জাতীয়

মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ জরুরি

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত আলো ও অন্ধকারের চিরন্তন দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্তম্ভ হিসেবে টিকে রয়েছে একটি মহৎ নীতি—‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন।’ সভ্যতার আদিম লগ্ন থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব পর্যন্ত সর্বত্রই ভালো কাজের স্বীকৃতি ও পুরস্কার এবং মন্দ কাজের তিরস্কার ও শাস্তির বিধান ন্যায়বিচারের মূলভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। মানুষ যখন তার নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে ভালো কাজ করে, তখন সে লাভ করে সামাজিক শ্রদ্ধা ও শুভাশিস; আর যখন সে পাপ ও পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হয়, তখন সমাজ তার ওপর আরোপ করে কঠোর তিরস্কার ও শাস্তির খড়্গ। এটি কেবল কোনো কৃত্রিম মানব-রচিত সামাজিক চুক্তি নয়, বরং সার্বজনীন মানবীয় চেতনার এক গভীর শাশ্বত সত্য। আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ন্যায়বিচারের এই নীতিটি কেবল মানব-রচিত আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ঐশ্বরিক বিধানেরও এক অপরিহার্য অংশ। সমস্ত জগতের একমাত্র প্রতিপালক মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এই পরম সত্যটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। সূরা আল-জিলজালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে বিশ্বজাহানের অধিপতি এর চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেন—“ফামাই ইয়ামাল মিছক্বালা যাররাতিন খাইরাইয়ারাহু, ওয়া মাই ইয়ামাল মিছক্বালা যাররাতিন শাররাইয়ারাহু।” অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে তাও দেখতে পাবে।” মহান আল্লাহর এই মহান বাণী মানবজাতিকে প্রতিটি মুহূর্তে সতর্ক করে দেয় যে, কোনো পাপাচার বা অন্যায় যেমন চিরকাল অপ্রকাশিত কিংবা শাস্তিহীন থাকবে না, তেমনই সততা ও প্রতিরোধের ক্ষুদ্রতম প্রয়াসও বৃথা যাবে না। পবিত্র কুরআনের এই শাশ্বত নীতি ও মানব সভ্যতার মৌলিক আইনের আলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন আমরা বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তখন এক ভয়াবহ ও অন্ধকার চিত্র আমাদের হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। বাংলাদেশ আজ মাদকের রাহুগ্রাসে আচ্ছন্ন। মাদক আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ব্যাধি বা কয়েকজন অপরাধীর অপরাধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক মহাবিপর্যয়ে। একটি সমাজকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য কোনো পরাশক্তির আগ্রাসনের প্রয়োজন পড়ে না, যদি সে সমাজে বিষাক্ত মাদকের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে আজ মাদকের বিষাক্ত থাবা বিস্তৃত হয়েছে। ইয়াবা, আইস, হেরোইন, ফেনসিডিল এবং নানা রকমের রাসায়নিক মরণনেশা ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের তরুণ ও যুবসমাজকে। যে তরুণদের দেশের মূল চালিকাশক্তি হওয়ার কথা ছিল, যারা মেধা, শ্রম ও উদ্যম দিয়ে জাতিকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেবে, তাদের একাংশ আজ মাদকের বিষাক্ত জগতে হারিয়ে গিয়ে সমাজ ও পরিবারের জন্য চরম বোঝা ও অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। জোরারগঞ্জের বাইতুশ শরফ জামে মসজিদ থেকে যে সত্য ও ন্যায়ের বার্তা ধ্বনিত হয়েছে, তা কেবল একটি এলাকার প্রতিরোধ নয়; তা হলো অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে ফেরার শাশ্বত আহ্বান। আসুন, আমরা জোরারগঞ্জের এই বিরল ও সাহসী দৃষ্টান্তকে জাতীয় আন্দোলনের রূপ দিই। সমাজ থেকে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের সামাজিকভাবে বয়কট করি, অপরাধের মূল উপড়ে ফেলি এবং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। মাদকের অপরাধমূলক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত জটিল ও ধ্বংসাত্মক। এটি এমন এক অপরাধ, যা কখনো কোনো একক ব্যক্তির জীবন বা সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তি কেবল নিজেকেই তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় না, বরং পুরো পরিবারকে ঠেলে দেয় এক অন্তহীন নরকযন্ত্রণায়। একজন মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে একটি সচ্ছল ও শান্তিময় পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়, মা-বাবার চোখে নেমে আসে অনন্ত অশ্রুধারা। সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এই মরণনেশা। ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, পারিবারিক সহিংসতা থেকে শুরু করে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো অনেক ভয়াল অপরাধের কেন্দ্রে হাত বাড়ালেই দেখা যায় মাদকের কুৎসিত উপস্থিতি। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সন্তান জন্মদাতা পিতাকে খুন করছে, ভাই হত্যা করছে ভাইকে, স্ত্রী বলির পাঁঠা হচ্ছে স্বামীর হাতে। ফলে মাদক কেবল নিজেই একটি অপরাধ নয়, বরং এটি বহু অপরাধ ও পাপাচারের অন্যতম প্রজননকেন্দ্র। এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণের পথ কী? দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে আমরা দেখে আসছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাময়িক অভিযান, কিছু গ্রেপ্তার বা চুনোপুঁটিদের আটক করার প্রক্রিয়া। কিন্তু পরম সত্য হলো, কেবল পুলিশি অভিযান, আইনি জটিলতা কিংবা লোকদেখানো সাময়িক গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মাদকের মূল উপড়ে ফেলা অসম্ভব। অপরাধীরা প্রায়শই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে অথবা নতুন কৌশলে পুনরায় এই বিষাক্ত বাণিজ্যে লিপ্ত হয়। কারণ, মাদকের যে সুবিশাল নেটওয়ার্ক ও চাহিদা তৈরি হয়েছে, তাকে চূর্ণ করতে হলে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শক্ত সামাজিক প্রতিরোধ। আইনি শাস্তির চেয়েও যখন সামাজিক প্রতিরোধ ও বয়কট জোরদার হয়, তখন অপরাধীর পালিয়ে থাকার বা পার পাওয়ার কোনো স্থান থাকে না। ঠিক এই জায়গাটিতেই প্রথাগত প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিপরীতে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের মধ্যম সোনাপাহাড় দরবার টিলা এলাকার সচেতন বাসিন্দারা। জোরারগঞ্জের এই সাহসী মানুষগুলো যে যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছেন, তা কেবল প্রশংসনীয়ই নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য সামাজিক প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও আলোকবর্তিকা। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) জুমার নামাজ শেষে মধ্যম সোনাপাহাড় দরবার টিলা এলাকার বাইতুশ শরফ জামে মসজিদে এক বিশেষ ও ঐতিহাসিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় মসজিদ কমিটি, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এবং এলাকার সর্বস্তরের সচেতন মানুষের যৌথ উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, হাত গুটিয়ে বসে থেকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে পুরো এলাকা মাদকের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই তারা এক অনন্য ও সর্বসম্মত সামাজিক সিদ্ধান্তের রূপরেখা ঘোষণা করেন। সভায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়—কেবল আইনি পদক্ষেপে মাদক নির্মূল করা অসম্ভব; সমাজকে রক্ষায় পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে এক অভেদ্য সামাজিক দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে মাদক-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমাজপতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে হবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সচেতন সমাজপতিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জোরারগঞ্জে মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যে পাঁচটি কঠোর সামাজিক বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে সমাজঘোষিত এই পাঁচটি সামাজিক সিদ্ধান্ত হলো: প্রথমত, মাদকের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তাকে সামাজিকভাবে দাফন করা হবে না; দ্বিতীয়ত, তাদের দাফনের কাজে মসজিদের কোনো খাটিয়া বা