বিজ্ঞাপন
সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাত জাহান রাফির শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে তার মা শিরিনা আক্তার ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ যৌন হয়রানির মামলা করেন। সোনাগাজী থানার সেই মামলায় অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারপর থেকেই মামলা তুলে নিতে নানাভাবে চাপ আসতে থাকে নুসরাত এবং তার পরিবারের ওপর।
ওই বছরের ৬ এপ্রিল নুসরাত, মাদরাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে তাকে কৌশলে মাদরাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
এরপর ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত। পরবর্তীতে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী থানায় মামলা করলে পরে সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
নুসরাত জাহান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদরাসার ছাদেই আগুন দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে। পরে এ ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এর মধ্যে চার জনের যাজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয় আগুন
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো.রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানান, নুসরাত হত্যার ঘটনায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের একজন শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (২০)। তার জবানবন্দি থেকে উঠে আসে সেদিনের বিস্তারিত তথ্য। শাহাদাত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি)মাদরাসার ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী,শরীরে আগুন দেওয়ার দিনে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত মাদরাসায় গিয়েছিলেন আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষায় অংশ নিতে। পরীক্ষা শুরুর আগে বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে, এমন খবর শুনে ছাদে ছুটে গিয়েছিলেন নুসরাত। সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া পাঁচজন মিলে নুসরাতকে ধরে ছাদে চিত করে শুইয়ে ফেলেন। তার পরনের ওড়নাটি দুই ভাগ করে বেঁধে ফেলেন হাত-পা। এরপর এক লিটার কেরোসিন নুসরাতের গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢালা হয়। ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পায়ে। আগুন যখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই পাঁচজন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যান।
নেপথ্যে কারণ কী?
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতকে কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করলে সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মূলত এ ঘটনার জেরেই আগুন দেওয়া হয় নুসরাতের শরীরে।
মৃত্যুর আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতেও মাদ্রাসাটির তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করেন।
আরও পড়ুন
নুসরাত হত্যা মামলার রায়: অধ্যক্ষ সিরাজসহ ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল
আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়,নুসরাত খুনিদের লক্ষ্য হন ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনার পর থেকেই। এর পর থেকেই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল নুসরাতের পরিবারকে। এরপরও প্রতিবাদে অনড় ছিলেন নুসরাত। আগুন ধরিয়ে দেওয়ার আগমুহূর্তেও তাকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়, কিন্তু নুসরাত তা মানেননি। পরবর্তী সময়ে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায়ও তিনি প্রতিবাদ করে গেছেন।
নুসরাত হত্যার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত শাহাদাত হোসেন ও নুর উদ্দিন ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ১১ ঘণ্টা ধরে ৫৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে তারা ওই দিনের ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন।
এই দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে জড়িত তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন,গ্রেফতার হওয়ার পর অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে দেখা করতে যারা কারাগারে গিয়েছিলেন, তাদের সবার কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন সিরাজ। এরপর তিনি আলাদাভাবে ওই মাদরাসার ছাত্র এবং ‘সিরাজ উদদৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক নুর উদ্দিন (২০), যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (২০) এবং আরেক ছাত্রের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। তিনি তাদের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে বলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শাহাদাতের সঙ্গে একা কথা বলেন। তখন তিনি চাপে কাজ না হলে প্রয়োজনে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন। আর সে পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যা করা হয় নুসরাতকে।
নুসরাতের মৃত্যুর পর তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান ওরফে নোমান সোনাগাজী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই বছরের ২৮ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শেষে মাদরাসার অধ্যক্ষসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দেন। এরপর শুরু হয় মামলার বিচার।
মামলায় ৮৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। ৬১ কার্য দিবসে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (তৎকালীন) মামুনুর রশিদ। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
ওই রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদরাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল
রায়ে বলা হয়, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। রুহুল আমিন হত্যার পরিকল্পনা জানা, অংশ নেওয়া ও আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। মাকসুদ আলম হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন, অগ্নিসংযোগ ঘটানোর জন্য ১০ হাজার টাকা দেন, হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
নুসরাতকে হাত-পা বেঁধে ছাদে ফেলে মুখ ও মাথা চেপে ধরে কেরোসিন দিয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরাসরি অংশ নিয়েছেন শাহাদাত হোসেন। অগ্নিসংযোগের ঘটনা নির্বিঘ্ন করার জন্য মাদরাসার গেটের ভেতর পাহারায় ছিলেন আবছার উদ্দিন, আবদুল কাদের এবং মো. শামীম।
নুসরাতকে ছাদে ডেকে তার ওড়না খুলে হাত-পা বেঁধে ফ্লোরে ফেলে হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্ন করেন আসামি উম্মে সুলতানা। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরকা ও হাতমোজা সংগ্রহ ও নুসরাতকে মেঝেতে ফেলে বুক চেপে ধরেন কামরুন নাহার।
হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্ন করার জন্য মাদরাসার গেটের বাইরে পাহারায় ছিলেন ইফতেখার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, আবদুর রহিম এবং ইমরান হোসেন। মো. যোবায়ের ওড়না ছিঁড়ে নুসরাতের পা পেঁচিয়ে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন দেন। অগ্নিসংযোগের ঘটনা নির্বিঘ্ন করার জন্য মাদরাসার নিচে পাহারায় ছিলেন মহিউদ্দিন শাকিল। জাবেদ হোসেন নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগের আগে কেরোসিন ঢালেন। মো. শামীম মাদ্রাসার ভেতরে পাহারারত থাকেন।
এফএইচ/এএমএ
বিজ্ঞাপন