বিজ্ঞাপন
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার আগে আট পিস ইয়াবা সেবন করেছিলেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস। হত্যাকাণ্ডের পর রুমে বসে আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন তারা। এর আগে একসঙ্গে দুই পিস সেবন করলেও সেই রাতে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে ৯ পিস ইয়াবা সেবন করেন তারা।
পুলিশের হাতে আটকের পর তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এভাবেই ইয়াবা সেবনের বর্ণনা দেন সিদ্ধার্থ দাস।
তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে সিদ্ধার্থ দাস বলেন, ইয়াবা সেবন করতে করতে কখন ভোরের আলো ফুটেছে তা খেয়াল করেননি। এসময় ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তী। তাদেরকে ওখানে দেখার পর তিনি ধমক দেন এবং এখানে কী করছেন জানতে চান।
সিদ্ধার্থ দাসের ভাষ্য, তখন তাদের মাথা কাজ করছিল না। বিষয়টি জানাজানি হবে এবং মানসম্মানের ভয়ে গণপতি চক্রবর্তীর ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে গলা পেঁচিয়ে তাকে সেখানেই হত্যা করেন তারা। পরে মরদেহ ছাদের এক কোনায় টিন দিয়ে ঢেকে রাখেন যেন বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২০ আগ্রস্ট) রাতে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে গিয়ে তিন পিস ইয়াবা সেবন করেন তারা। তবে সীমান্ত এসব সেবন করতেন না। এরপর মধ্যরাতে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছে জাগলে শান্ত নামের এক মাদক কারবারিকে ফোন করে আরও কয়েক পিস ইয়াবা কেনেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
পরে প্রতিবেশী দেবুদের তিনতলা বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে নির্মাণাধীন দোতলার ছাদ দিয়ে পাশের গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান তারা। দেবুর বাড়ি ঢোকার সময় গেটে কুকুর থাকায় দেওয়াল টপকে পার হন। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন।
এর আগে সিদ্ধার্থ দাস গণপতি চক্রবর্তীর ওই ছাদে এক দুদিন ইয়াবা সেবন করলেও মুগ্ধ সেদিন প্রথমবারের মতো সেখানে যান বলে পুলিশকে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন
সপরিবারে শিক্ষক হত্যা / ঘটনার রাতে নিজ বাড়িতে ছিলেন না সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, টিনের শব্দ পেয়ে বা যেকোনোভাবে ছাদে উঠে আসেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী। এসময় মুগ্ধ সেই গামছা দিয়ে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলা পেঁচিয়ে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন। প্রীতিলতাকে মারার পর দুজনে মিলে পাশে থাকা রশি ও গামছা পেঁচিয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
পাশের ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়, সেজন্য সেখান থেকে মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে এনে রেখে দেন তারা। এরপর নিচে নেমে আসেন। এসময় ঘুম থেকে জেগে উঠে বিছানায় বসে থাকতে দেখেন আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে। তখন প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
বাড়িতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে সন্দেহে নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ। এসব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে দুজনে সেখানে গোসল করেন। সেখানে বসে আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন। খেজুর ও শসাও খান তারা।
আরও পড়ুন
যেভাবে হত্যা করা হয় শিক্ষক পরিবারের চারজনকে
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তারা ডাকাতির ঘটনা সাজান। ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। পরে বাড়িতে থাকা কিছু সোনা এবং ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যান দুজন। ১৫ হাজার টাকা নেন মুগ্ধ। সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে ওই সোনা মাটিতে পুঁতে রাখেন সিদ্ধার্থ, যা পূর্ণিমা জানতেন না। পেশায় স্বর্ণ কারিগর সিদ্ধার্থ দাস ওই বাসায় গহনা বের করে আগুন ধরিয়ে তা পরীক্ষাও করে দেখেন।
এসবের আলামত হিসেবে খেজুরের বিচি, আগুনে পোড়ানো চুরি, ইয়াবা সেবনের উপকরণ জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
এ ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে দুজনকে আটক করে পুলিশ। পরে বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস।
আরও পড়ুন
সপরিবারে শিক্ষক হত্যা / বাসায় সিসি ক্যামেরা রয়েছে সন্দেহে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেন সিদ্ধার্থ
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। ঘটনার পর তিনি একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসাও নেন।
স্থানীয়দের দেওয়া এমন তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়। পরে একটু অদূরে মুগ্ধর বাড়িতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান মুগ্ধ। এসময় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধাওয়া করে তুতফার্ম এলাকা থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করেন।
আলোচিত এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ঘটনার তদন্ত কোনো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী করছেন না; তদন্ত করছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরেনসিক রিপোর্ট আসতে দেরি হবে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে এলেই আমরা এ বিষয়ে চূড়ান্ত একটি রূপরেখা দাঁড় করাতে পারবো বলে আশা করছি।’
জিতু কবীর/এসআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন