জাতীয়

‘দুখু মিয়া’ ছাড়াও আর কী কী নামে ডাকা হতো নজরুলকে?

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
6 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
একজন মানুষকে চেনা যায় নানা পরিচয়ে। কেউ তাকে চেনেন তার কথায়, কেউ তার কর্মে, আবার কেউ তার আচরণ, চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে। কিন্তু এই চেনা-জানার আড়ালেও থেকে যায় অনেক অজানা কথা, না-বলা অনুভূতি আর জীবনের এমন কিছু গল্প—যা কখনোই সবার সামনে আসে না। কারণ একজন মানুষকে শুধু তার পরিচিতি দিয়েই সম্পূর্ণভাবে জানা যায় না; তার জীবন, সংগ্রাম, অনুভূতি ও অন্তর্লোকের গল্প জানতে হয় গভীরভাবে। আমাদের সবারই পরিচিত একটি নাম—কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই পাঠ্যবইয়ের পাতায় তাঁর নামের সঙ্গে আমাদের পরিচয়। বিদ্রোহী কবি হিসেবে আমরা তাকে চিনি, তার কবিতা পড়েছি, গজল ও গান শুনেছি, তার জীবন ও সাহিত্য নিয়ে জেনেছি। কিন্তু এত পরিচিতির পরও নজরুলের জীবনের এমন অনেক অধ্যায়, অজানা তথ্য ও না-বলা গল্প আছে, যা হয়তো আজও অনেকের অজানা। কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ও শৈশবের গল্পেও মিশে আছে নানা আবেগ ও বেদনার ছায়া। তার বাবা কাজী ফকির আহমেদ ছিলেন একটি মসজিদের ইমাম। কাজী ফকির আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন নজরুল। চার পুত্রের মৃত্যুর পরে নজরুল জন্ম নেয় বলে শিশুকালে তার নাম রাখা হয় দুখু মিয়া। যা তাঁর ডাক নাম হিসেবে পরে পরিচিতি পায়। নামটির মধ্যেই যেন জড়িয়ে ছিল পরিবারের হারানোর কষ্ট আর নতুন করে পাওয়া সন্তানের প্রতি গভীর মমতা। তবে শুধু ‘দুখু মিয়া’ নামেই তার শৈশব থেমে থাকেনি। ছোটবেলায় তিনি ‘ক্ষ্যাপা’ নামেও পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে ‘নুরু’ নামটিও ব্যবহার করেছেন। আবার অনেকেই তাকে ‘নজর আলী’ নামে ডাকতেন। শৈশব থেকেই কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান। স্কুলজীবনে তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও মেধার পরিচয় পাওয়া যায় খুব অল্প বয়সেই। পড়াশোনায় ভালো ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ সে সময় তিনি মাসিক ৫ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। আজকের হিসেবে পাঁচ টাকা হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এই বৃত্তি ছিল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। আরও পড়ুন আবদুল্লাহ আল মামুন ও তাঁর কালজয়ী নাট্যভুবন সিয়ারসোল রাজ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিদায়-কাব্যবাণী রচনা করেন (১১ এপ্রিল ১৯১৬) তিনি। করুণ গাথা নামে বিদায়-কাব্যবাণী রচনা করেন (১৩ জুলাই ১৯১৬) প্রবীণ শিক্ষক ভোলানাথ কর্মকারের বিদায় উপলক্ষে। এ ছাড়া নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্থানীয়ভাবে সত্য ঘটনা অবলম্বনে ‘ক্ষমা’ নামে দীর্ঘ কবিতা লেখেন। পরে মুজফ্ফর আহমদ ‘মুক্তি’ নামে সেটি প্রকাশ করেন ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ১৯২১ সালে। এটিই জাতীয় কবির প্রথম প্রকাশিত কবিতা। ওই স্কুলে থাকতেই ‘চড়ুই পাখির ছানা’ কবিতাটিও রচনা করেন তিনি। এভাবেই কবির লেখালেখি শুরু। এদিকে আকবার নামে এক লোকের সঙ্গে কবি কুমিল্লায় বেড়াতে যান। সেখানে নার্গিস নামের এক নারীর সঙ্গে নজরুলের বাঁশি বাজানো নিয়ে আলোচনা হয়। এক রাতে নজরুল সেই গ্রামে খাঁ বাড়ির দিঘির ঘাটে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হন নার্গিস। পরিচয়ের পরই নজরুল নার্গিসের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। আর সেই নারী আকবারের ভাগ্নী। একপর্যায়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন কবি। ২২ বছর বয়সে বাংলা ১৩২৮ সালে ৩ আষাঢ়ে নার্গিস-নজরুলের বিয়ের দিন ধার্য হয়। নার্গিসের মামা আকবার বিয়েতে শর্ত হিসেবে ঘরজামাই থাকা ও টাকার লোভ দেখান। এতে নজরুল রেগে যান। প্রেম-ভালোবাসাকে ছিন্ন করে ফুলশয্যা না করেই সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে কবি আকবারের কাছে একটি চিঠি লেখেন। ১৬ বছর পর ১৯৩৭ সালে নজরুলকে নার্গিস একটা চিঠি লেখেন। নজরুল সেই চিঠির উত্তর দেন কবিতার মাধ্যমে। এর প্রায় বছরখানেক আগেই শিয়ালদহে নার্গিস ও নজরুলের উপস্থিতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। পরে আবার কুমিল্লাতেই ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল নজরুল প্রমীলা নামে হিন্দু মেয়ের সঙ্গে বিয়ের দিন ধার্য করেন। ভিন্ন ধর্মের হওয়ায় অনেকটা গোপনেই ইসলাম ধর্মমতে ১ হাজার টাকা দেনমোহরে নজরুল-প্রমীলার বিয়ে সম্পন্ন হয়। কবি চার সন্তানের নাম মুসলিম-হিন্দু উভয়ের মিলনেই নামকরণ করেন। কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ। কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবিতা, গান আর সাহিত্যের জগতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। কবি একবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯২৬ সালের কথা। স্বরাজ দলের হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ঢাকা বিভাগের মুসলমানদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য পদে। প্রচারণা কাজে দল থেকে যে অর্থ দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। নিজের পকেট থেকেই টাকা খরচ করেছেন তিনি। সবার কাছে যাওয়ার পরেও পাশে পাননি অনেক নেতাকে। আরও পড়ুন জহির রায়হান: অন্ধকারে হারানো এক আলোকিত মানুষ পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীনকে তিনি চিঠিতে বলেছিলেন, ঢাকায় আমি শতকরা নিরানব্বই ভোট পাবো। তোমাদের ফরিদপুরের কিছু পেলেই কেল্লাফতে! ভোট শেষে কবির গালভরা হাসি। কিন্তু ভোটের ফলে ভিন্নচিত্র। অল্প সংখ্যক ভোট পান কবি। পাঁচজন প্রার্থীর মাঝে ফলাফলের ভিত্তিতে কবি ৪র্থ হন। যা তিনি মোটেও আশা করেননি। রসিকতা আর উচ্ছ্বাসে কোনো কমতি ছিল না কবি কাজী নজরুল ইসলামের। তার প্রাণবন্ত স্বভাবের ছোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশও হয়ে উঠত প্রাণচঞ্চল। তিনি যে পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, সেই অফিসে কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি সব সময়ই চলত হাসি-আনন্দের বন্যা। এসব ঘটনার বাইরেও কাজী নজরুল ইসলামের জীবনজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঘটনা, তথ্য ও গল্প—যার অনেক কিছুই আজও আমাদের অজানা। প্রতিটি মানুষের জীবনেই থাকে এমন অনেক অজানা অধ্যায়। বাইরে থেকে আমরা একজন মানুষকে যতটা দেখি; তার চেয়েও অনেক বেশি গল্প লুকিয়ে থাকে তার ভেতরে—থাকে হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-ব্যর্থতা, স্বপ্ন আর সংগ্রাম। এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>