বিজ্ঞাপন
চকচকে নতুন ভবন, দেয়ালে নতুন রঙের ছাপ- দেখলেই মনে হয় পাঠদানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পর্যাপ্ত টয়লেট ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় ভবন নির্মাণ শেষ হলেও সেখানে এখনো শুরু হয়নি পাঠদান। ফলে নতুন ভবন পেয়েও পুরোনো ঠিকানায় ফিরতে পারছে না ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এদিকে এই অবস্থায় প্রায় আড়াই বছর ধরে নিজেদের বিদ্যালয় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোলকিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনে গিয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে কাঁচিঝুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের । এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ভোগান্তি বাড়ছে অন্যদিকে কমছে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।
‘টয়লেট নেই, পানির ব্যবস্থা নেই। একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। এতে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। শিক্ষার্থীরা দূরে দেখে স্কুলে আসতে চায় না।’
শুধু দূরত্ব নয়, দুই বিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর সময়েও রয়েছে বড় পার্থক্য। কাঁচিঝুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ক্লাস শুরু হয় সকাল ৮টায়। আর যে গোলকিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে তাদের পাঠদান চলছে, সেখানে ক্লাস শুরু হয় দুপুর ১২টায়। একই ভবনে দুই বিদ্যালয়ের পাঠদান পরিচালনা করতে গিয়ে সময়সূচির এই ব্যবধানও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন নিজস্ব ভবনের বাইরে পাঠদান চলায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দূরত্বের কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসছে না। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের প্রতিদিন সন্তানকে নিয়ে দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপস্থিতি ও শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনসহ সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৮৫টি। এর মধ্যে ১১৪ নম্বর কাঁচিঝুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৫৯ সালে নগরীর হামিদউদ্দিন রোড এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো ভবনটি একসময় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-৪-এর আওতায় বিদ্যালয়টির জন্য নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
‘এই উপজেলায় যোগ দেওয়ার পর কাঁচিঝুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের বিষয়টি আমার নজরে আসে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এখন ভবনের কাজ শেষ। যেকোনো সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
প্রকল্প অনুযায়ী ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কাজটির দায়িত্ব পায় এমএমআর এমএসজেবি নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯৭ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী একই বছরের নভেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফা সময় বাড়ানো হয়।
এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে প্রায় আড়াই বছর। নির্মাণকাজ শেষ হলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে নতুন ভবন তালাবদ্ধ বা ব্যবহারবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে নতুন ভবন নির্মাণের কারণে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল গোলকিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শুরুতে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া এই সিদ্ধান্তই এখন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। আড়াই বছর ধরে শিক্ষার্থীদের এই দূরের বিদ্যালয়ে গিয়ে পাঠ নিতে হচ্ছে।
‘বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ ভবন নির্মাণের পরও যদি সেখানে পানি ও টয়লেটের মতো মৌলিক সুবিধা না থাকে, তাহলে সেই ভবন ব্যবহার করে কীভাবে নিয়মিত পাঠদান পরিচালনা করা হবে, সেটিই এখন তাদের প্রশ্ন।’
অভিভাবকদের অভিযোগ, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে প্রতিদিন বাড়তি খরচ হচ্ছে। প্রতিদিন যাতায়াতেই প্রায় ৬০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য এই বাড়তি খরচ বহন করা কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সময়ের সমস্যা এবং ছোট শিশুদের দূরে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের স্কুলের নতুন ভবন তৈরি হয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে এখনো ক্লাস করতে পারছে না তারা। দূরের গোলকিবাড়ি স্কুলে প্রতিদিন যেতে অনেক কষ্ট হয় তাদের। এতে সময়ও বেশি লাগে। অনেক সময় স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না তাদের। দ্রুত পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থা করে নিজেদের স্কুলের নতুন ভবনে ক্লাস করার আগ্রহ জানায় তারা।
আব্দুর রশিদ নামে এক অভিভাবক বলেন, নিজের এলাকার স্কুলে সন্তানকে পাঠানোর সুযোগ থাকলে এত টাকা প্রতিদিন খরচ করতে হতো না। এখন দূরে গিয়ে ক্লাস করতে হয়। অনেক দিন সন্তানকে স্কুলে পাঠানো সম্ভব হয় না। ফলে লেখাপড়ারও ক্ষতি হচ্ছে।
অভিভাবক আল-আমিন ও ছাইফুল বলেন, বিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ ভবন নির্মাণের পরও যদি সেখানে পানি ও টয়লেটের মতো মৌলিক সুবিধা না থাকে, তাহলে সেই ভবন ব্যবহার করে কীভাবে নিয়মিত পাঠদান পরিচালনা করা হবে, সেটিই এখন তাদের প্রশ্ন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা. মোমেনা খাতুন বলেন, টয়লেট নেই, পানির ব্যবস্থা নেই। একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। এতে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। শিক্ষার্থীরা দূরে দেখে স্কুলে আসতে চায় না।
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, ব্যবহারযোগ্য টয়লেট ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এসব সুবিধার ঘাটতি সরাসরি তাদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। কাঁচিঝুলি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সেই সংকটই দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ২৪১ প্রাথমিক বিদ্যালয়
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ শুধু পানি ও টয়লেটের সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা নতুন ভবন নির্মাণের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এলাকাবাসীর কয়েকজনের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের সময় যথাযথভাবে পানি দেওয়া হয়নি। অনেক কাজ দায়সারাভাবে করা হয়েছে। বাইরে থেকে ভবনটিকে আকর্ষণীয় দেখাতে রঙের কাজ করা হলেও ভেতরে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নিয়ম মেনেই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পানির জন্য চৌবাচ্চা নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখান থেকেই পানি দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
সোনালি আঁশে ৫৪৯ কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন বুনছেন রাজশাহীর কৃষকরা
প্রধান শিক্ষকের অভিযোগের বিষয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, ভবন নির্মাণের পুরো সময় প্রধান শিক্ষক নিয়মিতভাবে কাজের খোঁজ নেননি। তার ভাষ্য, কাজ চলার সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আরও বেশি নজরদারি করা উচিত ছিল।
তবে নির্মাণকাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ এবং ঠিকাদারের বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি পরিদর্শন ও যাচাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার আগে নির্মাণকাজের গুণগত মান, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ সবকিছু পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সদর উপজেলা প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম বলেন, এই উপজেলায় যোগ দেওয়ার পর কাঁচিঝুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের বিষয়টি আমার নজরে আসে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এখন ভবনের কাজ শেষ। যেকোনো সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবে আমানত বাড়লেও কৃষকদের কমছে
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ভবনটি হস্তান্তরের পাশাপাশি টয়লেট ও পানির সমস্যাসহ অন্যান্য বিষয় সমাধানে কাজ চলছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে কাঁচিঝুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল ভবনে পাঠদান শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নতুন ভবনটি হস্তান্তর করে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণকাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগও যাচাই করা প্রয়োজন। প্রশাসনের এক সপ্তাহের সময়সীমা যেন আর না বাড়ে, এমন প্রত্যাশা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
নতুন ভবন নির্মাণের পর এখন সেটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করাই মূল দাবি। আড়াই বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীরা কবে নিজেদের বিদ্যালয়ে ফিরতে পারবে, সেটিই এখন সবার প্রশ্ন।
এনএইচআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন