জাতীয়

গ্রেনেড হামলা থেকে রাষ্ট্রপতির শপথ, ইতিহাসের পাতায় নতুন আবহে ২১ আগস্ট

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
2 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
২১ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় একই সঙ্গে বেদনা ও আনন্দ-দুই বিপরীত অনুভূতির এক দিন। এ দিনে ২২ বছর আগে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। প্রাণ হারান ২৪ জন, আহত হয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ মানুষ। অন্যদিকে, ২২ বছর পর একই দিনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। গতকাল ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছেন তিনি। একই তারিখে একদিকে অতীতের রক্তাক্ত স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় জীবনে নতুন প্রত্যাশা-এ দুই বিপরীত ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে ২১ আগস্টকে। ২২ বছর আগের সেই দিন ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধী দল ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে একের পর এক শক্তিশালী গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। শক্তিশালী গ্রেনেডের স্প্লিনটারের আঘাতে সেখানে আগত ও উপস্থিত মানুষের দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়। চারদিকে ছিল শুধু আতঙ্ক আর মানুষের আর্তনাদ। সেদিন আহতদের আহাজারিতে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় এক বেদনাবিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। স্বজনদের কান্না, আহতদের আর্তচিৎকার আর রক্তাক্ত মানুষের ছোটাছুটিতে পুরো এলাকা ভারি হয়ে ওঠে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনদের আহাজারি আর চিকিৎসকদের ব্যস্ততায় হাসপাতালগুলোতে সেদিন এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ওই হামলায় বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ মানুষ। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও দলের অন্যতম শীর্ষ নারী নেত্রী আইভি রহমান। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে তিনি মারা যান। আইভি রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী। তার মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া তৈরি করে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হিসেবে স্থান করে নেয়। হামলা পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া ২১ আগস্টের হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলার বিচার চলে দীর্ঘ সময় ধরে। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর বিচারিক আদালত রায় ঘোষণা করে। দুই মামলায় মোট ৪৯ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৩০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে, বিচারিক আদালতের সেই রায় পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে টেকেনি। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে মামলার সব আসামিকে খালাস দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। পরে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগও রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন। আরও পড়ুন ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফলে, বিচারিক আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ৪৯ আসামির কারও সাজা বর্তমানে বহাল নেই। এক সময় ৪৯ জন দণ্ডিত হলেও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর সবাই খালাস পেয়েছেন। ২১ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনার মামলার এই পরিণতিও দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। ২১ আগস্ট এবার ভিন্ন বাস্তবতায় ইতিহাসের সেই স্মরণীয় ২১ আগস্ট এবার এসেছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে। ২২ বছর পর একই দিনে রাষ্ট্রপতির শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার নির্বাচনে মোট ৩৪৩টি বৈধ ভোট পড়ে। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পান ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণা করেন। ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা। আজ ২১ আগস্ট বঙ্গভবনে তার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মির্জা ফখরুলের আগে রাষ্ট্রপতি ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই অন্তর্বর্তী অধ্যায়েরও অবসান ঘটছে। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের শপথের মধ্য দিয়ে দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায় শুরু হচ্ছে। পৌর মেয়র থেকে বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলাও দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই প্রবীণ রাজনীতিক ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে এসে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ ও নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছেন মির্জা ফখরুল। তৃণমূলের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় পেরিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছানো তার রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়। একজন পৌর মেয়র থেকে দেশের রাষ্ট্রপতি-মির্জা ফখরুলের এই রাজনৈতিক উত্তরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাই ২১ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে যেন একই সঙ্গে দুটি বিপরীত অনুভূতির প্রতীক। একদিকে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার রক্তাক্ত স্মৃতি, আহতদের আর্তনাদ। অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২১ আগস্ট নতুন রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এএমএ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>