বিজ্ঞাপন
গত দুই দিনে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নেপাল ও সেখানে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হড়কাবান (ফ্লাশ ফ্লাড) নিয়ে প্রকাশিত কিছু সংবাদ, বিশেষ করে কয়েকজন বাংলাদেশি ট্রাভেলারকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত সংবাদ ও শিরোনাম, হতাশাজনক এবং একই সঙ্গে দৃষ্টিকটু।
নেপালে যে ভয়াবহ হড়কাবান হয়ে গেল, তা সত্যিই অসহনীয়। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো সিনেমার ভয়াবহ দৃশ্য দেখছি। অথচ এটি কোনো সিনেমা নয়, বাস্তবতা। মুহূর্তের মধ্যে একটি জনপদ নরকে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য মানুষের জীবন, গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণীর জীবন কাদার নিচে শেষ হয়ে গেছে। এই শোক প্রকাশ করার মতো ভাষা সত্যিই আমাদের জানা নেই। কিন্তু এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও আমাদের সংবাদ পরিবেশনের ধরন নিয়ে কিছু কথা বলা জরুরি।
প্রথমত, বাংলাদেশি কিছু ট্রাভেলার কাঠমান্ডুতে, পোখারায় কিংবা নেপালের অন্য কোনো জায়গায় অবস্থান করছেন। কেউ কেউ রসুয়া থেকে শত শত মাইল দূরেও আছেন। অথচ তাদের অনেকেই ‘আটকে গেছি’, ‘ভয়াবহ বিপদে আছি’, ‘অনিশ্চয়তায় আছি’ এ ধরনের নানা মুখরোচক গল্প করছেন। আরও দুঃখজনক হলো, কিছু সংবাদমাধ্যমও সেগুলোকে অতি উৎসাহের সঙ্গে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করছে।
আরও পড়ুন
যেই সেলুন থেকে কেঁদে বাড়ি ফেরেন প্রবাসীরা
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও স্বাভাবিকভাবেই এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, কেউ কেউ আতঙ্কিত হচ্ছেন, আবার কেউ রোমাঞ্চিত হয়ে গল্প করছেন। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।
পাহাড়ি অঞ্চলে বর্ষাকালে ছোট-বড় ভূমিধসের কারণে রাস্তা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। বৃষ্টি কমলে, রাস্তা পরিষ্কার ও মেরামত করে আবার চলাচলের উপযোগী করা হয়। নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলের এটি খুব পরিচিত বাস্তবতা। তাই রাস্তা সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়াকে একটি ভয়াবহ জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে উপস্থাপন করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
দ্বিতীয়ত, ‘রসুয়াতে এত পর্যটক কেন গেল?’ এ ধরনের প্রশ্নও অনেকটা অতিরঞ্জিত। নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে সারাবছরই বিপুলসংখ্যক পর্যটক ছড়িয়ে থাকেন। রসুয়াও তার বাইরে নয়। সংবাদমাধ্যমের কিছু শিরোনাম দেখে মনে হচ্ছে, সেখানে পর্যটকেরা গিয়ে যেন কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন!
আরও পড়ুন
যারা কোনোদিন সিংহাসন চায়নি, দ্বীপটি তাদেরই রাজত্ব
কিছুদিন আগেও সলোখুম্বু অঞ্চলের একটি পুরো গ্রাম ভয়াবহ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের যে কোনো পাহাড়ি অঞ্চলে এমন বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকবেই। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার পর্যটকদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে অযথা আতঙ্ক বা উত্তেজনা তৈরি করার কোনো প্রয়োজন কি খুবই জরুরি? বরং আমাদের এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন এমন দুর্যোগ দিনদিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের দিকেই তাকাতে হবে।
হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ। এসব হ্রদ থেকে হঠাৎ পানি বেরিয়ে আসা এবং অতিবৃষ্টি, দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই পাহাড়ি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও হড়কাবানের ঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এই ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তুলছে। অর্থাৎ, প্রকৃতির ওপর মানুষের দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপের দায় শেষ পর্যন্ত মানুষকেই নিতে হবে।
আজ নেপালে যা ঘটছে, তা শুধু নেপালের সমস্যা নয়। হিমালয় আমাদের নদী, পানি, আবহাওয়া ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হিমালয়ের পরিবর্তন আমাদের জীবনেও প্রভাব ফেলবে। এই ভয়াবহ দুর্যোগে নিহত প্রত্যেক মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানাই। যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের জন্য আমাদের হৃদয় কাঁদছে।
আরও পড়ুন
তুষারধসে পর্বতারোহী কিলি পেম্বা শেরপার মৃত্যুতে শোকাহত শাকিল
সব সংবাদমাধ্যমের প্রতি আন্তরিক অনুরোধ, আপনাদের মাধ্যমেই আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি। আক্রান্ত মানুষগুলোর কথা তুলে ধরুন। তাদের দুর্দশা, প্রয়োজন ও বাস্তব পরিস্থিতি আমাদের সামনে তুলে ধরুন। আপনাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
কিন্তু দয়াকরে অতিরঞ্জিত শিরোনাম, অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক এবং কয়েকজন পর্যটকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে পুরো একটি দেশের দুর্যোগকে উপস্থাপন করা থেকে বেরিয়ে আসুন। মানুষের দুর্ভোগ সংবাদ হোক, মানুষের আতঙ্ক নয়।
এসইউ
বিজ্ঞাপন