বিজ্ঞাপন
(পূর্ব প্রকাশের পর-পর্ব ১২)
আনিসুর রহমান এবং রেহমান সোবহান আমার বিশ্ববিদ্যালয়-উত্তর জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন। তাই এঁদের মিল ও অমিল সম্পর্কে একটু বলতেই হয়। দুজনেরই জন্ম সমাজের সুবিধাভোগী অংশে। আনিসুর রহমান স্যারের পিতা হাফিজুর রহমান প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, অভিজাত বংশের এবং রেহমান সোবহানের পিতা ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের জাঁদরেল অফিসার, মা ঢাকার নবাব পরিবারের। তাঁরা দুজনেই পাকিস্তানের ‘দুই অর্থনীতি’র প্রবক্তাদের মধ্যে অন্যতম। রেহমান সোবহান এবং আনিসুর রহমান প্রায় সমবয়সী এবং যথাক্রমে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ঢাকা সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের সহপাঠী। দুজনেই বিভিন্ন মাত্রায় সমাজবাদী সমাজ বিনির্মাণের পক্ষে, দুজনেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য একই রাস্তায় ভারত গমন করেন। আবার দুজনেই যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় যোগদান করেন। এবং সবশেষে, নিন্দুকের কথায়, দুজনের ভেতরই একটু উন্নাসিকতার ভাব পরিলক্ষিত হয়।
তবে এ দুজনের মধ্যে পার্থক্য এক জায়গায়, আর তা হলো এই যে, আনিসুর রহমান ভালো বাংলা পড়তে ও লিখতে পারেন, নিজে রবীন্দ্রসংগীতের গায়ক এবং গবেষক; তাঁর বিপরীতে রেহমান সোবহান একুশ বছর বয়সে প্রথমবার ঢাকায় এসে বাংলা পড়তে পারতেন না, রবীন্দ্রসংগীত প্রায় শোনেননি এবং রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের দ্বারা প্রাণিত হননি। তিনি তখন রীতিমতো এক বাদামি সাহেব। পরে অবশ্য ভাঙাচোরা বাংলা বলতে পারতেন।
তাঁদের দুজনের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নিমিত্ত ভারতে যাওয়ার অনন্য গল্পটি না শোনালেই নয়।
সত্তরের সেই ভয়াল মার্চে রেহমান সোবহান গুলশান থেকে নদী পেরিয়ে বেরাইদ নামে এক গ্রামে পৌঁছেন; মিশে গেলেন ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে পলায়নরত হাজারো জনতার সঙ্গে। এই নিষ্ক্রমণে আনিসুর রহমানের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, যেখানে ছিলেন শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারও। আনিসুর রহমান রেহমান সোবহানকে জানালেন যে, তাঁর ফ্ল্যাটের ব্লকে ঢুকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে ইংরেজির অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং পরিসংখ্যানের মনিরুজ্জামানকে হত্যা করেছে। তিনি কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছেন। সম্ভাব্য পাকিস্তানি গুপ্তচরদের কাছে পরিচয় গোপন করতে আনিসুর রহমানের ছদ্মনাম নিয়েছেন আবদুর রশিদ এবং তাঁর পরামর্শে রেহমান সোবহানের ছদ্মনাম হলো দীন মোহাম্মদ। ভারতের ভেতর গিয়েও তাঁরা দুজন যথাক্রমে অশোক রায় এবং মোহন লাল।
যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। যাত্রাপথে লঞ্চে একদল ছাত্র দেখতে পেল ফিরিঙ্গি রেহমান সোবহানের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে, কিন্তু তিনি যে বাংলা জানেন না। আনিসুর রহমান ছাত্রদের বোঝালেন, উনি অসুস্থ, কথা বলতে বারণ আছে। এ যাত্রায় এভাবেই বাঁচোয়া। কিন্তু লঞ্চ থেকে নেমে বিপদ ঘটাল রেহমান সোবহানের ‘অবাঙালি’ চেহারা এবং অদ্ভুত পোশাক—কিছুটা উদ্ভট খাদি কুর্তা, বেল্ট দিয়ে বাঁধা চেক লুঙ্গি (যেহেতু আগে কখনো লুঙ্গি পরেননি) এবং পাঠানি চপ্পল। আনিসুর রহমানের পরামর্শে পরা এই পোশাকই যেন কাল হয়ে দাঁড়াল। সেখানকার কিছু লোক বলতে থাকে, তিনি পাকিস্তানি চর এবং তাঁকে ধরতে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এমন গোলমেলে পরিস্থিতিতে রেহমান সোবহানকে রক্ষা করতে গিয়ে আনিস স্যারকে কিছু মার হজম করতে হয়; চোয়ালের আঘাতে কদিন খেতে অসুবিধা হয়েছিল তাঁর।