সামাজিক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না; তৃতীয়ত, এলাকার সম্মানিত ইমাম বা কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাদের বাড়িতে কোনো খাবার গ্রহণ করবেন না বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাবেন না; চতুর্থত, মাদক ব্যবসায়ীদের পরিবারের যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান এলাকাবাসী সম্পূর্ণভাবে বয়কট করবে; এবং পঞ্চমত, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তাকে সমাজ থেকে চিরতরে বহিষ্কার ও অলিখিতভাবে বয়কট করা হবে। এই সিদ্ধান্তগুলোর গভীরতা ও তাৎপর্য অপরিসীম। সমাজপতিদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে—এই কঠোর সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারকে ব্যক্তিগতভাবে অপদস্থ করা নয়। বরং এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মাদকের বিরুদ্ধে পুরো সমাজকে একতাবদ্ধ করা, পাপাচারের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা প্রদর্শন করা এবং যুবসমাজকে নীতি ও আদর্শের পথে ফিরিয়ে আনা। অপরাধী যখন জানে যে, সে অপরাধ করলে কেবল জেলেই যাবে না, বরং তার অপরাধের কারণে সে ও তার পরিবার সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান হারাবে, তখন সেই মনস্তাত্ত্বিক চাপ অপরাধের বিস্তার রোধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করতে পারে। জোরারগঞ্জের এই গণপ্রতিরোধের চেতনা মানব সভ্যতার শাশ্বত দর্শন ও ধর্মীয় মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা পবিত্র কুরআনে অন্যায় ও পাপাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। সূরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন— “ওয়া তাআওয়ানু আলাল বির্রি ওয়াত-তাকওয়া, ওয়ালা তাআওয়ানু আলাল-ইছমি ওয়াল-উদওয়ান।”অর্থাৎ, “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার বিষয়ে একে অপরকে সাহায্য কর, আর পাপ ও শত্রুতামূলক কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” জোরারগঞ্জের মানুষ মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারীদের বয়কট করে প্রকৃতপক্ষে কুরআনের এই আয়াতেরই বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। পাপাচারের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগিতা ঘোষণা করাই হলো সৎকাজে পরস্পরকে সাহায্য করার অন্যতম উপায়। অনুরূপভাবে, মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বয়কট করার এই নীতি কুরআনে বর্ণিত অন্যায় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অন্যায়কারী ও পাপাচারীদের সঙ্গে সাময়িক বা স্থায়ী সম্পর্কের ব্যবধান তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা নিজেদের শুধরে নেওয়ার সুযোগ পায় এবং সমাজ পাপাচারমুক্ত থাকে। সূরা আল-আনআমের ৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ নির্দেশ দেন— “ওয়া ইযা রাইতাল্লাযীনা ইয়াখূযূনা ফী আয়াতিনা ফাআরিদ আনহুম হাত্তা ইয়াখূযূ ফী হাদীছিন গাইরিহি।” অর্থাৎ, “যখন তুমি তাদের দেখো যারা আমার আয়াতসমূহ নিয়ে উপহাস বা অন্যায়ে লিপ্ত হয়, তখন তুমি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, যতক্ষণ না তারা অন্য কোনো বিষয়ে লিপ্ত হয়।” জোরারগঞ্জের বাইতুশ শরফ জামে মসজিদ থেকে ঘোষিত বয়কট নীতি মূলত অন্যায় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এবং অপরাধীকে একঘরে করে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল। আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, মাদক ইসলামে কেবল একটি গর্হিত অপরাধই নয়, বরং এটি সমস্ত মন্দের চাবিকাঠি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মাদককে ‘উম্মুল খাবায়েস’ বা সকল পাপের জননী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াতে মাদকের ব্যাপারে চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করে আল্লাহ তাআলা বলেন— “ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানূ, ইন্নামাল-খামরু ওয়াল-মাইসিরু ওয়াল-আনসাবু ওয়াল-আযলামু রিজসুম মিন আমালিশ-শাইতানি ফাজতানিবূহু লাআল্লাকুম তুফলিহূন।”অর্থাৎ, “হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব, তোমরা তা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” জোরারগঞ্জের ধর্মপ্রাণ বাসিন্দারা কুরআনের এই “দূরে থাকো” বা বর্জনের নির্দেশকেই অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে সামাজিক বয়কটের কাঠামোয় রূপ দিয়েছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, জোরারগঞ্জের মতো একটি ইউনিয়নে যদি সর্বস্তরের মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে সারা বাংলাদেশে কেন জাতীয়ভাবে এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হচ্ছে না? আজ সময় এসেছে পুরো বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে মাদকের বিরুদ্ধে এই ধরনের সামাজিক বয়কটের ডাক দেওয়ার। কারণ, মাদক আজ আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আমাদের সমগ্র জাতিকে গ্রাস করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ মাদকের ব্যবসা চলছে, যার পেছনে ধ্বংস হচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্ম। মাদকের এই অবাধ বিস্তার এবং প্রতিরোধের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুটি—রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং একশ্রেণির অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে অপরাধীদের কুৎসিত যোগসাজশ। এটি একটি নির্মম বাস্তবতা যে, স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ওপরের স্তর পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রায়শই মাদক কারবারীদের ছত্রছায়া দিয়ে থাকেন। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই অপরাধীরা সমাজে অবাধে ঘুরে বেড়ায়। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা মাসোয়ারা ও অবৈধ অর্থের লোভে এদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না, বরং অনেক সময় তথ্য দিয়ে ও নিরাপত্তা জুগিয়ে মাদক কারবারীদের সহায়তা করেন। এই অশুভ ও বিষাক্ত সিন্ডিকেটের কারণেই রাষ্ট্রীয় অভিযানগুলো প্রায়ই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সুতরাং, এই অশুভ যোগসাজশ ভেঙে ফেলতে হলে জোরারগঞ্জের মতো জনমুখী ও কঠোর সামাজিক প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর হাতিয়ার। যখন পুরো সমাজ একতাবদ্ধ হয়ে কোনো অপরাধীকে বয়কট করবে, যখন মসজিদ, মন্দির, সামাজিক অনুষ্ঠান ও দৈনন্দিন জীবনে অপরাধীকে ঠাঁই দেওয়া বন্ধ হবে, তখন কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ দিয়েও অপরাধী সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের সোনাপাহাড়ের মানুষ আজ সমগ্র দেশের সামনে যে বীরত্ব ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তা যেন প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি ওয়ার্ড এবং দেশের প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। মাদকের বিরুদ্ধে কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে, দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে আজ একত্রিত হতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় গড়ে তুলতে হবে জোরারগঞ্জের মতো সামাজিক দুর্গ। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে—কোনো মাদক কারবারি বা তার আশ্রয়দাতা তাদের দলে স্থান পাবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজেদের ভেতর লুকিয়ে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। জোরারগঞ্জের বাইতুশ শরফ জামে মসজিদ থেকে যে সত্য ও ন্যায়ের বার্তা ধ্বনিত হয়েছে, তা কেবল একটি এলাকার প্রতিরোধ নয়; তা হলো অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে ফেরার শাশ্বত আহ্বান। আসুন, আমরা জোরারগঞ্জের এই বিরল ও সাহসী দৃষ্টান্তকে জাতীয় আন্দোলনের রূপ দিই। সমাজ থেকে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের সামাজিকভাবে বয়কট করি, অপরাধের মূল উপড়ে ফেলি এবং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলি। কারণ, সমাজ বাঁচলে জাতি বাঁচবে; আর সমাজকে বাঁচাতে হলে জোরারগঞ্জের এই সামাজিক প্রতিরোধের মডেলই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ahabibhme@gmail.com এইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>