বিজ্ঞাপন
আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। সারিবদ্ধ পাহাড়-টিলা। জালের মতো ছড়িয়ে আছে মহাদেও, গণেশ্বরী, মঙ্গলেশ্বরী, ফুলেশ্বরীর মতো নদ-নদী আর ছড়াবেষ্টিত বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জনপদ কলমাকান্দা। ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নেত্রকোনার একটি উপজেলা। ৩৭৬ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপজেলাটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি আর সংস্কৃতির সংমিশ্রণে অপরূপ লীলাভূমি।
উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়ন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকা। এর মধ্যে রংছাতির চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন এলাকা পাহাড়ের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। যেখানে আছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, পাহাড়ের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা রং-বেরঙের পাথর, ঝরনার মতো স্বচ্ছ জলধারা ও সিলিকা বালুর চরাচর। সবকিছু মিলে যেন নৈসর্গিক রূপের রহস্যে ঘেরা ও নানা কিংবদন্তিতে সমৃদ্ধ জনপদ; যা খুলে দিতে পারে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা।
চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন পাশাপাশি দুটি এলাকা। গ্রাম দুটির ঠিক উত্তরে সুউচ্চ মেঘালয় পাহাড়। পাহাড়ের খানিকটা বাংলাদেশে পড়লেও সীমানার যে কোনো প্রান্তে দাঁড়ালে ধনুকের মতো বাঁকা পাহাড়পুঞ্জের সৌন্দর্য অনায়াসে উপভোগ করা যায়। সেই সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ওই স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যান। অবশ্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পর্যটকদের ভ্রমণে কিছুটা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফের কড়া পাহারা চলে সার্বক্ষণিক। চন্দ্রডিঙা থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে হাতিবেড় এলাকায় বসানো হয়েছে বিজিবি চেকপোস্ট।
হাতিবেড় গ্রামসংলগ্ন চন্দ্রডিঙা পাহাড়টির জনশ্রুতি আছে, পঞ্চদশ শতকে রচিত মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যতম চরিত্র চাঁদ সওদাগরকে নিয়ে। বিদেশি ধনাঢ্য বণিক চাঁদ সওদাগর বাণিজ্য করতে এসে ওই স্থানে সর্পদেবী মনসার অভিশাপে তার ডিঙি বা নৌকা আটকে যায়। এরপর থেকে স্থানটির নামকরণ হয় চন্দ্রডিঙা। অবশ্য এর স্বপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ বা ইতিহাস পাওয়া যায়নি। কিন্তু স্থানীয়রা লোককাহিনিটি যুগযুগ ধরে বিশ্বাস করে আসছেন।
আরও পড়ুন
রাঙ্গামাটির দুর্গম অরণ্যে নান্দনিক সব পাহাড়ি ঝরনা
পাহাড়টির মাঝখানে বিশাল পাথরের আংশিক নৌকার মাস্তুলের মতো দেখতে হওয়ায় সেখানে প্রতি বছর হাজং ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মনসাপূজা ও চাঁদ সওদাগরের পূজা করে থাকেন। এ ছাড়া প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার সেখানে ধূপ ও প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়। সেখানে একটি শতবর্ষী বটগাছ আছে, গাছের নিচে ছড়া ও কাছে ঝরনা থাকায় স্থানটি দর্শনার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয়।
বিজিবি নেত্রকোনা-৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণে সীমান্তের কিছু স্থানে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। পাহাড়ি ঝরনা ছড়ায় গা ভেজাতে অনেক পর্যটক ভুল করে শূন্যরেখায় চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ঝুঁকি এড়াতে চেকপোস্ট বসিয়ে তাদের সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পর্যটকেরা সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন।’
সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, চেকপোস্টের কাছে বেশ কিছু দোকান ও খাবার হোটেল গড়ে উঠেছে। শত শত পর্যটকের ভিড় জমেছে। আইন মেনে তারা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। সেখানে আসা নেত্রকোনা শহরের বাসিন্দা একে আজাদ পিন্টু বলেন, ‘এই স্থান প্রকৃতির আশীর্বাদ।’ তিনি প্রায়ই পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসেন। বছরজুড়েই লোকজনের আনাগোনা ঘটে। তবে শুকনো মৌসুমে ভিড় বাড়ে। আইন মেনে সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন তারা।
ছোট দুই সন্তানসহ পরিবার নিয়ে আসা ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সুমন চৌধুরী বলছিলেন, ‘আমি অনেক স্থান দেখেছি। চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন একটু আলাদা। এমন নীরব মনোমুগ্ধকর এলাকা আর দেখিনি। মন প্রশান্ত করতে চাইলে যে কেউ ঘুরে যেতে পারেন। অনেক ভিডিও ও ছবি তুলেছি। তবে বিজিবি নিষেধ করায় সব এলাকায় ঘুরতে যেতে পারিনি।’ তিনি জানান, পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা, ভালো হোটেল ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হলে স্থানটি আরও আকর্ষণীয় হবে।
আরও পড়ুন
অপরূপ সৌন্দর্যের আরেক নাম নাপিত্তাছড়া ঝরনা
চন্দ্রডিঙা থেকে ১৫ মিনিটের পথ পাতলাবন সীমান্ত। একটু এগোলেই চোখে পড়বে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝরনাধারার মতো নেমে আসা মহাদেও নদ। নদটির উত্তর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সবুজ অরণ্যে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়। যতদূর চোখ যায় ধনুকের মতো বাঁকা পাহাড়ের সারি যেন মিশে গেছে মেঘমালার সঙ্গে। মহাদেও নদের আছে কাচের মতো পরিষ্কার পানির ঐতিহ্য। এর বুকজুড়ে পড়ে আছে সমুদ্রের বালুরাশির মতো সিলিকা বালুর স্তর। শুষ্ক মৌসুমে পর্যটকেরা চাইলে গা ভিজিয়ে নিতে পারেন, এমনকি হাঁটতেও পারেন বালুরাশিতে। বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা নদের খরস্রোতের সঙ্গে বহু শতবর্ষ ধরে বয়ে আনছে বালু, নুড়ি পাথর আর কয়লা। এসব এখানকার মানুষের জীবিকার উৎস। নদের বালু নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত হয়। তবে অপরিকল্পিতভাবে শত শত বাংলা ড্রেজার দিয়ে বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে নদটি রক্ষায় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’ আদালতে রিট করায় বালু উত্তোলন বন্ধ আছে।
পাতলাবন এলাকার বাসিন্দা ঝুমুর মারাক বলেন, ‘পাতলাবন, বেতগড়া, চন্দ্রডিঙা ও এর পাশে গোপালবাড়ির চেংগ্নী এলাকা, পাশের ইউনিয়ন লেংগুরার ফুলবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধে ‘সাত শহীদের’ মাজার এলাকাসহ সবুজে আচ্ছাদিত ছোট-বড় পাহাড় আর ওপরে মেঘালয়ের পাহাড় চোখের তৃষ্ণা মেটায় পর্যটকদের। ঘুরতে আসা পর্যটকদের স্থানীয় বাসিন্দারা নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। চেংগ্নী পাহাড়ে হাজং সম্প্রদায়ের গোপালপুর মন্দিরে ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী মেলা হয়ে আসছে। ওই সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষের ভিড় আরও বাড়ে।’
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘নেত্রকোনা জেলায় অনেক সুন্দর স্থান আছে। তার মধ্যে কলমাকান্দা সীমান্তে চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন অন্যতম। এলাকাগুলোতে যাতে পর্যটকেরা সহজে যেতে পারেন, তাদের নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল বৃদ্ধি করলে এখানে দেশি- বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা আরও বৃদ্ধি পাবে।’
আরও পড়ুন
ঘুরে আসুন অনিন্দ্য সুন্দর বোয়ালিয়া ঝরনায়
ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংমিশ্রিত স্থানগুলো ভ্রমণের ইচ্ছা হলে ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি কলমাকান্দায় আসা যায়। সেখান থেকে ১২ কিলোমিটারের পথ মোটরসাইকেল বা ইজিবাইকে যাওয়া যায়। অথবা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আন্তঃনগর ‘হাওর এক্সপ্রেস’ ও ‘মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনে নেত্রকোনা এসে সেখান থেকে বাস, সিএনজি বা মোটরসাইকেলে করে অনায়াসে যাওয়া যায়।
কেএএইচ/এসইউ
বিজ্ঞাপন