বিজ্ঞাপন
পাহাড় মানেই মেঘ, সবুজ, ঝরনা আর রোমাঞ্চ। তাই বর্ষা কিংবা ছুটির মৌসুমে পাহাড়ি পথে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন অনেকেই। কিন্তু পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষ করে টানা বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা কিংবা ভূমিধস মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিতে পারে পুরো পরিস্থিতি।
সম্প্রতি নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস সেই বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে। ২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদী এলাকায় আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকরাও এতে আটকা পড়েন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের পর শত শত পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, তাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকও ছিলেন।
এমন পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, পাহাড়ে ভ্রমণের সময় শুধু গন্তব্য নয়, নিরাপত্তার প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ছবি: এএফপি
ভূমিধসের ঝুঁকি বুঝবেন কীভাবে?
ভূমিধস সাধারণত পাহাড়ের ঢালে মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ হঠাৎ নিচের দিকে নেমে আসার ঘটনা। ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ের মাটিতে অতিরিক্ত পানি জমা কিংবা ভূপ্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ভ্রমণের সময় পাহাড়ের ঢালে নতুন ফাটল, অস্বাভাবিকভাবে মাটি বসে যাওয়া, ছোট ছোট পাথর গড়িয়ে পড়া কিংবা হঠাৎ পানির প্রবাহের পরিবর্তন চোখে পড়লে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এমন কোনো লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে হবে।
ছবি: এএফপি
গাড়িতে থাকলে কী করবেন?
পাহাড়ি রাস্তায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটলে গাড়ি নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা বিপজ্জনক। রাস্তার সামনে মাটি বা পাথর পড়তে দেখলে নিরাপদ দূরত্বে গাড়ি থামিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তবে ভূমিধসের জায়গার একেবারে পাশে গাড়ি থামানোও নিরাপদ নয়। কারণ প্রথম ধসের পর আরও মাটি বা পাথর নেমে আসতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ বা উদ্ধারকারী দলের নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
ভূমিধস শুরু হলে দৌড়ে কোথায় যাবেন?
ভূমিধসের সময় স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু ভুল দিকে দৌড়ালে বিপদ আরও বাড়তে পারে। মাটি বা পাথর যে দিক দিয়ে নিচে নামছে, সেই প্রবাহের সামনে না গিয়ে দ্রুত পাশের তুলনামূলক নিরাপদ ও স্থিতিশীল উঁচু জায়গায় সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
তবে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। খুব কাছে ভূমিধস শুরু হলে নিজে উদ্ধারকাজে না গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে জরুরি সহায়তার খবর দেওয়া ভালো।
নদী বা পাহাড়ি ঝরনার পাশে থাকলে সতর্ক
পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টি না হলেও উজানে ভারী বৃষ্টি বা বরফ-হিমবাহজনিত ঘটনার কারণে হঠাৎ নদীর পানি বেড়ে যেতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগে আকস্মিক বন্যার প্রবল স্রোত পাহাড়ি নদীপথ ধরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
তাই পাহাড়ে ক্যাম্পিং বা ঘোরাঘুরির সময় নদীর একেবারে তীরে তাবু স্থাপন করা উচিত নয়। পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে মনে হলে ছবি তুলতে বা দৃশ্য দেখতে দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত উঁচু জায়গায় চলে যেতে হবে।
মোবাইল ফোনই হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সহায়
ভ্রমণের আগে ফোন পুরোপুরি চার্জ করে নেওয়ার পাশাপাশি পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখা ভালো। জরুরি নম্বর, হোটেল বা ট্রাভেল এজেন্সির যোগাযোগ, স্থানীয় গাইডের নম্বর এবং পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ ফোনে সংরক্ষণ করে রাখুন।
দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই কোথায় যাচ্ছেন এবং কখন ফেরার কথা, এই তথ্য পরিবারের কাউকে জানিয়ে রাখা জরুরি।
একা পাহাড়ে না যাওয়াই ভালো
অপরিচিত পাহাড়ি এলাকায় একা ঘোরাঘুরি না করে স্থানীয় গাইড বা অভিজ্ঞ দলের সঙ্গে থাকা নিরাপদ। আবহাওয়া খারাপ হলে পরিকল্পনা বাতিল করতেও দ্বিধা করা উচিত নয়। পাহাড়ে একটি সুন্দর ছবি বা নির্ধারিত গন্তব্যের চেয়ে নিরাপদে ফিরে আসা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্যোগের সময় ছবি নয়, নিরাপত্তা আগে
ভূমিধস বা আকস্মিক বন্যা দেখলে অনেকেরই মোবাইল বের করে ছবি বা ভিডিও করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বিপদ একেবারে সামনে থাকলে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওর জন্য দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
আরও পড়ুন
নেপালে বিপর্যয়ের মধ্যেই আরও একটি বন্যার শঙ্কা
নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনায় বহু মানুষকে আটকে পড়তে হয়েছে এবং উদ্ধারকারী দলকে দুর্গম এলাকায় কাজ করতে হচ্ছে। তাই পাহাড়ে ভ্রমণের সময় সবচেয়ে জরুরি নিয়ম একটাই-প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করুন, কিন্তু প্রকৃতির সতর্ক সংকেতকে কখনো উপেক্ষা করবেন না।
আরও পড়ুন
নেপালের রাসুয়ায় দেখার কী আছে, সেখানে এত পর্যটক যায় কেন?
ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সতর্কতা দেখে নিন। আর পরিস্থিতি বিপজ্জনক মনে হলে পরিকল্পনা বদলে ফেলুন। কারণ পাহাড়ে একটি ট্রিপ আবার করা যায়, কিন্তু জীবনকে দ্বিতীয়বার পাওয়া যায় না।
সূত্র: এনটিবি, ইউনিসেফ, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, নেপাল ট্যুরিজম
এসএকেওয়াই
বিজ্ঞাপন