জাতীয়

চোখের পলকেরও কম সময়ে হবে চার্জ! ব্যাটারি শিল্পে অবিশ্বাস্য অগ্রগতি

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
প্রচলিত ধারণা হলো, ব্যাটারি যত বড় হবে, সেটি চার্জ হতে তত বেশি সময় লাগবে। ল্যাপটপ চার্জে কয়েক ঘণ্টা লাগে, আর বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ হতে অনেক সময় রাতভর অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার জগতে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ভিন্ন। সেখানে ব্যাটারি যত বড় হবে, সেটি তত দ্রুত চার্জ হতে পারে। এই আপাতবিরোধী ধারণাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে বড় অগ্রগতির দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। ২০২৬ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার গবেষকদের একটি দল বিশ্বের প্রথম কার্যকর কোয়ান্টাম ব্যাটারির প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে। প্রচলিত ব্যাটারির বিপরীতে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো- এর আকার বা উপাদানের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চার্জ নেওয়ার গতিও বাড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিএসআইআরও- এর বিশেষায়িত কোয়ান্টাম ব্যাটারি নির্মাণ গবেষণাগার/ ছবি: সিএসআইআরও অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা সিএসআইআরওর কোয়ান্টাম বিজ্ঞান গবেষক জেমস কোয়াচ এ প্রকল্পে কাজ করছেন। তার ভাষায়, পারমাণবিক ও উপ-পারমাণবিক (পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র কণা) জগতের বিজ্ঞান ‘কোয়ান্টাম মেকানিকস’ প্রচলিত ধারণাকে অনেকটাই উল্টে দেয়। ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার যেমন কম্পিউটিং ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তেমনি কোয়ান্টাম ব্যাটারিও শক্তি ব্যবহারের ধারণায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তবে প্রযুক্তিটি এখনো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি স্বভাবগতভাবেই জটিল ও সংবেদনশীল। কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন, ভবিষ্যতে এসব ব্যাটারি কোয়ান্টাম যন্ত্র চালাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। সবচেয়ে আশাবাদীরা বলছেন, একদিন হয়তো মোবাইল ফোনের মতো দৈনন্দিন যন্ত্রও চার্জ করা সম্ভব হবে। যদিও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখনো যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। প্রচলিত ব্যাটারি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে। একটি যন্ত্র চালাতে এর ভেতর দিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন বা তারও বেশি ইলেকট্রন প্রবাহিত হতে পারে। ইতালির জেনোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক দারিও ফেরারোর মতে, প্রযুক্তিগত উন্নতি হলেও আধুনিক ব্যাটারি এখনো দুই শতাব্দীরও বেশি আগে অনুসন্ধান করা ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই গবেষকদের একাংশ রাসায়নিক বিক্রিয়ার পরিবর্তে কোয়ান্টাম প্রভাব ব্যবহার করে শক্তি সঞ্চয়ের নতুন পদ্ধতি খুঁজছেন। তবে কোয়ান্টাম ব্যাটারির মূল উদ্দেশ্য বিপুল পরিমাণ শক্তি জমা রাখা নয়। বরং শক্তি আরও দ্রুত এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করাই এর প্রধান লক্ষ্য। কোয়ান্টাম ব্যাটারির ধারণার পেছনে রয়েছে কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত কিছু বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে রয়েছে কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট বা এমন কণার পারস্পরিক সম্পর্ক, যেখানে দূরত্বে অবস্থান করলেও একটি কণার অবস্থা অন্যটির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। সময়ের স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়েও কোয়ান্টাম তত্ত্বে নানা জটিল ধারণা রয়েছে। ২০১৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্রে দেখানো হয়, কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টের কারণে কোয়ান্টাম ব্যাটারি প্রচলিত ব্যাটারির তুলনায় আরও দক্ষভাবে চার্জ ও ডিসচার্জ হতে পারে। জেমস কোয়াচের দল যে পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে, সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে অপটিক্যাল মাইক্রোক্যাভিটি। এ ব্যবস্থায় দুটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়না মাত্র ১০০ ন্যানোমিটার দূরত্বে স্থাপন করা হয়। এই দূরত্ব মানুষের চুলের প্রস্থের প্রায় এক হাজার গুণ কম। আয়নার মাঝের ক্ষুদ্র জায়গাটি জৈব রঞ্জক অণু দিয়ে পূর্ণ করা হয়। এরপর সেখানে লেজার রশ্মি প্রবেশ করানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় আলো ও অণুগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয় এবং গঠিত হয় আলো ও পদার্থের সংকর অবস্থা। এর ফলে সিস্টেমের শক্তি শোষণ ও সংরক্ষণের ক্ষমতা বেড়ে যায়। এ ঘটনাকে বলা হচ্ছে ‘সুপারঅ্যাবসর্পশন’। আর এই সুপারঅ্যাবসর্পশনই কোয়ান্টাম ব্যাটারির সবচেয়ে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানে প্রতিটি অণু আলাদাভাবে কাজ করে এবং আশপাশে কত অণু রয়েছে, তার ওপর শক্তি শোষণের হার নির্ভর করে না। কিন্তু কোয়ান্টাম প্রভাবে অণুগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। জেমস কোয়াচের ভাষায়, তারা যেন একসঙ্গে কাজ করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শক্তি শোষণ করে। ফলে যত বেশি অণু থাকবে, শক্তি শোষণের গতিও তত বাড়বে। অর্থাৎ, ব্যাটারি যত বড় হবে, সেটি তত দ্রুত চার্জ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। কোয়াচের প্রোটোটাইপ ফেমটোসেকেন্ডে চার্জ হতে পেরেছে। এক ফেমটোসেকেন্ড হলো সেকেন্ডের এক কোয়াড্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ। এরপর ব্যাটারিটি শক্তি ধরে রাখতে পেরেছে ন্যানোসেকেন্ড পর্যন্ত, যা চার্জ হতে লাগা সময়ের তুলনায় প্রায় ছয় অর্ডার অব ম্যাগনিটিউড বেশি। ২০২২ সালেই কোয়াচ ও তার দল প্রথম এ ধরনের চার্জিং সক্ষমতা প্রদর্শন করেছিলেন। ২০২৬ সালের মার্চে তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রোটোটাইপ থেকে বৈদ্যুতিক প্রবাহ বের করতে সক্ষম হয়েছেন। ভবিষ্যতে প্রবাহের তীব্রতা বাড়ানো গেলে এটি বিভিন্ন যন্ত্র চার্জে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। অপটিক্যাল মাইক্রোক্যাভিটিই অবশ্য কোয়ান্টাম ব্যাটারি তৈরির একমাত্র পদ্ধতি নয়। আরেকটি পদ্ধতিতে সুপারকন্ডাক্টিভ উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা ইতোমধ্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোয়াচের নকশার বড় সুবিধা হলো, এটি কক্ষ তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে। অন্যদিকে, সুপারকন্ডাক্টিভ নকশাগুলো সাধারণত মাইনাস ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও কম ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রায় কাজ করে। কোয়াচের মতে, এটি কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জন্য উপযোগী হলেও মোবাইল ফোন চালানোর ক্ষেত্রে খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের কোয়ান্টাম পদার্থবিদ মাউরো প্যাটারনোস্ত্রোর মতে, কোয়ান্টাম চার্জিংয়ের সুবিধা বাস্তব পদার্থবিজ্ঞানের ঘটনা হিসেবে প্রমাণ করতে হলে অপটিক্যাল মাইক্রোক্যাভিটি পদ্ধতিই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী পথ। তবে দীর্ঘমেয়াদে তিনি সুপারকন্ডাক্টিভ নকশাকে বাস্তব ব্যবহারের ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখছেন। তার মতে, মাইক্রোক্যাভিটি ব্যবস্থায় কোয়ান্টাম প্রভাব দেখানো সম্ভব হলেও সেখান থেকে ব্যবহারযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে শক্তি বের করা কঠিন। বর্তমান প্রোটোটাইপের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি খুব সামান্য শক্তি সংরক্ষণ করতে পারে। কয়েক বিলিয়ন বা শত কোটি ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি মাত্র কয়েক ন্যানোসেকেন্ড ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত কোনো যন্ত্র চালাতে হলে ব্যাটারিকে এর চেয়ে অনেক বেশি শক্তি এবং অনেক দীর্ঘ সময় ধরে তা সংরক্ষণ করতে হবে। কোয়াচ অবশ্য দাবি করেছেন, নতুন একটি নকশায় তিনি এরই মধ্যে এ সমস্যার সমাধানের পথে অগ্রগতি করেছেন। নতুন ব্যবস্থাটিতে ‘হাইব্রিড স্ট্রাকচার’ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দ্রুত চার্জ নেওয়ার জন্য থাকবে কোয়ান্টাম উপাদান এবং দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখার জন্য যুক্ত করা হবে প্রচলিত বা ক্লাসিক্যাল স্তর। তিনি আরও পরিকল্পনা করছেন, অসংখ্য ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম ব্যাটারিকে একসঙ্গে যুক্ত করে মোট শক্তি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর। তার মতে, এই দুটি লক্ষ্য অর্জন করা গেলে প্রচলিত কোনো যন্ত্র চালানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হবে। তবে সংশয়ও কম নয়। কোয়ান্টাম প্রভাব অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পর্যবেক্ষণ বা বাইরের পরিবেশের সামান্য হস্তক্ষেপেও তা নষ্ট হতে পারে। দারিও ফেরারোর মতে, পরিবেশের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়ার কারণে কোয়ান্টাম প্রভাব দ্রুত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে কোয়ান্টাম ব্যাটারির কার্যকারিতা ও বড় পরিসরে ব্যবহারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে যেতে পারে। কোয়ান্টাম ব্যাটারিকে বহির্জগত থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা/ ছবি: সিএসআইআরও এই সমস্যার সমাধানই কোয়ান্টাম ব্যাটারিকে গবেষণাগার থেকে বাস্তব ব্যবহারের পর্যায়ে নেওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কোয়ান্টাম ব্যাটারির সম্ভাব্য প্রভাব প্রথমে পড়তে পারে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে। ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের তুলনায় অনেক দ্রুত কিছু কাজ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব প্রযুক্তি বিশ্বের প্রচলিত এনক্রিপশন ব্যবস্থার জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে প্রযুক্তিবিদদের সতর্কতা রয়েছে। তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়েও সংশয় রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে ফিউশন এনার্জি ও ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের পাশাপাশি কোয়ান্টাম কম্পিউটারকেও এমন প্রযুক্তির তালিকায় রাখা হয়েছে, যেগুলোকে বছরের পর বছর ধরে ‘আর মাত্র পাঁচ বছর দূরে’ বলা হচ্ছে। তারপরও কোয়াচ আশাবাদী। তার ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই তার গবেষণাগারে কোয়ান্টাম ব্যাটারি দিয়ে কোয়ান্টাম যন্ত্র চালানো সম্ভব হতে পারে। এটি সফল হলে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের শক্তি খরচ কমানো, গতি বাড়ানো এবং ত্রুটি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে এসব কম্পিউটারকে আরও বড় পরিসরে তৈরি করা সহজ হতে পারে বলে তার দাবি। প্রচলিত মোবাইল ফোন বা বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে অবশ্য তিনি তুলনামূলকভাবে কম নিশ্চিত। তবে ভবিষ্যতে তা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। যেহেতু এই ব্যাটারি লেজারের মাধ্যমে চার্জ করা হয়, তাই তাত্ত্বিকভাবে চলন্ত অবস্থাতেও বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়া সম্ভব হতে পারে। সেক্ষেত্রে চালকদের চার্জ দেওয়ার জন্য আলাদা করে থামতে নাও হতে পারে। তবে দারিও ফেরারোর মত ভিন্ন। তার মতে, মোবাইল ফোন বা বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো দৈনন্দিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম ব্যাটারি প্রচলিত ব্যাটারির বিকল্প হয়ে উঠবে- এ সম্ভাবনা কম। তার ভাষায়, এ প্রযুক্তির স্বাভাবিক ক্ষেত্র মূলত কোয়ান্টাম জগত। মাউরো প্যাটারনোস্ত্রোর মতে, এখন সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন হলো- কোয়ান্টাম চার্জিংয়ের সুবিধা বজায় রেখেই কীভাবে সেই শক্তি নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় বের করা যাবে। তার মতে, যে গবেষক বা দল এ সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারবে, তারাই কোয়ান্টাম ব্যাটারির ক্ষেত্রে প্রকৃত বড় সাফল্য অর্জন করবে। সূত্র: বিবিসি এসএএইচ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>