জাতীয়

আজও তার পথচেয়ে দিন যায় পরিবারের

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
9 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
পুরো নাম ‘মো. আল আমিন বিশ্বাস’। পরিবার-গ্রামের সবাই তাকে ডাকতেন ‘আমিন বিশ্বাস’ নামে। মুসলিম ধর্মমতে ‘আল আমিন’ নামটির অর্থ ‘বিশ্বাসী’। আর তিনি জন্মও নিলেন ‘বিশ্বাস’ বংশে। মানুষ হিসেবেও নিজেকে তৈরি করেছিলেন বিশ্বাসযোগ্য করে। বিশ্বস্ত ছিলেন গ্রামের মানুষের কাছে। পরিবারে তিনি ছিলেন ভরসার জায়গা। তার আয়ে নির্ভরশীল ছিলেন- স্ত্রী, দুই সন্তান, বাবা-মা ও শাশুড়ি। কিন্তু, আল আমিন না থাকায় এখন এরা যেন ভাসমান মৃত কাঠ। তিনি না থাকায় জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছেন এই মানুষগুলো। পরিবারটিকে দেখলেই বোঝা যায়, একটি নিখোঁজ কিংবা মৃত্যু, আরও কতজনের কষ্টের কারণ হতে পারে। বঙ্গোপসাগরে ইলিশ ধরতে গিয়ে আর ফেরেননি আল-আমিন। ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় মিধিলিতে ৪০ বছর বয়স্ক এই জেলে নিখোঁজ হন। জানা যায়, অবরোধের শেষদিকে জেলেদের ঘরগুলো হয়ে ওঠে বাজারশূন্য। ঐ সময়টায় আবহাওয়া খারাপ-ভালো যেমনই থাকুক, জেলেরা সমুদ্রে ছোটেন। সেবার অবরোধ শেষ হওয়ায় দু-দিন পর সমুদ্রে ছুটলো আল আমিনদের ট্রলার। আর যাত্রা শুরুর তিন দিন পরেই হলো ঝড়। ওই ট্রলারে ছিলেন আল আমিনের আপন বড় ভাইসহ মোট ১৭ জেলে। সেই ১৭ জনের কেউ আর ফেরেননি। খোঁজ মেলেনি কারো লাশেরও। বরগুনা সদরের ৭ নং ঢলুয়া ইউনিয়নের মোরখালি গ্রামে ছিল আল-আমিন ও তার পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা। এখন আর স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছুই নেই। নির্ভরযোগ্য কেউ নেই তার পরিবারটির পাশে। ঘরের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিটি নিখোঁজ হওয়ায়, দুর্দশা নেমেছে পরিবারে। আল আমিনের স্ত্রীর নাম মোসা. সালমা বেগম (৩৫)। স্বামী নিখোঁজের পরে সন্তানদের নিয়ে তার ঠিকানা মামার আশ্রয়ে। মামার ঘরে, ফসলের মাঠে, প্রতিবেশীদের গরুর খামারে কাজ করেন। স্বামীহীনা সালমা এ কাজ নিয়েছেন পেটের দায়ে- সন্তানদের জীবন চালাতে। বাবা-স্বামী থাকাকালে এত পরিশ্রম করতে হয়নি। অভ্যাসও ছিল না। তবে এখন অভ্যস্ত হচ্ছেন। কাজ করলে তবেই জোটে খাবার। পেট চালাতে চাইলে, হাত চালাতে হয় আগে। আরও পড়ুন ঢাকার লোকাল বাসে ব্যতিক্রমী এক ড্রাইভার-হেলপার জুটি এই জেলে পরিবারে জন্ম নিয়েছে দুই সন্তান। মেয়ে মারিয়া (১২), ছেলে মো. আব্দুল্লাহ (৯)। শিশু দুটির জীবন এখন শিশুদের মতো নেই। ওরা মেনে নিয়েছে, ওদের বাবা নিখোঁজ। ওরা জেনে গেছে-নিখোঁজ নামক বাস্তবতা কাকে বলে। গত কয়েক