জাতীয়

বিদেশে প্রবাসী, দেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
13 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি আজ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে কর্মরত প্রায় দেড় কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চগুলোর একটি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় না, বরং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা। দেশের বাইরে থাকা অনেক প্রবাসী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে যে অর্থ উপার্জন করেন, দেশে ফিরে এসে তার বড় একটি অংশ হারিয়ে ফেলেন নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের কারণেই। বিষয়টি শুনতে যতটা কষ্টের, বাস্তবে তা আরও বেদনাদায়ক। প্রবাসীদের সঙ্গে কাজ করা আইনজীবী, আর্থিক পরামর্শক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রায়ই এমন অভিযোগ আসে যে, বিদেশে থাকা অবস্থায় পরিবার বা আত্মীয়দের ওপর বিশ্বাস করে জমি কেনার জন্য টাকা পাঠানো হয়েছে, কিন্তু পরে দেখা গেছে, জমির দলিলে নিজের নামই নেই। কেউ ব্যবসার জন্য লাখ লাখ টাকা পাঠিয়েছেন, কয়েক বছর পর দেশে ফিরে জানতে পেরেছেন, সেই ব্যবসার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার অনেকে ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন, কিন্তু সেই টাকা কখনো ব্যাংকে জমাই হয়নি। এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে আগে থেকেই স্বাক্ষর করা চেক ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। সব পরিবার এমন নয়, কিন্তু এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা যে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, তা বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট। প্রবাসীদের ঘামের প্রতিটি ফোঁটার মূল্য শুধু টাকায় নয়; একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি সন্তানের শিক্ষা এবং একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তা জড়িত। সেই অর্থ যেন অবহেলা, প্রতারণা বা অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে হারিয়ে না যায়, সেটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নিরাপদ বিনিয়োগ, আর্থিক সচেতনতা ও সঠিক পরিকল্পনাই পারে একজন প্রবাসীর আজকের পরিশ্রমকে আগামী দিনের নিরাপদ ভবিষ্যতে রূপ দিতে। অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Refugee and Migratory Movements Research Unit (RMMRU) বহু বছর ধরে প্রবাসীদের আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। সংস্থাটির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব, সম্পদের আইনি সুরক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অতিরিক্ত পারিবারিক নির্ভরশীলতা প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করেছে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা International Organization for Migration (IOM)। সংস্থাটি তাদের আর্থিক সচেতনতা-বিষয়ক নির্দেশিকায় বলেছে, বিদেশে গিয়ে শুধু অর্থ উপার্জন করাই যথেষ্ট নয়; সেই অর্থ কীভাবে নিরাপদ রাখা হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের একটি বড় অংশ পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিজের সব আয় দেশে পাঠিয়ে দেন। অনেকেই নিজের জন্য কোনো সঞ্চয় রাখেন না, কোনো অবসর পরিকল্পনা করেন না, এমনকি জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করার মতো অর্থও হাতে রাখেন না। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে যখন বুঝতে পারেন যে তাঁদের উপার্জিত অর্থের বড় অংশ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি, তখন অনেকের সামনে নতুন করে জীবন শুরু করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ বৈধ পথে পাঠানো অর্থ নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে তার প্রমাণও সংরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে অর্থ পাঠালে শুধু দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, প্রবাসীর নিজের অর্থও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, ব্যাংক নথি ও আইনি কাগজপত্র সংরক্ষণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন আর্থিক বিশেষজ্ঞরা। প্রবাসীদের অধিকাংশেরই একটি বড় স্বপ্ন থাকে—দেশে নিজের নামে একটি বাড়ি বা একটি ফ্ল্যাট। কারণ বিদেশের জীবন চিরস্থায়ী নয়। একসময় সবাই ফিরে আসতে চান নিজের দেশে, নিজের ঠিকানায়। