বিজ্ঞাপন
জমি, বিদ্যুৎ ও পানি-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের এই যুগে এ তিন সংকটেই ডাটা সেন্টার বানাতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে দক্ষিণ কোরিয়ার শিপ-বিল্ডিং জায়ান্ট স্যামসাং হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ এবার নজর দিয়েছে সমুদ্রের দিকে।
গ্রিসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত পোসিডোনিয়া ২০২৬ শিপিং সম্মেলনে স্যামসাং হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ, গ্রিক জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ক্লিন এনার্জি ক্যারিয়ারস এবং ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি লয়েড\'স রেজিস্টার একসঙ্গে একটি চুক্তিতে সই করেছে। লক্ষ্য একটাই, সমুদ্রে ভাসমান ডাটা সেন্টার তৈরি, যাকে বলা হচ্ছে ফ্লোটিং ডাটা সেন্টার (এফডিসি)। এই যৌথ পরিকল্পনায় স্যামসাং দেখবে প্রযুক্তি ও নির্মাণের কাজ, ক্যাপিটাল দেখবে অর্থায়ন ও প্রকল্প খোঁজার দিকটা, আর লয়েড\'স রেজিস্টার করবে নিরাপত্তা যাচাই ও সনদ প্রদানের কাজ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ভাসমান কেন্দ্রটির ক্ষমতা হবে ৫০ মেগাওয়াট, যাতে হাজার হাজার এআই সার্ভার বসানো সম্ভব হবে। জাহাজটি যখন কোনো বন্দর বা উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করবে, তখন পানির নিচের কেবলের মাধ্যমে স্থলভাগের বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ নেওয়া যাবে। আবার দূরে থাকলে জাহাজেই বসানো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস চালিত ফুয়েল সেল দিয়ে নিজের বিদ্যুৎ নিজেই তৈরি করে নিতে পারবে এই কেন্দ্র। সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য ব্যবহার হবে সরাসরি সমুদ্রের পানি, ফলে স্থলভাগের মিঠা পানির ওপর চাপ পড়বে না।
আরও পড়ুন
ডার্ক ওয়েবে ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি বিক্রি, বড় বিপদের আশঙ্কা!
ক্যাপিটাল ক্লিন এনার্জি ক্যারিয়ারসের প্রধান নির্বাহী জেরি কালোগিরাতোস বলছেন, ভাসমান ডাটা সেন্টারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নমনীয়তা। চাহিদা বা বিদ্যুৎ সরবরাহের ওঠানামা অনুযায়ী পুরো কেন্দ্রটিকেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। এতে জাহাজ মালিকদের জন্যও একটা নতুন ব্যবসার দুয়ার খুলছে। এতদিন জাহাজ ভাড়া দেওয়া হতো তেল, গ্যাস বা পণ্য পরিবহনের জন্য। এখন সেই একই মডেলে ভাসমান ডাটা সেন্টারও লিজ দেওয়া যাবে প্রযুক্তি ও ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।
তবে সমুদ্রে সংবেদনশীল কম্পিউটার যন্ত্রপাতি বসানো মোটেও সহজ কাজ নয়। জাহাজের দোলা, কম্পন, লবণাক্ত বাতাস আর আর্দ্রতা দীর্ঘমেয়াদে সার্ভারের ক্ষতি করতে পারে কি না, তা যাচাই করতে স্যামসাং হেভি ইন্ডাস্ট্রিস যৌথভাবে কাজ করছে মার্কিন সার্ভার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সুপারমাইক্রোর সঙ্গে। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে, প্রযুক্তিটি বাস্তবে কতটা টেকসই হবে।
শুধু স্যামসাং একা নয়, একই পথে হাঁটছে আরও কয়েকটি দেশ। জাপানের শিপিং কোম্পানি মিতসুই ও.এস.কে. লাইনস তুরস্কের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কারপাওয়ারশিপ-এর সহযোগী সংস্থা কিনেটিক্সের সঙ্গে মিলে তৈরি করছে ২০ থেকে ৭৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ভাসমান ডাটা সেন্টার, যা চালু হওয়ার কথা ২০২৭ সালে।
অন্যদিকে চীন সাংহাইয়ের উপকূলে সমুদ্রতলে বসিয়েছে পানির নিচের ডাটা সেন্টার, যার পূর্ণ ক্ষমতা দাঁড়াবে ২৪ মেগাওয়াটে। যুক্তরাষ্ট্রেও এই ধারণা নতুন নয়। নটিলাস ডেটা টেকনোলজিস বহু বছর ধরেই ক্যালিফোর্নিয়ার স্টোকটন বন্দরে একটি জাহাজ-ভিত্তিক ডাটা সেন্টার চালিয়ে আসছে।
আরও পড়ুন
ছবিতে প্রথমে হাতি নাকি গ্রাম দেখলেন?
বিষয়টা বাংলাদেশের জন্যও একেবারে অচেনা নয়। নদী আর উপকূলবেষ্টিত এই দেশেও জমির সংকট, বিদ্যুতের অপ্রতুলতা আর লোডশেডিং নিয়মিত সমস্যা। এআই ও ক্লাউড সেবার চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে ডাটা সেন্টারের জায়গা খোঁজা এখানেও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখনই এই প্রযুক্তি বাংলাদেশে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবে চট্টগ্রামের মতো উপকূলীয় ও শিপবিল্ডিং-সমৃদ্ধ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদে এমন ধারণা নিয়ে ভাবনাচিন্তার সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
স্যামসাং জানিয়েছে, ২০২৮ সালের মাঝামাঝি নাগাদ তারা এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে চায়। তবে খরচ কত পড়বে, কোন কোন বন্দরে প্রথমে বসানো হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। প্রযুক্তি হিসেবে ধারণাটা আকর্ষণীয় হলেও, সমুদ্রের কঠোর পরিবেশে এটি আসলেই কতটা টিকবে তা প্রমাণ হবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই।
কেএসকে
বিজ্ঞাপন