বিজ্ঞাপন
জিসান তাসফিক
সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরে এক পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে যে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত দুইজন ব্যক্তি মাদকাসক্ত এবং মাদক সেবনের কারণে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে সমাজে অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ হল মাদক।
মাদক আসলে কী? সাধারণত মাদক বলতে এমন কোনো বস্তু বা দ্রব্য বা তরল বা গ্যাস জাতীয় পদার্থকে বোঝায় যা মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী গ্রহণ করলে তার ব্রেন বা নার্ভ সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং এর প্রতি তার আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে অ্যালকোহল। এটি মানব শরীরের প্রবেশ করলে সাময়িক সময় বা দীর্ঘ স্থায়ীভাবে মানুষের শরীর বা ব্রেনের কার্যক্রম নষ্ট করে দেয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ধারা ২( ২৯) অনুযায়ী উক্ত আইনের তফসিলে বর্ণিত ও সংশ্লিষ্ট দ্রব্য সংক্রান্ত যে কোনো পদার্থ মাদক বলে গণ্য হবে। উক্ত আইনের ২(৩১) ধারা অনুযায়ী যে ব্যক্তি মাদক ব্যবহারকারী বা সেবনকারী বা গ্রহণকারী সেই মাদকাসক্ত। মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকলে মাদক আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে।
আরও পড়ুন
মাদকাসক্তি: জাতির জন্য অশনি সংকেত
বর্তমানে সমাজে নারী ও পুরুষ, তরুণ থেকে বৃদ্ধ সহ অনেকে মাদকাসক্ত। প্রতিদিন কত জনে কতটুকু মাদক গ্রহণ করে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব নয় কারণ এটি গোপনে হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে হতে জানা যায় যে ৮০ লাখের অধিক মানুষ মাদকে আসক্ত। মাদক গ্রহণের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হলো এটি মানুষের ব্রেনে কার্যকারিতা সাময়িক ও স্থায়ী উভয় ভাবে নষ্ট করতে সক্ষম।
মানুষের ব্রেনের স্বাভাবিক ক্ষমতা যেখানে নষ্ট করতে সক্ষম সেখানে সে নিজে বা তাকে দিয়ে যে কোনো অপরাধ করানো সম্ভব হয়। এর বহু উদাহরণ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের মত ঘটনায় দেখা গেছে। নিজের সন্তান তার মা-বাবাকে পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে মাদকের প্রভাবে। যার বড় উদাহরণ ঐশী। ২০১৩ সালের আগস্টে ঢাকার চামেলীবাগে পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন তাদেরই মেয়ে ঐশী রহমান। ঐশী সেসময় বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত ছিলেন।
রাতের অন্ধকারে মাদক সেবীরা রাস্তাঘাটে নির্জনে ছিনতাই, শারীরিক আঘাত এমনি হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনা ঘটাচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো অর্থ যোগানে, অর্থ আদায়ে এরা যে কোনো অপরাধ করতে পারে। যেগুলো তথ্য বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, আইনি তদন্তে, আদালতের মামলায় পাওয়া যায়। যা সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার তথা মানবাধিকারের বিপর্যয়।
আরও পড়ুন
মাদক: এইচআইভিসহ নানা জীবাণুর বাহক হতে পারে
বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত আইন এবং সেই আইনের অধীনে আলাদা অধিদপ্তর ও আছে। কিন্তু তারপরও দিন দিন মাদকের কড়াল গ্রাস থেকে সমাজের মানুষজন কোনো ক্রমেই মুক্তি পাচ্ছে না। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে সমাজে, পরিবারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, সমাজ কাঠামো তথা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়বে। এতে নষ্ট হবে আইন শৃঙ্খলা, মানুষের নিজের জানমাল রক্ষার্থে আইনের আশ্রয় নেওয়া ব্যতিরেকে নিজেরা আত্মরক্ষার নামে অপরাধে জড়িয়ে পরতে পারে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে দেখা যায় যে আইন বহির্ভূত ভাবে মত সৃষ্টি করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনা ঘটেছে।
সংবিধানের রাষ্ট্রপরিচালনা মূলনীতি এর ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনসাস্থ্য ও মাদক নির্মূলের লক্ষ্যে সরকার যে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব সমাজের ভবিষ্যতের শান্তি শৃঙ্খলার জন্য মাদকের কড়াল গ্রাসকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ডোপ টেস্ট করানো উচিত। প্রয়োজনে সামরিক প্রশাসন ও সিভিল প্রশাসনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করা উচিত। মাদক আক্রান্ত যুবকদের আলাদা শারীরিক ও মানসিক কঠোর শারীরিক ট্রেইনিং ও চিকিৎসা দেওয়া উচিত ফলে তাদের শরীর ও মন থেকে মাদকাসক্ত দূর হয়ে যায়।
লেখক: শিক্ষানবীস আইনজীবী, ঢাকা আইনজীবী সমিতি
কেএসকে
বিজ্ঞাপন