বিজ্ঞাপন
২৪ জুলাই, শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিনের শেষ বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের বিপরীতে এবং কলাভবন ও রেজিস্ট্রার ভবনের মাঝামাঝি সবুজ ঘাস ও গাছগাছালিতে ঘেরা পথটি ছিল সবার পদচারণায় মুখর। অনেকেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এসেছেন ঘুরতে।
কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ে একটি গোলচত্বর। সেখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন অনেকে। গোলচত্বরের সামনেই জমে আছে বৃষ্টির পানি। হঠাৎ এক নারী স্বামীকে উদ্দেশ করে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘এ পানিতে ডেঙ্গুর মশা নেই তো?’ তার এ কথায় আশপাশে থাকা অন্যরাও যেন নড়েচড়ে বসলেন।
প্রশ্নটি নিছক উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের জমে থাকা স্বচ্ছ পানিই এডিস মশার প্রজননের অন্যতম আদর্শ স্থান।
বর্ষাকালের আষাঢ় ও শ্রাবণজুড়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নানা জায়গায় জমে থাকা পানিতে তৈরি হচ্ছে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র। এরই প্রভাব পড়ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা–দুই-ই দ্রুত বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মলচত্বরে জমে থাকা পানি
চলতি জুলাই মাস শেষ হতে এখনো ৫ দিন বাকি থাকলেও রোববার (২৬ জুলাই) পর্যন্ত এই মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬ হাজার ৯৯৪ জন। অথচ পুরো জুন মাসে আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৫৮
মৃত্যুর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। জুন মাসে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১৩ জন। আর জুলাইয়ের এই ২৬ দিনেই মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মারা গেছে ৪৩ জন। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ৫ জনের (জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ২ এবং মে মাসে ১ জন)। অর্থাৎ জুন ও জুলাই–মাত্র দুই মাসেই মারা গেছে ৩৮ জন। জানুয়ারিতে আক্রান্ত ছিল ১ হাজার ৮১ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ২ জনের। সেই তুলনায় জুলাইয়ে এক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১২ গুণেরও বেশি হয়েছে, আর আক্রান্তও বেড়েছে ছয় গুণের বেশি।
সামনে আরও খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষা অব্যাহত থাকায় আগামী মাসগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ না হলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
সম্প্রতি জাগো নিউজ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, গত দুই বছরের তুলনায় এ বছর এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি পাওয়া গেছে। বিষয়টি সিটি করপোরেশনকে জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তার ভাষায়, ‘এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সারাবছর কাজ করতে হবে। কিউলেক্স ও এডিস মশার জন্য আলাদা কর্মসূচি প্রয়োজন। কিন্তু সিটি করপোরেশন মৌসুমি কার্যক্রমের বাইরে কার্যকর উদ্যোগ নেয় না।’
আরও পড়ুন
ড্যাব মহাসচিব / ডেঙ্গু নির্মূলে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বেশি কার্যকর
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গুর উপসর্গও বদলে যাচ্ছে। আগে কয়েক দিন উচ্চমাত্রার জ্বরের পর জটিলতা দেখা দিলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে এক-দুদিনের মধ্যেই রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বরও থাকে না। তাই ডেঙ্গুর মৌসুমে যে কারও জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিৎ। জ্বরের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করলে দ্রুত রোগ শনাক্ত সম্ভব হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে।
মোট মৃত্যুর অর্ধেকই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৪৩ জনের মধ্যে ২২ জন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। এর মধ্যে শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাতেই মারা গেছেন ২১ জন, উত্তরে ৬ জন এবং দক্ষিণে ১৫ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষা অব্যাহত থাকায় আগামী মাসগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ না হলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
ঢাকা বিভাগের অন্য এলাকায় মৃত্যু হয়েছে মাত্র এক জনের। অবশিষ্ট মৃত্যুর মধ্যে খুলনায় ৬ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জন, চট্টগ্রামে ৪ জন, বরিশালে ৪ জন এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ১ জন করে মারা গেছে।
বিভাগভিত্তিক পরিস্থিতি ও আক্রান্তে শীর্ষে বরিশাল
১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ৯৮ জন। আক্রান্তে শীর্ষে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে-
ঢাকা বিভাগ মোট ৪৮৪৪ জন
বরিশাল বিভাগ: ৩০০২ জন
চট্টগ্রাম বিভাগ: ২২৭০ জন
খুলনা বিভাগ: ১৬৮৪ জন
ময়মনসিংহ বিভাগ: ৫২৫ জন
রাজশাহী বিভাগ: ৪৩৮ জন
রংপুর বিভাগ: ২৪৭ জন
সিলেট বিভাগ: ৮৮ জন
আক্রান্তে পুরুষ বেশি, মৃত্যুর তালিকায় নারী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট আক্রান্ত ১৩ হাজার ৯৮ জনের মধ্যে ৬১.৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮.৫ শতাংশ নারী। তবে মৃত্যুর চিত্র ভিন্ন। এ পর্যন্ত মারা যাওয়াদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট ৪৩ জনের মধ্যে নারী ৫৮.১ শতাংশ এবং পুরুষ ৪১.৯ শতাংশ।
আরও পড়ুন
সরকারি হাসপাতালে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে
চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৫৮ জন। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১১ হাজার ৯৩৫ জন।
২০১৯ সালের তুলনায় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে লার্ভার ঘনত্ব
দেশে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়েছিল ২০১৯ সালে। সে বছর আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। জানুয়ারি থেকে মে প্রথম পাঁচ মাসে রোগী ছিল মাত্র ৩২৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মৌসুমপূর্ব জরিপে প্লাস্টিকের ড্রামে ২৩.৯৮ শতাংশ এবং জলমগ্ন মেঝেতে ২৩.৬৪ শতাংশ এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালে এ হার ছিল যথাক্রমে ১১.৪৩ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ।
কেন ব্যর্থ হচ্ছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ?
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে জনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাদের মতে, সমস্যার মূল কারণগুলো হলো:
সারা বছর ধারাবাহিক মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাব।
বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক ‘অ্যাকটিভ ক্লাস্টার’ পদ্ধতি বাস্তবায়নে অনীহা।
মশা নিধনের ওষুধের কার্যকারিতা ও প্রয়োগে যথাযথ তদারকির ঘাটতি।
নিজস্ব বৈজ্ঞানিক জরিপ ব্যবস্থার অভাব।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করা।
দক্ষ জনবলের সংকট।
জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া।
জরিমানাকেন্দ্রিক উদ্যোগের পরিবর্তে স্কুল, স্থানীয় কমিউনিটি ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা কার্যক্রম গড়ে তুলতে ব্যর্থতা।
আরও পড়ুন
ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ / ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব নয়, সমন্বিত উদ্যোগে বিস্তার কমাতে হবে
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সারাবছর এডিস নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা না হলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
এমইউ/এমআইএইচএস
বিজ্ঞাপন