অতঃপর নদীর পারে একটা চায়ের দোকানের সামনে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় এবং পাকিস্তানি চর ঠাহর করে জনতা আরও মারমুখী হয়ে ওঠে। তাঁদের প্রশমিত করার জন্য আনিসুর রহমান রবীন্দ্রসংগীত গাইলেন বটে, কিন্তু মুক্তি মিলল না। অবশেষে পাশের গ্রাম থেকে আমার ক্লাসমেট মুক্তাদা এবং তাঁর মামা মফাক্কের এসে তাঁদের খাঁটি বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর গ্রামে বিখ্যাত হলেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো এবং গুজব ছড়াল যে বঙ্গবন্ধু এসেছেন।
বাকিটা ইতিহাস—প্রবাসী সরকারকে সর্বাত্মক সাহায্য করা—হোক পরিকল্পনায় কিংবা বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ে।
১৯৬৭-৭৩ সময়কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে অন্তত চারজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন—রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান, মির্জা মোজাম্মেল হক এবং তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী। শেষোক্তজন একমাত্র উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি প্রবাসী সরকারে যোগ না দিয়ে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে অবস্থান করেছেন।
প্রফেসর ওয়াহিদুল হকের কথা ঢের শুনেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি কানাডার বিখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্ক ও অর্থনীতির অধ্যাপক, ইসলামাবাদ ইউনিভার্সিটিতেও পড়িয়েছেন। ১৯৬৯ সালে একদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার এক সমাবেশে দূরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনছিলেন। সমাবেশ শেষে আমরা কজন আলাপ করার জন্য স্যারের পিছু নিলাম। অনেক কথা বলার পর স্যার রথম্যান সিগারেটের একটা প্যাকেট থেকে কয়েকটা শলাকা বের করে আমাদের সামনে ধরে বললেন, ‘অভ্যাস আছে? নাও, নাও। লজ্জা কীসের?’ আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কাঁচুমাচু দাঁত কেলিয়ে একটা নির্জলা মিথ্যা কথা ছাড়লাম—‘স্যার, আমরা সিগারেট খাই না।’ যদিও বেরিয়ে এসে আফসোস হচ্ছিল।
বাংলাদেশ হওয়ার পর তিনি প্রায় বছরই অন্তত একবার আসতেন—হয়তো বিআইডিএসে, বাংলাদেশ অর্থনীতির সেমিনারে অথবা পারিবারিক কারণে। কখনো-সখনো থাকতেন টিএসসির গেস্ট রুমে।
তিনি ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের মে মাস পর্যন্ত এরশাদের শাসনামলে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদ সম্ভবত ভেবেছিলেন, এমন একজন বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ পেলে বিশ্বকে বোঝাতে পারবেন যে তিনি স্বৈরশাসক হলেও গুণীজনের উপাসক। তবে প্রফেসর ওয়াহিদুল হকের এরশাদ মন্ত্রিসভায় যোগদান তাঁর ভক্তদের কাছ থেকে প্রচুর সমালোচনা ডেকে আনে। বিশেষত যখন দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি চরম বিপাকে, রিজার্ভ তলানিতে, রাজস্ব ব্যয় মেটাতে ধার করতে হচ্ছিল।
প্রসঙ্গত বলে নিই, বাংলাদেশে এযাবৎ যতজন অর্থমন্ত্রী হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে পাঁচজন একই ব্যাচের ছাত্র—সাইফুর রহমান, আবুল মাল আবদুল মুহিত, এম. সায়েদুজ্জামান, জেনারেল (অব.) এ. কে. মুনিম এবং ওয়াহিদুল হক। তো, আশির দশকে অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’-তে রপ্তানিমুখিতা ও আমদানি প্রতিকল্প বিষয়ে প্রকাশিত আমার এক লেখা পড়ে তিনি খুব মুগ্ধ হন এবং আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বলেন। পরে জানলাম, তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য একটা কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম মডেল (সিজিই) প্রকল্প গ্রহণ করে ওটাতে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করতে চান।
