায়। অথচ আমরা যদি চাই, তবে আমাদের ইমানকেও ওই পোড়ানো ইটের মতো শক্ত করতে পারি। সেজন্য মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম ও দ্বীনি সার্কেলে যুক্ত হয়ে ইমানি জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।
প্রথমত, মসজিদগুলোতে কোরআন শিক্ষা, আরবি ভাষা শেখা কিংবা ইসলামি বিভিন্ন হালাকা ও ইলমি আলোচনার যে ব্যবস্থা থাকে, সেগুলোতে অংশগ্রহণ করা উচিত। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইমানকে মজবুত করতে পারলে তা পোড়ানো ইটের মতো শক্ত হবে এবং চারপাশের পরিবেশ যতই প্রতিকূল হোক না কেন, আপনি ইমানের ওপর টিকে থাকতে পারবেন।
আরও পড়ুন
শায়খ আহমাদুল্লাহ / ‘আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন’ ব্যাখ্যা কী?
দ্বিতীয়ত, ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। ইসলাম কেবল জন্মসূত্রে প্রাপ্ত কোনো পরিচয় নয়; বরং পরিপূরক জীবনবিধান। তাই দ্বীন ও ইমানকে ভালোভাবে বুঝতে আমাদের অনলাইন বা অফলাইনের বিভিন্ন ইসলামি কোর্স এবং বই-পুস্তক অধ্যয়ন করতে হবে।
তৃতীয়ত, যেকোনো পরিস্থিতিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা এবং এটিকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নামাজ ছাড়া যাবে না বা এ ব্যাপারে শিথিলতা দেখানো যাবে না।
চতুর্থত, নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে। দিনে অন্তত পাঁচ বা দশ মিনিট হলেও সহিহভাবে ও নিজের কান শোনার মতো আওয়াজে তেলাওয়াত করা উচিত। সম্ভব হলে অনুবাদসহ দৈনিক অন্তত কয়েকটি আয়াত বুঝে পড়া উচিত, যা ইমান রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে। এর পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়াগুলো পাঠ করতে হবে।
পঞ্চমত, সৎ ও দ্বীনদার সঙ্গ বেছে নিতে হবে। যারা হালাল-হারাম মেনে চলে, পর্দা বজায় রাখে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে, তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইমানদারদের তাকওয়া অবলম্বন করার এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি যখন নামাজি ও দ্বীনদার মানুষের সাথে চলবেন এবং জুয়া, ক্যাসিনো বা হারামের সাথে জড়িতদের এড়িয়ে চলবেন, তখন আল্লাহ তাআলা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আপনার ইমান ও চরিত্রকে হেফাজত করবেন।
মসজিদগুলোর সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন দ্বীনি আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সময়, অর্থ, পরামর্শ বা শ্রম দিয়ে যুক্ত থাকলে ইমানি পরিবেশে থাকা সহজ হয়।
আরও পড়ুন
শায়খ আহমাদুল্লাহ / কলুষিত অন্তরের দাগ দূর করার উপায়
ষষ্ঠত, দাওয়াতি কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আপনি যখন অন্যদের ইসলামের দিকে আহ্বান জানাবেন, তখন নিজের মধ্যেও তা অনুসরণের দায়িত্ববোধ বহুগুণ বেড়ে যাবে। একা একা দ্বীনের কাজ করা কঠিন, তাই যে কোনো নির্ভরযোগ্য দাওয়াতি প্ল্যাটফর্ম বা সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করলে ইসলাম চর্চা অনেক সহজ হয়ে যায়।
বর্তমান জামানায় ইমান ও আমল রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। বিশ্বনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন হাতের তালুতে জ্বলন্ত কয়লা ধরে রাখা যতটা কঠিন, ইমান ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন হবে। আজ আমরা সেই যুগেই বাস করছি।
এটি চরম ফিতনার সময়। হাদিসে এসেছে, ফিতনার সময়ে মানুষ সকালে মুমিন থাকলেও সন্ধ্যায় কাফের বা বেইমান হয়ে যাবে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সামান্য অর্থ বা সুবিধার জন্য মানুষ তার ইমানি পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। ফিতনা হলো এমন এক ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি, যেখানে মানুষ ক্ষতিকর বস্তুকে কল্যাণকর মনে করে ভুল পথে হারিয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফিতনার সময়ের ভয়াবহতাকে রাতের গভীর অন্ধকারের সাথে তুলনা করেছেন, যা চারপাশকে ছেয়ে ফেলে। এই চরম বিভ্রান্তির যুগে নিজের ও পরিবারের ইমান রক্ষায় আল্লাহর দরবারে চোখের পানি ফেলে কান্নাকাটি করা এবং ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া করার কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত বক্তব্য থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন