বিজ্ঞাপন
খেতে বসে টিভিতে প্রিয় নাটক, ইউটিউব ভিডিও কিংবা মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করা অনেকের কাছেই এটি প্রতিদিনের স্বাভাবিক অভ্যাস। কেউ আবার বলেন, টিভি বা মোবাইল না দেখলে খাবারই ভালো লাগে না। কিন্তু খাবারের সময় পর্দায় চোখ আটকে রাখা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নাকি খারাপ?
গবেষণা বলছে, খাওয়ার সময় টিভি বা মোবাইলের মতো পর্দা ব্যবহার করা শরীরের জন্য সরাসরি বিষাক্ত কিছু নয়, তবে এটি ‘ডিস্ট্র্যাক্টেড ইটিং’ বা মনোযোগ অন্যদিকে রেখে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করে। এর ফলে কতটা খাচ্ছেন, কখন পেট ভরে গেছে-এসব সংকেত খেয়াল করার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। আর নিয়মিত এই অভ্যাস অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২০২৬ সালে দ্য আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন-এ প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে খাওয়ার সময় মনোযোগ অন্যদিকে থাকার প্রভাব নিয়ে ৫০টি গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সময় কোনো ধরনের মনোযোগের বিচ্যুতি থাকলে পরবর্তী খাবারের সময় মানুষ বেশি খাবার গ্রহণ করতে পারে। বিশেষ করে টিভির মতো নিষ্ক্রিয় বা প্যাসিভ ডিস্ট্রিকশনের ক্ষেত্রে একই সময়ে খাবার গ্রহণও বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং সত্যিই কি উপকারী, যা বলছে গবেষণা
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। গবেষণাটিতে খাওয়ার সময় তাৎক্ষণিকভাবে কতটা বেশি খাওয়া হয় সে বিষয়ে সব গবেষণার ফল এক নয়। অর্থাৎ টিভি দেখলেই প্রত্যেক ব্যক্তি বেশি খাবেন, এমন কথা বলা যায় না। কিন্তু পরবর্তী খাবারের সময় বেশি খাওয়ার প্রবণতার প্রমাণ তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট।
এর আগে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে ২৩টি গবেষণার ৫৭টি এফেক্ট সাইজ বিশ্লেষণ করা হয়। টিভি দেখার বিষয়টি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করলে খাবার গ্রহণে ছোট কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পাওয়া যায়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল টিভি দেখার প্রভাব পরের খাবারে বেশি খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশি দেখা গেছে।
সমস্যা কোথায়?
খাওয়ার সময় আমরা শুধু মুখ দিয়ে খাবার গ্রহণ করি না; মস্তিষ্কও খাবারের পরিমাণ, স্বাদ, গন্ধ ও পেট ভরার অনুভূতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু টিভি বা মোবাইলের ভিডিওতে মনোযোগ চলে গেলে খাবারের দিকে মনোযোগ কমে যায়।
ফলে কখন যথেষ্ট খাওয়া হয়েছে, সেটি বুঝতে দেরি হতে পারে। বিশেষ করে সামনে যদি চিপস, বিস্কুট, ফাস্টফুড বা মিষ্টিজাতীয় খাবার থাকে, তখন অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আরেকটি সমস্যা হলো পর্দায় দেখানো খাবারের বিজ্ঞাপন বা খাবারসংক্রান্ত দৃশ্যও খাওয়ার আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। ২০২২ সালের একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ-তে ৩৫টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্ক্রিনে খাবারের বিজ্ঞাপন ও ফুড কিউস উপস্থিত থাকলে খাবার গ্রহণ বাড়ার প্রবণতা ছিল। তবে মোবাইল ও ট্যাবলেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলেও গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন
বন্ধু নাকি গোপন শত্রু, চেনার সহজ কৌশল
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ
শিশুদের ক্ষেত্রে খাবারের সময় টিভি বা মোবাইল দেখার অভ্যাস নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১৮ সালের একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে ৮৪ হাজারের বেশি শিশু-কিশোরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে খাবারের সময় টিভি দেখার সঙ্গে অতিরিক্ত ওজনের সম্পর্ক পাওয়া যায়। গবেষণায় টিভি বা মোবাইল দেখতে দেখতে খাওয়া শিশু-কিশোরদের ওভারওয়েট হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি ছিল।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে, এই ধরনের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে টিভি দেখাই শিশুর স্থূলতার একমাত্র কারণ। খাবারের ধরন, শারীরিক কর্মকাণ্ড, ঘুম, পারিবারিক অভ্যাসসহ আরও অনেক বিষয় ওজনের ওপর প্রভাব ফেলে।
আবার শিশুদের নিয়ে হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রিত গবেষণার ফল সবসময় একই নয়। ২০২২ সালের একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে খাবারের সময় টিভি দেখায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্যালরি গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা অবশ্য বেশ কিছু গবেষণায় পক্ষপাত বা পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা থাকার কথাও বলেছেন।
অর্থাৎ, গবেষণার সবচেয়ে যুক্তিসংগত বক্তব্য হলো খাবারের সময় স্ক্রিন ব্যবহারকে এককভাবে স্থূলতার কারণ বলা যাবে না, কিন্তু এটি অতিরিক্ত খাওয়া ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি।
আরও পড়ুন
মুখে কামড় লেগে রক্তপাতে চিনি দিয়ে সত্যিই কি বন্ধ হয়?
তাহলে মোবাইল হাতে নিয়ে খাওয়া কি একেবারেই নিষেধ?
একবার-দুবার টিভি দেখতে দেখতে খেয়ে ফেললেই স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাবে এমন কথা গবেষণা বলে না। বরং সমস্যা হয় যখন এটি প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়। ২০২৬ সালের গবেষণাতেও দেখা গেছে, মনোযোগের বিচ্যুতির প্রভাব সব ধরনের পরিস্থিতিতে সমান নয়। একই সময়ে খাবার গ্রহণের ওপর সামগ্রিক প্রভাব পরিসংখ্যানগতভাবে স্পষ্ট ছিল না; কিন্তু টিভির মতো নিষ্ক্রিয় মনোযোগ বিচ্যুতি আলাদাভাবে বিবেচনা করলে খাবার গ্রহণ বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরবর্তী খাবারে বেশি খাওয়ার প্রবণতাটিও উল্লেখযোগ্য ছিল।
তাই সবচেয়ে ভালো অভ্যাস হলো খাবারের সময় টিভি, মোবাইল বা ট্যাবলেট পাশে রেখে খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়া। এতে শুধু কতটা খাচ্ছেন তা বোঝা সহজ হবে না, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও বাড়বে। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসও খাবারের সময়কে স্ক্রিন -ফ্রি রাখার পরামর্শ দেয় এবং রান্নাঘর বা খাবারের জায়গাকে স্ক্রিন -ফ্রি জোন হিসেবে রাখার কথা বলে।
কেএসকে
বিজ্ঞাপন