দুর্ভাগ্যবশত, কিছুদিনের মধ্যে তাঁকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আমি তখন কলাবাগানে বাস করি এবং মন্ত্রিত্ব ছেড়ে তিনিও ওখানে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিলেন। এক সন্ধ্যায় গিয়ে দেখি, খালি গায়ে একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে স্যার হাঁটাহাঁটি করছেন। কিছু আলাপচারিতার পর বললাম, ‘স্যার, আমাকে যে আপনি প্রজেক্টে নিতে চাইছেন, আমি তো অঙ্কে খুব কাঁচা।’ স্যার বললেন, ‘অঙ্কই সব কিছু নাকি? তোমার প্রবন্ধটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’ যাই হোক, পরে ওই প্রজেক্ট নিয়ে তিনি আর এগোতে পারেননি।
তবে একজন অর্থমন্ত্রী হিসেবে খুব অল্প সময়ে দুটো কাজ করে গেছেন, যা জাতির জন্য উদাহরণ হয়ে আছে। এক, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রবর্তনের প্রধান পরামর্শক তিনি ছিলেন। এরশাদ আমলে গৃহীত ওই নীতিমালা পরবর্তী সরকার অব্যাহত রাখে। দুই, তিনি গবেষণা করিয়ে দেখতে পান যে, সেই সময় বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে, যার সঙ্গে সম্পৃক্ত সমাজের বিত্তবান, প্রভাবশালীরা, এমনকি ক্ষমতায় যারা আছে, তারাও; এবং এই প্রবণতা রিজার্ভ নিচে নেমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। রীতিমতো একটা বোমা ফাটল, যখন এরশাদশাহীর ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এতেও আপত্তির কিছু ছিল না, কিন্তু গোল বাঁধল যখন তিনি আবার সে কথা সংবাদ সম্মেলনেও বলে ফেললেন। ব্যাস, পরের দিন মন্ত্রিত্ব শেষ। অবশ্য তার মাস ছয়েক পর সেই সরকারের পতন ঘটে এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ২০২০ সালের ৩ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আমাদের বিভাগ ছাড়াও অন্যান্য বিভাগের প্রতিবাদী শিক্ষকদের বক্তব্য ও লেখা পড়ে উজ্জীবিত হতে লাগলাম—আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, খান সারওয়ার মুর্শিদ, মুনীর চৌধুরী, কবীর চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। বিশিষ্ট বাম-চিন্তাবিদ, গবেষক এবং রাজনৈতিক কর্মী বদরুদ্দীন উমর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন শুধু নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগণের জন্য। ভাবা যায়? সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় তাঁর ক্ষুরধার লেখনী, বই-পুস্তক আমাকে আলোড়িত করেছিল।
১৯৬৭-৭৩ সময়কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে অন্তত চারজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন—রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান, মির্জা মোজাম্মেল হক এবং তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী। শেষোক্তজন একমাত্র উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি প্রবাসী সরকারে যোগ না দিয়ে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে অবস্থান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ অবদানের জন্য নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে তাঁকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে। জানা গেল, মির্জা মোজাম্মেল হক ইংল্যান্ডে আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে জনমত গঠনে লিপ্ত ছিলেন।
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন