বিজ্ঞাপন
সংসারের হাল ধরতে নির্মাণশ্রমিকের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ঝিনাইদহের রাজন হোসেন (২২)। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তাকে বাধ্য করা হয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে রুশ বাহিনীর সৈনিক হিসেবে লড়তে। দেড় মাসের মাথায় ইউক্রেন বাহিনীর ড্রোন হামলায় কোমরের হাড় ভেঙে দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে অবশেষে দেশে ফিরেছেন তিনি।
রাজন হোসেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের আব্দুল কাদের কালুর ছেলে।
জানা গেছে, বিদেশে যাওয়ার জন্য দালালদের মাধ্যমে রাশিয়ার যাওয়ার বন্দোবস্ত করে রাজন ও তার পরিবার। পরে চলতি বছরের ৭ মে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। একই দিন পৌঁছান রাশিয়ার রাজধানী মস্কো বিমান বন্দরে। সেখানে একই দিন রাজনসহ ৩০ বাংলাদেশিকে একটি বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হোটেলে ৩ থেকে ৪ দিন রাখার পর ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ডের কথা বলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় দালাল চক্রের রাশিয়ান সিন্ডিকেট। পরে কাজের কথা বলে রাজনসহ অন্যদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি অজ্ঞাত রুশ সেনা ক্যাম্পে।
রাজন হোসেন বলেন, সেনা ক্যাম্পে নেওয়ার পরে আমরা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাই। ওই সময় রাশিয়ান চক্রের পা জড়িয়ে ধরেও রেহায় পাইনি। পরে তারা আমাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর গাড়িতে তুলে একটা বাংকারে রাখে। এরপর সেখানে ১ ঘণ্টা রাখার পর আমাদের ৩০ জন বাংলাদেশিকে বিভিন্ন দলে আলাদা করে ফেলে। আমি ৬ জনের একটি গ্রুপে ছিলাম। পরে আমাদের সবাইকে রাশিয়া সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্রসহ যুদ্ধের সবকিছু শিখিয়ে দেয়। সেখানে ২১ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর আমরা ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করতে যাই।
তিনি আরও বলেন, প্রথম দিনেই ১৭ জন বাংলাদেশি ড্রোন হামলায় মারা যায়। ওইদিনই একটি ড্রোন আমার কোমরে আঘাত হানে। এতে আমি মাঠিতে লুটিয়ে পড়ি। এরপর কোমরের নিচ থেকে আর শক্তি পাচ্ছিলাম না। ৪ দিনে ৪ কিলোমিটার পথ বুকে ভর দিয়ে অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসা নিই। পরে আমাকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকি ১৫ দিন। পরে একজন ডাক্তার আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যায়।
রাজন বলেন, গত ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরে এসেছি। দেশের ফেরার জন্য আমার পরিবার ৬২ হাজার রুবল পাঠায় রাশিয়ায়। বাংলাদেশের জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সি আমাদেরকে রাশিয়ার পুরো টেকনোলজির কাছে আমাদের পাঠায়।
রাজনের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, ধারদেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনের কাছে। ৩ বছর ঘুরিয়ে গত মে মাসে শ্রমিকের কাজের কথা বলে আমার ছেলেকে প্রতারণা করে রাশিয়ায় যুদ্ধে পাঠায়। আমার ছেলে যুদ্ধে আঘাত পেয়ে দেশে ফিরেছে। ছেলেকে চিকিৎসা করাবো সেই অর্থ এখন আমার কাছে নেই। আমার ছেলের সঙ্গে যারা এমন কাজ করেছে তাদের শাস্তি চাই।
রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই সুস্থ ছেলে এখন হাঁটতে পারে না। পরের কাছে সাহায্য চেয়ে এখন দিন চলছে। কীভাবে সংসার চালাবো সেই দুশ্চিন্তায় আছি।
আরও পড়ুন
৩৩ ঘণ্টা পর সৈকতে ভেসে এলো নিউজিল্যান্ডের নিখোঁজ কিশোরের মরদেহ
কলেজ শিক্ষক মুসা করিম বলেন, দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে পরিবারটি। খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে। এসব দালালদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
রাজনকে বিদেশে পাঠানোর স্থানীয় এজেন্ট আবু তাহের লেন্টু বলেন, আমার ভাগনে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে পাঠানো হয়েছিল। আমি কোনো প্রতারণা করিনি। রাজনকে সরকারিভাবে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যেন দালালের খপ্পরে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু করা যায় কিনা সেটা দেখা হবে।
এম শাহাজান/এনএইচআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন