জাতীয়

সড়ক-অ্যাম্বুলেন্স নেই, স্বজনের কাঁধই ভরসা

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
10 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে এখনো পৌঁছায়নি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা। উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা পথে নেই সড়ক, নেই অ্যাম্বুলেন্স; ফলে জরুরি মুহূর্তে অসুস্থ মানুষকে কাঁধে তুলে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ। সন্তানসম্ভবা নারী থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগী-সবাইকে চিকিৎসার জন্য নির্ভর করতে হয় স্বজনদের কাঁধের ওপর। প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এমনই অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন লংগদুর দুর্গম পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রসববেদনায় ছটফট করতে শুরু হয় ওই উপজেলার বাসিন্দা সুমিতা চাকমার। এসময় হাসপাতালে নেওয়ার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না স্বামী সুপন চাকমা। কারণ দুর্গম পথ ও পাহাড়ি ঢল পেরিয়ে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হলে পাড়ি দিতে হবে অন্তত ৫ কিলোমিটার খাড়া পাহাড়ি পথ, পাঁচটি প্রমত্ত ঝিরি ও তিনটি উঁচু পাহাড়। সেখানে নেই কোনো যানবাহন, সড়ক কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক। পরে বাধ্য হয়ে পাড়ার চার ব্যক্তি বাঁশ ও বোরগি (কোমড় তাঁতে বোনা চাকমাদের বিশেষ কাঁথা বা চাদর) দিয়ে তৈরি করেন ‘ভাড়’ বা ঝুলন্ত দোলা। বৃষ্টি কিছুটা কমলে সেই দোলায় সুমিতাকে শুইয়ে শুরু হয় দুর্গম পাহাড়ি পথের যাত্রা। আরও পড়ুন রাঙ্গামাটির দুর্গম অরণ্যে নান্দনিক সব পাহাড়ি ঝরনা প্রায় ৩ ঘণ্টার চেষ্টায় তাকে নেওয়া হয় লংগদু-দিঘীনালা সড়কের পাশে ডাঙ্গাবাজার নামক এলাকায়। পরে এখান থেকে অটোরিকশায় করে সুমিতাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ৫ আগস্ট রাতে সুমিতা চিকিৎকদের সহযোগিতায় সন্তান প্রসব করেন তিনি। ‘দুর্গম এলাকায় চিকিৎসকদের ধরে রাখা আমাদের জন্য সত্যিই এক বড় চ্যালেঞ্জ। তারা সেখানে থাকতে চান না কারণ সেখানে বিদ্যুৎ নেই, পরিবারের ভালো থাকার ব্যবস্থা নেই, সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক শাস্তি দিয়েও সবাইকে বাধ্য করা যায় না।’ সুপন চাকমা জাগো নিউজকে বলেন, আমি ও আমার পরিবার খুবই ভয়ের মধ্যে একটা দিন পার করেছি। প্রতিবেশীরা আমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। তারা এগিয়ে না এলে আমার স্ত্রী ও সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। তবে এখনো বাড়ি ফিরে যেতে আবারও প্রতিবেশি সেই বন্ধুদের সহযোগিতা নিতে হবে। এছাড়া স্ত্রী ও সন্তানকে এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বাড়িতে নেওয়া সম্ভব হবে না। এদিকে এমন ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির শত শত দুর্গম পাড়ায় এভাবেই চিকিৎসাসেবা বঞ্চনার শিকার অসংখ্য মানুষ। চিকিৎসার অভাবে অকালে ঝরে পড়ছে অসংখ্য প্রাণ। সমতলে যখন ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক চিকিৎসার আলো পৌঁছে গেছে, তখন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আটকে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে একটি সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ বা স্যালাইন পাওয়াও যেন পরম সৌভাগ্যের বিষয়। দুর্গম শীলাছড়ার পেরা আদম পাড়ার বাসিন্দা মানবেন্দ্র চাকমা জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের গ্রামসহ আশেপাশের আরও ৫টি গ্রামে কোনো রাস্তা নেই। এখানের বাসিন্দারা খুবই কষ্টে বসবাস করে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এখানকার ঝিরিগুলোতে স্রোত থাকে। তখন পারাপার হওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, রোগী ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া খুবই বিপজ্জনক। ‘আমাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো সমূহ জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। যেখানে গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা দেওয়াটা প্রায় অসম্ভব। এসব কারণে সেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে এসব সংকটের দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।’ পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম গ্রামগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স শব্দটির সঙ্গে মানুষের কোনো পরিচয় নেই। ফোর-হুইল ড্রাইভের কোনো গাড়িও যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে মানুষের একমাত্র ভরসা বাঁশে ও কাপড়ের তৈরি দোলা বা ভাড়। গর্ভবতী নারী, সাপে কাটা রোগী বা তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্তদের এই দোলায় শুইয়ে চারজন তরুণ কাঁধে তুলে নেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চলার পর যখন হাসপাতালে পৌঁছানো যায়, ততক্ষণে বহু রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে, আবার অনেকে পথেই মারা যান। স্থানীয় ইউপি সদস্য কৃমল চাকমা বলেন, আমাদের ২ নম্বর ওয়ার্ডে সাড়ে ৬শ’ পরিবারের বসবাস। এখানে পাড়া আছে ৮টি। এর মধ্যে ৫টি পাড়ায় কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ। এসব পাড়ার বাসিন্দারা খুবই কষ্টকরে জীবনযাপন করে। দুর্গম এলাকা বিবেচনা করে এখানে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক বা পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র স্থাপন করা খুবই জরুরি। ‘এই বিভাগে জনবলের একটি বিশাল সংকট রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে সেবা ব্যহত হচ্ছে। সংকট মোকাবেলায় জনবল নিয়োগের জন্য গত বছরের নভেম্বরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল জেলা পরিষদ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোটা সংক্রান্ত দাবির মুখে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সংকট সমাধানে আমরা কাজ করছি। আশা করছি শিগগিরই এই নিয়োগটি সম্পন্ন করা হবে।’ আটারকছড়া ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য স্মরণিকা চাকমা বলেন, আমাদের জন্য সবচেয়ে আতঙ্কের নাম হলো বর্ষাকাল আর প্রসববেদনা। বর্ষায় পাহাড়ি ঝিড়িগুলো যখন ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তখন পাড়া বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কোনো গর্ভবতী বোনের জটিলতা দেখা দিলে আমাদের চোখের সামনে ছটফট করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। কত মা যে সন্তান পেটে নিয়ে মারা গেছেন, তার কোনো হিসাব সরকারি খাতায় নেই। আরও পড়ুন ১৩৫ বছরের পাকশী রেলওয়ে হাসপাতালজুড়ে ভূতুড়ে পরিবেশ আটারকছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অজয় মিত্র চাকমা বলেন, আমার ইউনিয়নটি সম্পূর্ণ পাহাড়ি এলাকায়। এখানে রাস্তাঘাটের খুব অভাব রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল। দুর্গমতার কারণে এখানকার বাসিন্দারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। হাসপাতালে নেওয়ার সময় অনেক রোগী মারা যায়। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের সেবাদানকারী সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। চিকিৎসকদের মতে, একজন আশঙ্কাজনক রোগীকে যেভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে হেঁটে নিয়ে যাওয়া হয়, তা অনেক সময় রোগীর অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে। বিশেষ করে ট্রমা বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের রোগীদের ক্ষেত্রে এই সফরই ডেকে আনে অকালমৃত্যু। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি। দুর্গম, যোগাযোগের অব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট না থাকার অজুহাতে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী মাসের পর মাস এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান না। শহরভিত্তিক হাসপাতালগুলোতে যেখানে চিকিৎসকদের অতিরিক্ত চাপ, সেখানে পাহাড়ের উপকেন্দ্রে পদায়ন পাওয়া চিকিৎসকদের বড় অংশই প্রেষণে (ডেপুটেশন) সমতলে বা জেলা সদরে চলে আসেন। পাহাড়ের প্রান্তিক জনপদগুলোতে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসে নানাবিধ রোগের প্রাদুর্ভাব। প্রতি বর্ষার মৌসুমে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু এবং জলবাহিত নানা রোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমতল ভূমির স্বাস্থ্যনীতি দিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলের স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমতলে এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় যে পরিমাণ মানুষ বাস করে, পাহাড়ে সমপরিমাণ জায়গায় জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক কম। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক বেশি। পাহাড়ে তিন হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়তো ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকা অতিক্রম করতে হয়। অথচ স্বাস্থ্য বাজেটের বরাদ্দ এবং জনবল কাঠামোর পরিকল্পনা করার সময় এই ভৌগোলিক জটিলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পার্বত্য স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছেন, পাহাড়ে শুধু ভবন বানিয়ে দিলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে না। যতক্ষণ না সেখানে চিকিৎসকদের থাকার জন্য নিরাপদ ও উপযোগী পরিবেশ, বিশেষ পাহাড়ি ভাতা, এবং মোবাইল হেলথ ক্যাম্পের বন্দোবস্ত করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার কোনো স্থায়ী উন্নতি হবে না। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসকদের ধরে রাখা আমাদের জন্য সত্যিই এক বড় চ্যালেঞ্জ। তারা সেখানে থাকতে চান না কারণ সেখানে বিদ্যুৎ নেই, পরিবারের ভালো থাকার ব্যবস্থা নেই, সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক শাস্তি দিয়েও সবাইকে বাধ্য করা যায় না। তিনি আরও বলেন, সরকার বর্তমানে পাহাড়ি এলাকায় স্যাটেলাইট ক্লিনিক এবং বিশেষ মোবাইল মেডিকেল টিম পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও মাঝে মধ্যে দুর্গম পাড়াগুলোতে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও ওষুধ বিতরণ করা হয়, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মিনহাজ মুর্শিদ জাগো নিউজকে বলেন, এই বিভাগে জনবলের একটি বিশাল সংকট রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে সেবা ব্যহত হচ্ছে। সংকট মোকাবেলায় জনবল নিয়োগের জন্য গত বছরের নভেম্বরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল জেলা পরিষদ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোটা সংক্রান্ত দাবির মুখে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সংকট সমাধানে আমরা কাজ করছি। আশা করছি শিগগিরই এই নিয়োগটি সম্পন্ন করা হবে। আরও পড়ুন অবৈধ মহালে সরকারি বালু হরিলুট জনবল সংকট, উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ এবং অবকাঠামো সংকটের কারণে সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান রাঙ্গামাটি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক সোহাগময় চাকমা। তিনি বলেন, জনবল সংকট সমাধানের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও রাজনৈতিক কারণে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ওষুধসহ উপজেলাগুলোতে লজিস্টিক সাপোর্ট পৌঁছানোর মতো আর্থিক বরাদ্দ নেই গত আড়াই বছর ধরে। সোহাগময় চাকমা বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো সমূহ জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। যেখানে গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা দেওয়াটা প্রায় অসম্ভব। এসব কারণে সেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তবে এসব সংকটের দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। আবু দারদা খান আরমান/এনএইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>