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই সবচেয়ে বেশি প্রতারণার ঘটনা ঘটে। কখনো জাল দলিল, কখনো একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, কখনো অনুমোদনহীন প্রকল্প, আবার কখনো নির্মাণকাজ বছরের পর বছর শেষ না হওয়ার কারণে অনেকের স্বপ্ন ভেঙে যায়। বাংলাদেশের আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন Real Estate and Housing Association of Bangladesh (REHAB) বহুবার সতর্ক করে বলেছে, কোনো জমি বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার আগে অবশ্যই জমির মালিকানা, নামজারি, খতিয়ান, কর পরিশোধের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন যাচাই করা উচিত। শুধু পরিচিত কারও কথার ওপর ভরসা করে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেটকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান J.P. Morgan এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান Morningstar-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে ভালো অবস্থানের রিয়েল এস্টেট সাধারণত মূল্য বৃদ্ধি করে এবং মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধেও কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে তারা একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, সম্পত্তির আইনি বৈধতা নিশ্চিত না করে কোনো বিনিয়োগ করা উচিত নয়। অর্থাৎ লাভের সম্ভাবনা থাকলেও যথাযথ যাচাই ছাড়া বিনিয়োগ করলে সেই সম্পদই বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণের ফলে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে আবাসনের চাহিদা এখনো বাড়ছে। নতুন সড়ক, মেট্রোরেল, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নতুন আবাসিক এলাকার সম্প্রসারণের কারণে অনেক এলাকায় সম্পত্তির মূল্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল দাম বাড়বে—এই আশায় বিনিয়োগ করা উচিত নয়। বরং ডেভেলপারের অতীত রেকর্ড, নির্মাণমান, অনুমোদন, আইনি কাগজপত্র ও প্রকল্পের স্বচ্ছতা যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, একজন প্রবাসীর কখনোই সব অর্থ একটি খাতে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিকভাবে ‘Diversification’ বা বিনিয়োগ-বৈচিত্র্যকরণের ধারণা বহুদিন ধরেই অনুসরণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ কিছু অর্থ ব্যাংকে, কিছু নিরাপদ সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পে, কিছু দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করলে সামগ্রিক ঝুঁকি কমে আসে। এতে কোনো একটি খাতে ক্ষতি হলেও পুরো সঞ্চয় হুমকির মুখে পড়ে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রবাসীরা কেবল পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নন। তাঁদেরও একটি ভবিষ্যৎ রয়েছে। বিদেশে দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রমের পর বার্ধক্য, চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা নিজের নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজন হবে—এটি মাথায় রেখেই আর্থিক পরিকল্পনা করা উচিত। আবেগের কারণে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা কোনো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা প্রবাসীদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সব আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করা, বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানোর আগে লিখিত চুক্তি রাখা, সম্পত্তি নিজের নামে নিবন্ধন নিশ্চিত করা, সব কাগজপত্রের ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করা এবং বছরে অন্তত একবার নিজের সম্পদ ও বিনিয়োগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা—এসব অভ্যাস ভবিষ্যতের বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।একটি প্রবাদ আছে—‘বিশ্বাস ভালো, কিন্তু যাচাই আরও ভালো।’ প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও কথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত প্রতিটি টাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু ত্যাগ, কষ্ট ও স্বপ্ন। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, তথ্য; সম্পর্ক নয়, আইনি নিরাপত্তা; মুখের কথা নয়, লিখিত প্রমাণ—এসবকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রবাসীদের ঘামের প্রতিটি ফোঁটার মূল্য শুধু টাকায় নয়; একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি সন্তানের শিক্ষা এবং একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তা জড়িত। সেই অর্থ যেন অবহেলা, প্রতারণা বা অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে হারিয়ে না যায়, সেটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নিরাপদ বিনিয়োগ, আর্থিক সচেতনতা ও সঠিক পরিকল্পনাই পারে একজন প্রবাসীর আজকের পরিশ্রমকে আগামী দিনের নিরাপদ ভবিষ্যতে রূপ দিতে। লেখক: করপোরেট ট্রেইনার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>