জাতীয়

যে বাড়িটি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল এনে দিয়েছিল

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
11 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
ইন্ডিয়ানার ওয়েস্ট লাফায়েতের মেফেয়ার এলাকার সকালটি সেদিন অন্য দিনের চেয়ে আলাদা মনে হচ্ছিল। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গাছের পাতায় শিশিরের আভা, চারপাশের নিস্তব্ধতা আর পরিচ্ছন্ন আবাসিক পরিবেশের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি ছিল। সকালের নাস্তা শেষ করে যখন গাড়িতে উঠলাম; তখন মনে হচ্ছিল আমি কেবল আরেকটি শহরে যাচ্ছি না বরং বাংলা সাহিত্যের এক নীরব অথচ ঐতিহাসিক স্মৃতির দিকে যাত্রা করছি। বহুদিন ধরে মনে লালন করা একটি আকাঙ্ক্ষা সেদিন বাস্তব হয়ে উঠছিল। গন্তব্য ছিল ইলিনয়ের আরবানা, আর সেখানে অপেক্ষা করছিল টেগোর হাউজ, যে বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওয়েস্ট লাফায়েত থেকে আরবানার দূরত্ব প্রায় পঁচানব্বই মাইল। প্রায় দুই ঘণ্টার এই পথ আমার কাছে ধীরে ধীরে এক সাহিত্যতীর্থের দিকে অগ্রসর হওয়ার মতোই মনে হচ্ছিল। পথে বেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েস্ট লাফায়েতের শহুরে ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে গেল। সামনে খুলে গেল মধ্যপশ্চিম আমেরিকার বিস্তীর্ণ কৃষিভূমি। দিগন্তজোড়া ভুট্টাক্ষেত আর সয়াবিনের সবুজ সমুদ্র যেন এক অন্তহীন চিত্রপট। কোথাও সদ্য কাটা ঘাসের গন্ধ, কোথাও সেচের পানিতে ভেজা মাটির আর্দ্রতা, আবার কোথাও লাল রঙের খামারবাড়ি, উঁচু শস্যভান্ডার আর নীল আকাশের নিচে ছুটে চলা মহাসড়ক চোখে পড়ছিল। মাঝে মাঝে দূরে দেখা যাচ্ছিল আধুনিক উইন্ড টারবাইন, যেন কৃষি ও প্রযুক্তির একসঙ্গে এগিয়ে চলার প্রতীক। গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ছিল রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। এক শতাব্দীরও বেশি আগে তিনিও এই দেশেই এসেছিলেন কৃষিবিজ্ঞান ও কৃষি অর্থনীতি শিখতে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে তাঁর সেই শিক্ষা পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের কৃষি উন্নয়ন ভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পথের এই উর্বর প্রান্তর যেন তাঁর সেই স্বপ্নেরই বাস্তব প্রতিধ্বনি হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, এই যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়, সময়ের ভেতর দিয়েও এক ধরনের অগ্রসর হওয়া। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতার বীজ হয়তো এমনই কোনো পথের অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির বিস্তার এবং সভ্যতার বহুমাত্রিক সংলাপের মধ্য দিয়েই নতুন অর্থ পেয়েছিল। আরও পড়ুন শিকাগো নদীর বুকে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে ভ্রমণ আরবানার কাছাকাছি পৌঁছাতেই পরিবেশ যেন ধীরে ধীরে অন্য এক আবহে রূপ নিল। বিশ্ববিদ্যালয় শহরের নিজস্ব এক সৌন্দর্য আছে। পুরোনো বৃক্ষশোভিত রাস্তা, শান্ত আবাসিক এলাকা, শতবর্ষী ভবন আর শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে শহরটি যেন একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানকে ধারণ করে আছে। গাড়ি ধীরে ধীরে সেই ঐতিহাসিক ঠিকানার সামনে এসে থামল। ৫০৮ ওয়েস্ট হাই স্ট্রিট, আরবানা, ইলিনয়। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় ক্যাম্পাস এলাকার ভেতরে অবস্থিত বাড়িটিই ১৯১২ সালের শেষ ভাগ থেকে ১৯১৩ সালের শুরু পর্যন্ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রায় ছয় মাসের আবাস ছিল। তিনি এসেছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। রথীন্দ্রনাথ তখন এখানে কৃষিবিজ্ঞান ও কৃষি অর্থনীতি নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছিলেন। কবিগুরুর সঙ্গে ছিলেন পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। ভারত থেকে সমুদ্রপথে ইংল্যান্ড হয়ে তাঁদের এই আমেরিকা যাত্রা ছিল কেবল পারিবারিক সফর নয়, এক অর্থে বিশ্বমানবের দিকে রবীন্দ্রনাথের অগ্রযাত্রারও অংশ। আরবানায় অবস্থানকালে তিনি গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেন, অনুবাদগুলোকে পরিমার্জিত ও সংহত করেন এবং পাশ্চাত্য পাঠকের উপযোগী করে তোলেন। পরবর্তীকালে এই অনুবাদই উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, এজরা পাউন্ডসহ বহু পাশ্চাত্য সাহিত্যিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অভূতপূর্ব উত্থানের পথ প্রশস্ত করে। প্রথম দর্শনে বাড়িটি খুব সাধারণ মনে হলো। সাদা রঙের দোতলা বাড়ি, চারপাশে সবুজ গাছপালা, কোথাও কোনো জাঁকজমক নেই। কিন্তু সেই সাধারণতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বাংলা সাহিত্যের বিশ্বজয়ের এক অনন্য ইতিহাস। গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, এই নীরবতাই হয়তো বাড়িটির প্রকৃত ভাষা। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত আবেগের সঞ্চার হলো। ভাবছিলাম, এই দরজা দিয়েই হয়তো ধীর পায়ে বেরিয়ে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই জানালার পাশে বসেই হয়তো তিনি দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কবিতার পঙক্তি ভেবেছেন, কিংবা বাংলার স্মৃতি, মানুষের দুঃখ ও মানবমুক্তির স্বপ্নকে নতুন ভাষায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখানেই তিনি গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলেন, যা পরে বিশ্বসাহিত্যের দরজা খুলে দিয়েছিল তাঁর জন্য। গবেষকরা মনে করেন, আরবানার এই নীরব পরিবেশ তাঁর অনুবাদ ও ভাবনার কাজে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। আমি বাড়িটির চারপাশে ধীরে ধীরে হাঁটলাম, ছবি তুললাম, গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। কোনো পর্যটনকেন্দ্রের কোলাহল ছিল না, ছিল শুধু ইতিহাসের গভীর উপস্থিতি। মনে হচ্ছিল, শব্দের চেয়ে নীরবতাই এখানে বেশি কথা বলে। বাড়িটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের স্মারকচিহ্নও রয়েছে, আর সেই পরিচিতিমূলক ফলক যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই সাধারণ আমেরিকান বাড়িটিই একদিন বাংলা সাহিত্যের বিশ্বযাত্রার নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছিল। আরও পড়ুন শিকাগোর আকাশে বাংলাদেশের গর্ব উইলিস টাওয়ারের চূড়ায় একজন বাঙালি হিসেবে সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পৃথিবীর এক প্রান্তে এসে নিজের ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতির এমন এক স্মৃতির সামনে দাঁড়ানো সত্যিই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পরে জানতে পারলাম, বাড়িটি বর্তমানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ঐতিহাসিক আবাসন। ২০২১ সালে দুই বাঙালি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক কাজল মুখার্জি ও মৌসুমি দত্ত রায় এটি ক্রয় করেন এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। জানা গেল, আগের মালিক সহজে বাড়িটি বিক্রি করতে রাজি ছিলেন না; দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তাঁরা এই স্মৃতিবাহী বাড়িটি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। টেগোর হাউজ ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে বাড়িটির স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার চেষ্টা চলছে এবং ভবিষ্যতে রবীন্দ্রনাথ-সম্পর্কিত দলিল, আলোকচিত্র ও স্মারক সংগ্রহ করে এক ধরনের গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্নও রয়েছে। এটি কোনো সরকারি জাতীয় জাদুঘর নয়, তবে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আবাস হিসেবেও সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রস্মরণ, টেগোর ফেস্টিভ্যাল বা পূর্বানুমতির ভিত্তিতে সীমিত প্রবেশের সুযোগ আছে। এই তথ্যগুলো জানার পর আমার অনুভূতি আরও গভীর হলো। মনে হলো, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি আজও মানুষের হৃদয়ে কাজ করছে এবং এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরও পূর্ব ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের সেই আলো নিভে যায়নি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাছের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে একটু হাঁটলাম। পুরোনো গাছের নিচে ছায়াময় পথ, দূরে ছাত্রছাত্রীদের চলাফেরা, আর চারপাশের শান্ত পরিবেশ আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। মনে হচ্ছিল, এই শহর একদিন রবীন্দ্রনাথকে যেমন চিন্তার অবকাশ দিয়েছিল, আজও তেমনি সেই মননশীলতার আবহ বহন করে চলেছে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, পুরোনো আবাসিক বাড়ি, ছোট ছোট লন আর হাঁটার উপযোগী শান্ত রাস্তা মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা ধ্যানমগ্ন ও সৃষ্টিশীল মনকে স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট করে। জানতে পারলাম, আরবানায় দীর্ঘদিন ধরে রবীন্দ্রস্মরণ ও টেগোর ফেস্টিভ্যালের মতো সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে আসছে, যা এই শহরের সঙ্গে কবির ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আজও জীবন্ত রাখে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এখানে অতীত কোনো জাদুঘরের কাচে বন্দি নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের ভেতরেই নীরবে বেঁচে আছে। বিকেলের দিকে আবার গাড়িতে উঠলাম। ফেরার আগে শেষবারের মতো পেছন ফিরে টেগোর হাউজের দিকে তাকালাম। সূর্যের নরম আলো তখন বাড়িটির সাদা দেওয়ালে পড়েছে। মনে হলো, বাড়িটি নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরে জ্বলছে এক অনির্বাণ সাংস্কৃতিক আলো, যা বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মানবতার স্মৃতিকে আজও বহন করে চলেছে। আরও পড়ুন শ্রমিক দিবসের সূতিকাগার শিকাগোর হে মার্কেট ঘুরে দেখা ওয়েস্ট লাফায়েতে ফিরতে ফিরতে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সোনালি আলোয় ভেসে যাচ্ছিল ভুট্টাক্ষেতগুলো। গাড়ির জানালার বাইরে সেই আলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক বাড়ি দেখার দিন নয়। এটি ছিল নিজের শেকড়কে নতুন করে অনুভব করার দিন। টেগোর হাউজের সবচেয়ে বড় বিস্ময় তার স্থাপত্য নয় বরং স্মৃতিকে মর্যাদা দেওয়ার সংস্কৃতি। একজন বাঙালি কবি কয়েক মাস এখানে ছিলেন, আর সেই স্মৃতিকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে। বহু দূরের দেশে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলাম, রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে শুধু একজন কবি নন, তিনি এক চলমান সেতু, যা বাংলা থেকে বিশ্বে, অতীত থেকে বর্তমানের দিকে, মানুষ থেকে মানুষের হৃদয়ে সংযোগ স্থাপন করে। আরবানায় টেগোর হাউজের পথে সেই যাত্রা তাই আমার কাছে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিগত তীর্থযাত্রা হয়ে থাকবে। এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>