বিজ্ঞাপন
চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেফতার অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শুনানি শেষে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এ আদেশ দেন।
রিমান্ড শুনানিকে ঘিরে সকাল থেকেই আদালত চত্বরে অবস্থান নেন সালমান শাহর ভক্তরা। সকাল ১০টা থেকে তারা মানববন্ধন করেন। পরে ডনকে হাজতখানা থেকে আদালতে নেওয়ার সময় এবং শুনানি শেষে বের করে আনার সময় তাকে দেখে দুয়োধ্বনি দিতে থাকেন ভক্তরা। একপর্যায়ে কয়েকজনকে গালাগাল করতেও দেখা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ দ্রুত ডনকে সরিয়ে নেয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, এদিন দুপুর ১টা ২ মিনিটে ডনকে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানা থেকে বের করে আদালতের এজলাসে নেওয়া হয়। তাকে আদালতে তোলার সময় নিচে অবস্থানরত সালমান শাহ ভক্তরা দুয়োধ্বনি দিতে শুরু করেন। তারা পুলিশের পিছু নিয়ে এজলাস পর্যন্ত চলে যান।
আরও পড়ুন
সালমান শাহ হত্যাকাণ্ড: ডন পাঁচ দিনের রিমান্ডে
পরে রিমান্ড শুনানি শেষে বেলা ২টা ২ মিনিটে ডনকে আদালত থেকে বের করে আবার হাজতখানায় নেওয়া হয়। এ সময়ও ভক্তরা তাকে দেখে দুয়োধ্বনি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে কয়েকজন ভক্তকে গালাগাল করতে দেখা যায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ডনকে সরিয়ে হাজতখানায় নিয়ে যান।
এর আগে সকাল থেকেই আদালত চত্বরে সালমান শাহ হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন করেন তার ভক্তদের বিভিন্ন পক্ষ। দুটি ব্যানার নিয়ে তারা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘প্রিয় নায়ক ৩০ বছর ধরে কবরে, তার খুনিরা কেন বাইরে?’
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মাসুদ রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রধান আসামি সামিরা, আজিজ, লুসি, রিজভী ও পলাতক অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে।’
তিনি বলেন, সালমান শাহর মৃত্যুর নেপথ্যে যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।
ডনকে হাজতখানা থেকে আদালতে নেওয়ার সময় এবং শুনানি শেষে বের করে আনার সময় তাকে দেখে দুয়োধ্বনি দিতে থাকেন ভক্তরা/ছবি: আশিকুজ্জামান
আরেক ভক্ত মৌসুমী হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনতে হবে। ন্যায়বিচারের জন্য এক নম্বর আসামি সামিরাসহ অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।
‘হত্যায় জড়িতদের বিষয়ে তথ্য পেতে জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিআইডি’
আদালতের আদেশের পর ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। হত্যার রহস্য ও জড়িতদের বিষয়ে তথ্য পেতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিআইডি।’
আরও পড়ুন
‘সালমান শাহ ৩০ বছর ধরে কবরে, খুনিরা কেন বাইরে?’, ভক্তদের ক্ষোভ
তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর পর সালমান শাহ হত্যার বিচার দাবিতে আদালত চত্বরে ভক্তদের ভিড় হয়েছে। প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে তাদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ডনকে ঘিরে পুরোনো তদন্তে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি
ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জাগো নিউজকে বলেন, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় অতীতে একাধিক তদন্ত ও প্রতিবেদন হয়েছে। মামলার দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সালমান শাহর পরিবার এসব প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ওই আইনি প্রক্রিয়ার সময় সালমান শাহর মামা আদালতে এমন একটি রিপোর্ট উপস্থাপন করেন, যেখানে হত্যার পর সালমানের পরিবারকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়টি উল্লেখ ছিল।
এ মামলার ১২ নম্বর আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ ১৬৪ ধারায় একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন বলেও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়। ওই জবানবন্দিতে তিনি সালমান শাহকে কারা এবং কীভাবে হত্যা করেছিল সে বিষয়ে বর্ণনা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
ওই জবানবন্দিসহ মামলার বিভিন্ন নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর আদালতে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের পথ তৈরি হয়।
রিমান্ড আবেদনে কী জানতে চায় সিআইডি
ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে গত ২৪ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান।
ওই আবেদনের ওপর শুনানির জন্য ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করেছিলেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা। নির্ধারিত দিনে শুনানি শেষে আদালত সাত দিনের পরিবর্তে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে সিআইডি তিনটি কারণ উল্লেখ করে।
প্রথমত, ডনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সালমান শাহ হত্যা মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয়ত, তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলার ঘটনায় জড়িত অন্য সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হতে পারে বলে আবেদনে বলা হয়।
তৃতীয়ত, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ডন কীভাবে, কেন এবং কার ইন্ধনে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য বের করা প্রয়োজন বলে জানায় সিআইডি।
আরও পড়ুন
আলোচনায় সালমান শাহের সুইসাইড নোট
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ডনের জিজ্ঞাসাবাদে শুধু তার নিজের ভূমিকা নয়, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় অন্য কারও নির্দেশ, প্ররোচনা বা সহযোগিতা ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণভাবে খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে ঘটনায় কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তাও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৩০ বছর পর অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছিল।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। আদালত ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এর পরদিন, ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ দ্রুত ডনকে সরিয়ে নেয়/ছবি: জাগো নিউজ
মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
আরও পড়ুন
সালমান শাহর মৃত্যুর পর ১০০ কোটি টাকার প্রস্তাব, দাবি নীলা চৌধুরীর
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন।
বিমানবন্দর থেকে আটক, পরে কারাগারে
গত ৯ আগস্ট ভোরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ ডনকে আটক করে।
ওই দিনই তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। তখন মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে পুলিশ।
শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে তার জামিন আবেদনও নামঞ্জুর করেন আদালত।
সিআইডির রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও ডন বিদেশে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কার ইন্ধনে এবং কী উদ্দেশ্যে তিনি দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সেটিও জানতে চায় তদন্ত সংস্থা।
যে মৃত্যু ঘিরে তিন দশকের প্রশ্ন
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহকে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরও পড়ুন
শাহরুখ খানের সঙ্গে সালমান শাহ, বহু বছর পর প্রকাশ হলো বিরল ছবিটি
তার মৃত্যুর পর প্রথমে ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই তার মৃত্যু স্বাভাবিক নয় এবং তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে চলা আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়ার পর গত বছর ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তের আওতায় আসে।
ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জাগো নিউজকে বলেন, এখন ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সালমান শাহর মৃত্যুর বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য বেরিয়ে আসে কি না, অন্য আসামিদের ভূমিকা সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং বিদেশে পালানোর চেষ্টার নেপথ্যে কারও ইন্ধন ছিল কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে তদন্ত সংস্থা।
তিনি আরও বলেন, আদালত চত্বরে ভক্তদের দুয়োধ্বনি ও বিক্ষোভ থেকে স্পষ্ট, তিন দশক পরও সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য ও বিচার নিয়ে তাদের আগ্রহ ও ক্ষোভ কমেনি।
এমডিএএ/এমএমকে
বিজ্ঞাপন