বছরে ওরা চিনে গেছে-বাবা নিখোঁজ হলে জীবনের পথ কতটা কঠিন হতে পারে। মারিয়া স্থানীয় কাঠালতলী ডিকে ফজিউদ্দিন দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। আব্দুল্লাহ পড়ে মোল্লাহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে। স্কুলের খাতায় এখনো ওদের নাম থাকলেও, আর কতদিন পড়ালেখা চলবে, তা নিয়ে ওরা শঙ্কিত। এতটুকু বয়সেই ওরা বুঝে গেছে, বাবা নিখোঁজের পর ওদের মা খেত-খামারে কাজ করে, জাকাত-ফেতরা ও অন্যের দানে সন্তানদের পেট চালান। এমন পরিবারে কীসের পড়ালেখা? বড় হলে ওদের খেটে খেটেই পেট চালাতে হবে। সমুদ্র থেকে ফিরেই ছেলেকে মুসলমানি (খতনা) করানোর ইচ্ছা ছিল আল আমিনের। কিন্তু তা আর হলো না। মারিয়ার কাছেও বাবা এখন শুধুই স্মৃতি। বাবা যখন শেষ সমুদ্রে যান, তখন মারিয়ার পঞ্চম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। সেই মেয়েটি পঞ্চম শ্রেণিতে ঠিকই এ+ পেল, তবে বাবা আর জানলোই না। মারিয়ার মনে পড়ে, বাবা সবচেয়ে বেশি বলতেন একটি কথা, ‘ভালো করে লেখাপড়া করবি, যা চাও তাই পাবি’। বাবা সম্পর্কে কথা তুলতেই কান্নাঝড়া চোখে মারিয়া বললো, আব্বায় নিজ হাতে ভাত খাইয়ে দিত। লেখাপড়ার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিল। যখন যা চাইতাম, তাই পাইতাম। আব্বার সব কথাই মনে পড়ে। আব্বা নাই, আমার আর কিছু চাওয়ার জায়গা নাই। আব্দুল্লাহ বাবার প্রশ্নে-নিশ্চুপ, অনুভূতিহীন। কোনো কথাই বের হলো না মুখ থেকে। মিনিটখানেক পর ভিড় ছেড়ে এগিয়ে গেল কয়েক কদম। ছেলেটার সামনে কেউ ওর বাবার কথা তুললেই একটু দূরে সরে একা একা কাঁদে, জানালেন আব্দুল্লাহর মা। বাবা না থাকার কেমন কষ্ট সেটা আব্দুল্লাহ এখন ঢের বোঝে। আরও পড়ুন শত কষ্টেও করেননি ‘ভিক্ষাবৃত্তি’ নিখোঁজ ট্রলারে আল আমিনের সঙ্গে তার আপন ভাইও ছিলেন। ঐ সময় আল আমিনের বাবা ঢাকায় রিকশা চালাতেন। ঝড়ে দুই ছেলে নিখোঁজ খবরের ঠিক চার দিন পর হৃৎক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় আল আমিনের বাবার। এদিকে একইসঙ্গে দুই ছেলে ও স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে ওঠেন আল আমিনের মা বিলকিস বেগম। বিলকিস এখন কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। ইচ্ছামতো, কাউকে কিছু না বলেই একা একা বেরিয়ে যান ঘর থেকে। পরে দুই-চারদিন পর্যন্ত খোঁজ থাকে না। আবার মাথা ঠিক হলে, ঘরে ফেরেন। গত ছয় মাস বিলকিসের এমনই চলছে। আবার শাশুড়ির প্রয়োজনীয় ঔষধ-তেল-কাপড় সবই দিতেন জামাতা আল আমিন। খোঁজ নিতেন। এখন আর শাশুড়ির খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই। শাশুড়ি এখন কাঁদেন জামাইয়ের জন্য। তিনি বললেন, আমার একটাই মেয়ে-একটাই জামাই, আর কোনো ছেলে মেয়েও নেই। জামাই আমাকে ছেলের মতো করে দেখে রাখতেন। সে আমাকে মায়ের মতোই ভালোবাসতেন। রোগে-শোকে আমি এখন কাতর। জামাইটা চলে যাওয়ার পরে আর কোনো দিন ডাক্তার দেখাতে পারিনি। আর কোনো দিন তেল-সাবান কিনিনি। আর কোনোদিন নতুন কাপড় পারিনি। আল আমিনের স্ত্রী সালমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আগে মারিয়ার বাবায় গাছ কাটার কাজ করতেন। ২০১৫ সালে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তার পা ভাঙে। তখন আব্দুল্লাহ আট মাসের গর্ভে ছিল। এরপর দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। এরমধ্যে আব্দুল্লাহর জন্ম হলো। ফলে হাতে জমানো টাকাপয়সাও সব শেষ হয়। প্রয়োজন হয় কাজের। পরে ভাইয়ের সঙ্গে তিনি মাছের ট্রলারে কাজ নেন। এই কাজে যেতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু কোনো উপায় ছিল না…।’ তিনি বলেন, ‘ট্রলার থেকে ১৭জন মানুষ হারিয়ে গেল। যেদিন ঝড় হয় তার আগের দিন সন্ধ্যায় নেটওয়ার্কের মধ্যে এসেছিল। বড় ভাইয়ের ফোন দিয়ে কথা বলেছিল পরিবারের সঙ্গে। শেষ বলেছিলেন, বেশ অন্ধকার। কাল সকালে তীরের দিকে রওনা করবেন। এরপর আর যোগাযোগ নেই। নিখোঁজ ট্রলারটির মালিক সফিকুল ইসলাম বারবার খুঁজেও ট্রলার-জাল-মাঝি-জেলে কারো কোনো খোঁজ পেলেন না। ১৫ দিনের মতো খোঁজা হয়েছে। পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া খারাপ ছিল বিধায় আর খোঁজা যায়নি। তারা বেঁচে আছেন কি না জানেন না। তবে সালমার বারবার মনে হচ্ছে, তারা ভারতের কোনো কারাগারে আটকা আছেন। যদি পারতাম ভিক্ষা করে হলেও স্বামীকে ফেরত আনতাম।’ যেখানে মানুষ থাকা দায়-সেখানেই এখন ঠিকানা মাসহ এই দুই শিশুর। সালমা জানান, ঘরটুকুও এখন নেই। তাই সন্তানদের নিয়ে এসে নানা বাড়িতে-মামার ঘরে থাকতে হচ্ছে। আজ আল আমিনের সন্তানরা বাবার ছায়া খোঁজে, পায় না। স্ত্রী স্বামীর শাসন-বারণ-সোহাগ খোঁজেন, পান না। আল আমিনের মা দেখতে চান সন্তানের মুখ-তা অনুপস্থিত। শাশুড়ি চায় জামাইয়ের মধ্যে ছেলে খুঁজে পেতে-তাও মেলে না। সব অমিলের অধ্যায় ‘আল আমিন’। আর সেই অধ্যায়ের পরিচ্ছেদ হয়েছে-এই মানুষগুলো। হয়তো ওদের নিয়তিও ওদের ওপর রুষ্ট। ওদের জন্যই বুঝি হেলাল হাফিজ লিখেছিলেন, কষ্ট নেবে-কষ্ট-হরেক রকম কষ্ট আছে-লাল কষ্ট-নীল কষ্ট…..। সত্যিই- জেলে জনপদে এমন কষ্ট অগণিত। নোট: পরিবারটির সঙ্গে লেখকের দেখা হয় সালমার মামা বাড়ি-পাথরঘাটাতে। তাই স্থায়ী ঠিকানার সেই ঘরের ছবি পাঠককে দেখানো সম্ভব হলো না। কারণ, কষ্ট বয়ে তারাই যে ঘরছাড়া। ঘর এখন শূন্য পড়ে রয়- দূরে। কেএসকে
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>