বিজ্ঞাপন
প্রেমনির্ভর সিনেমা ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে জনস্বার্থে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন। তবে, অবাক করা ব্যাপার হলো, এই আইনজীবী নিজেই রোমান্টিক সিনেমা, প্রেমনির্ভর গানের ভক্ত।
এই আইনজীবীর মেটা ভেরিফায়েড একটি ফেসবুক আইডি রয়েছে। আইডির টাইমলাইনে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন সময় মাহমুদুল হাসান মামুন যেমন রোমান্টিক সিনেমা দেখেছেন বা গান শুনেছেন, তেমনি আনন্দের সঙ্গে নিজের আইডিতে সে কথা এবং সিনেমা দেখার অনুভূতিও ব্যক্ত করেছেন সাবলীলভাবেই।
৩১ জুলাই নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি ছবি শেয়ার করে পোস্ট দেন তিনি। ওই পোস্টে মামুন জানান, ইংরেজি ভাষার ড্রামা সিরিজ ‘দ্য গ্রেট অ্যান্ড পাওয়ারফুল জিনি’ (রোমান্টিক ঘরানার) দেখে তিনি আনন্দিত বোধ করছেন।
এর আগে, গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি আরেক পোস্টে জানান, হলিউডের সমালোচিত সিনেমা ‘দ্য ডিকটেটর’ দেখেছেন তিনি। অশ্লীলতায় ভরা এ সিনেমা তার কাছে অসাধারণ লেগেছে বলেও তিনি পোস্টে উল্লেখ করেছেন।
তার আগে, ওই বছরের ৩১ আগস্ট ছবিসহ এক পোস্টে তিনি বলিউডের একটি গান শোনার কথা জানান। শুধু গানই নয়, সেটি যে সিনেমার সেটিও রোমান্টিক। এমনকি সিনেমাটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্পে নির্মিত। ওই মাসের ৮ তারিখ তিনি আরেক পোস্টে অন্য একটি বলিউড গান শোনার কথা উল্লেখ করে যেটায় অভিনয় করেন জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা অক্ষয়, সুনীল শেঠি ও অভিনেত্রী শিল্পা শেঠী। সেটিও ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনীর ওপর নির্মিত।
গত বছরের ৫ আগস্ট তার দেওয়া আরেকটি পোস্টে দেখা যায়, তিনি বলিউডের ‘রাধে শ্যাম’ সিনেমাটি লিখেছেন এবং তার কাছে এটিকে খুবই কমপ্লিকেটেড বা জটিল লাভ স্টোরি মনে হয়েছে বলে জানান।
ওই বছরের ৯ মে আরেকটি পোস্টে ছবি দিয়ে তিনি জানান, ছুটির দিনে তিনি হলিউডের ‘স্টারডাস্ট’ সিনেমাটি দেখেছেন। সেটি তার কাছে অসাধারণ লেগেছে বলেও উল্লেখ করেন এই আইনজীবী।
গত বছরের মার্চ মাসের ২২ তারিখ তার আরেকটি পোস্ট থেকে দেখা যায়, মামুন হলিউডের ‘দ্য ট্যুরিস্ট’ সিনেমাটি দেখেছেন এবং সেটি তার কাছে সবসময়ই অসাধারণ লাগে বলে জানিয়েছেন। বিশ্বখ্যাত অভিনেতা জনি ডেপ ও অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি অভিনীত এই সিনেমাটিও রোমান্টিক ঘরানার।
গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে প্রেমনির্ভর সিনেমা ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে নোটিশটি পাঠান। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
প্রেম নির্ভর নাটক-সিনেমা নির্মাণ বন্ধে আইনি নোটিশ
নোটিশে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটক শিল্পে কেবল প্রেম এবং মাত্রাতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের ব্যাপক আধিক্য দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের কনটেন্টের ক্রমাগত সম্প্রচারের ফলে চরম সাংস্কৃতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যার কারণে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ারের প্রতি মারাত্মকভাবে অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। এছাড়া এসব নাটক ও সিনেমায় পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা সমাজের ঐতিহ্যবাহী নৈতিক কাঠামোকে চরমভাবে ধ্বংস করছে।
নোটিশে বলা হয়, মূলধারার গণমাধ্যমে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শন সামাজিক নৈরাজ্য সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে এবং দেশে পরকীয়া ও ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যুবসমাজ এবং সাধারণ জনগণকে এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ বজায় রাখা সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে এখন চূড়ান্ত প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাহমুদুল হাসান মামুন নোটিশে আইনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান ও আইন মেনে চলা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের পবিত্র কর্তব্য। অন্যদিকে, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও, তা শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে রয়েছে। এছাড়া সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
নোটিশে দাবি করা হয়, দেশের প্রকৃত সংস্কৃতি রক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোনিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে কেবল প্রেমভিত্তিক নাটক ও সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। এর পরিবর্তে দেশপ্রেমিক ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দিতে হবে।
নোটিশে আগামী ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে, জননৈতিকতা ও জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন করা হবে বলে নোটিশে বলা হয়।
এএমএ
বিজ্ঞাপন