বিজ্ঞাপন
দশম হিজরিতে মহানবী (সা.) হজ পালন করেন যা ছিল তার জীবনের শেষ ও একমাত্র হজ। এই হজই ইতিহাসে বিদায় হজ বলে পরিচিত। ওই বছর মহানবীর (সা.) সঙ্গে তার প্রায় দেড় লক্ষ সাহাবি হজ পালন করেন। হজের দিন সাহাবিরা যখন আরাফার প্রান্তরে সমবেত হন, তখন মহানবী (সা.) তাদের উদ্দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। মহানবী (সা.) জানতেন তিনি তার সব সাহাবিকে আর একসঙ্গে পাবেন না। তাই তিনি তার বিদায়ী বার্তা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেন এবং সবার কাছ থেকে বিদায়ও নেন।
মহানবীর (সা.) ওই ঐতিহাসিক ভাষণের ৬টি বার্তার ওপর এখানে আমরা সংক্ষেপে আলোকপাত করবো।
১. নবীজি (সা.) সম্বোধন করেছিলেন পুরো মানবজাতিকে
বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) কথা শুরু করেন মানবজাতির প্রতি সম্বোধন করে:
‘হে মানুষ!’
এটি ছিল একটি সর্বজনীন বার্তা মুসলমানদের প্রতি নয় কেবল; বরং সমগ্র মানবজাতির প্রতি।
২. সব মানুষ সমান, মানুষ উত্তম হয় তার উত্তম কাজের মাধ্যমে
মহানবী (সা.) বলেন:
‘হে মানুষ, তোমাদের প্রভু একজন। তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। কোনো আরবের ওপর অনারবের কিংবা অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; বরং তাকওয়ার ভিত্তিতেই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত।’
এই ঘোষণায় তিনি ভেঙে দেন জাতি, বর্ণ, ভাষা ও শ্রেণীর বিভেদ। জানিয়ে দেন, বংশমর্যাদা, ভাষা, বা শরীরের গৌর বর্ণের কারণে কেউ উত্তম বা শ্রেষ্ঠ হয় না। জন্মগতভাবে সব মানুষ সমান, মানুষ উত্তম হতে পারে শুধু তার তাকওয়া বা উত্তম কাজের মাধ্যমে।
৩. নারীর অধিকার রক্ষায় যত্নবান হতে হবে
নারীদের অধিকারের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে মহানবী (সা.) পুরুষদের উদ্দেশে বলেন:
‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তারা তোমাদের জীবনের অংশীদার এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত।’
এই ঘোষণা ছিল নারীসমাজের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে জীবন গঠনের এক অপরিহার্য নির্দেশ।
৪. সুদসহ সব রকম অর্থনৈতিক অনাচার, শোষণ বন্ধ করতে হবে
সুদি ঋণ আদান-প্রদান চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মহানবী (সা.) বলেন:
‘আজ থেকে জাহিলিয়াত যুগের সকল সুদ আমি বাতিল করলাম। প্রথম যে সুদ আমি বাতিল করলাম, তা হচ্ছে আমার চাচা আব্বাসের সুদ।’
৫. বাবার অন্যায়ের দায় ছেলে বহন করে না
জাহেলি যুগের মতো বংশ পরম্পরায় প্রতিশোধ নেওয়ার সংস্কৃতি বাতিল ঘোষণা করে নবীজি (সা.) বলেন:
‘আজ আমি জাহেলি যুগের সকল রক্তের প্রতিশোধ বাতিল করে দিলাম। প্রথম যে রক্ত আমি মাফ করলাম, তা হলো রাবি ইবনে হারিসের পুত্রের রক্ত।’
অর্থাৎ এক ব্যক্তির অন্যায় বা অপরাধের কারণে তার ছেলে বা বংশধরদের হত্যা করে প্রতিশোধ নেওয়া ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। যথাযথ পন্থায় শাস্তি হতে পারে শুধু অপরাধীর, বাবার অপরাধে ছেলের বা ছেলের অপরাধে বাবার শাস্তি হতে পারে না।
৬. জুলুম ও আমানতের খেয়ানত থেকে বিরত থাকতে হবে
জুলুম ও আমানতের খেয়ানত থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে মহানবী (সা.) বলেন:
‘তোমরা আমানত রক্ষা করবে। কারো ওপর জুলুম করবে না। অন্যায়ের পথে চলবে না।’
তার কণ্ঠে সেদিন বারবার ধ্বনিত হয়, ‘হে মানুষ!’ তিনি যেন কেবল মুসলমানদের নয়; সমগ্র মানবজাতিকে পথ দেখাচ্ছিলেন।
এই হজের সময়ই ধর্মের পূর্ণতা ঘোষণা করে কোরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত অবতীর্ণ হয়:
‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’ (সুরা মায়েদা: ৩)
এই আয়াত ছিল ইসলামের পূর্ণতা এবং নবুয়তের সমাপ্তির ঐশী ঘোষণা।
বিদায় হজের ভাষণের শেষদিকে নবীজি (সা.) সাহাবাদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি?
সাহাবারা সম্মিলিতভাবে বলেন, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।
তখন তিনি আকাশের দিকে তর্জনী তুলে তিনবার বলেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন।
বিদায় হজ থেকে মদিনায় ফিরে যাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেন।
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন