বিজ্ঞাপন
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে দালালের হাত ধরে অবৈধপথে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন নরসিংদীর রায়পুরার রবিন মিয়া। লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ভূমধ্যসাগরে পাড়ি দেওয়া একটি নৌযানে ছিলেন তিনি- এমন তথ্যই পেয়েছে তার পরিবার। কিন্তু সেই নৌযান দুর্ঘটনার কবলে পরার পর কেটে গেছে ২৫ দিন। এখনো রবিনের কোনো সন্ধান নেই।
রবিন জীবিত আছেন, নাকি ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে হারিয়ে গেছেন- কোনোটিই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না তাঁর পরিবার।
পরিবারের দাবি, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা ওই নৌযানে ছিলেন রবিনসহ ৪২ জন অভিবাসন প্রত্যাশী। নৌযানটি ভূমধ্যসাগরের মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে খাবার ও পানি ছাড়াই প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকতে হয় তাদের।
পরে ১৩ আগস্ট নৌযানটি মিশরের মার্সা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। ওই নৌযানে থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে এক ভিডিওতে জানিয়েছিলেন আব্দুল করিম নামে এক অভিবাসন প্রত্যাশী। তার দাবি, নিহতদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি।
আরও পড়ুন
মিশর / ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার ২৯ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে
করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌযানটিতে ৪২ জন যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তাদের ২৮ জনকে উদ্ধার করা হলেও রবিন মিয়ার অবস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
ভাই ওই নৌযানেই ছিল
রবিনের বোন মাহমুদা এই প্রতিবেদককে জানান, বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন, ৩ আগস্ট দুর্ঘটনার কবলে পড়া নৌযানটিতে তার ভাই রবিনও ছিলেন। পরে নৌযানটি মিশরের মার্সা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছানোর খবর পাওয়ার পর পরিবারের আশা ছিল- রবিন হয়তো জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। কিন্তু সেই আশারও এখন কোনো নিশ্চিত ভিত্তি নেই।
মাহমুদা বলেন, মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস, হাসপাতাল, কারাগার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো রবিনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য তারা পাননি। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মুসাপুর গ্রামের বাসিন্দা রবিন মিয়া। তার বাবা জলিল মিয়া ও মা শোফালা বেগম। ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
দালালের হাত ধরে লিবিয়ায়
পরিবারের ভাষ্য, উন্নত জীবনের আশায় অবৈধপথে ইউরোপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রবিন। এজন্য স্থানীয় দালালচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। পরিবারের দাবি, তাদের এলাকার রাজীব নামের এক দালালের মাধ্যমে রবিনকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে আলম নামের আরেক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মাহমুদার ভাষ্য, লিবিয়ায় থাকা আলমের কাছ থেকেই পরে তারা জানতে পারেন, ৩ আগস্ট গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা ওই নৌযানে রবিন ছিলেন। তবে এসব তথ্য এখনো স্বাধীনভাবে বা সরকারি কোনো সূত্রে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি জানিয়ে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসেও ই-মেইল করা হয়েছে বলে জানান মাহমুদা।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ৩ আগস্ট থেকেই
পরিবারের দাবি, ৩ আগস্ট নৌযান দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই রবিনের সঙ্গে তাদের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। একদিন, দুদিন করে পেরিয়ে যায় সপ্তাহ। কিন্তু রবিনের কোনো ফোন আসে না। তার অবস্থান সম্পর্কেও পাওয়া যায় না নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য। এর মধ্যে বিভিন্ন দালাল ও পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারের কাছে আসতে থাকে নানা ধরনের খবর।
দুর্ঘটনার পর কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মিশরে আটক রাখা হয়েছে। আবার উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দালালচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনের আত্মীয়ও রয়েছেন বলে পরিবারকে জানানো হয়। কিন্তু মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রদত্ত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ছবি ও তালিকা দেখে মাতরুহ পুলিশ হেফাজতে থাকা কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে রবিনের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি পরিবার।
হাসপাতালের কর্মী পরিচয়ে ফোন
রবিনের সন্ধান নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় রামিম খান নামের এক ব্যক্তির ফোনে। মাহমুদার দাবি, ওই ব্যক্তি ফোন করে নিজেকে মিশরের একটি হাসপাতালের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন।
তিনি দাবি করেন, রবিন মিয়াকে মিশরের তোরা কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অর্থের বিনিময়ে রবিনকে কারাগার থেকে বের করে দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি।
মাহমুদা বলেন, আমি তাকে বলেছি, আমার ভাইকে জেল থেকে বের করে ভিডিওকলে কথা বলিয়ে দিতে পারলে আপনাকে টাকা দেব। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি তার কথা রাখতে পারেননি।
মাহমুদার দেওয়া রামিম খানের নম্বরে এই প্রতিবেদক যোগাযোগ করলে সে এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে রবিন সত্যিই তোরা কারাগারে রয়েছেন কিনা, সে দাবিরও কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে রবিনের সন্ধানে তার ছবি ও পরিচয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে পরিবার। এরপর বিভিন্ন ব্যক্তি এবং দালালচক্রের কয়েকজন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, রবিন জীবিত এবং মিশরের একটি কারাগারে আটক রয়েছেন। এমন খবরে একদিকে যেমন পরিবারের মধ্যে আশার আলো জ্বলে ওঠে, অন্যদিকে পরবর্তীতে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় সেই আশাই আবার পরিণত হয় গভীর হতাশায়।
একেকজনের কাছে একেক তথ্য
রবিন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তার পরিবারের কাছে আসছে পরস্পরবিরোধী তথ্য। কেউ বলছেন তিনি জীবিত। কেউ বলছেন মিশরের কারাগারে আটক। আবার কেউ কেউ এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন, দুর্ঘটনার পর তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।ফলে পরিবারটি এখন চরম বিভ্রান্তি ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে।
একদিকে দালালকে দেওয়া বিপুল অর্থের ঋণ, অন্যদিকে ছেলের কোনো নিশ্চিত সন্ধান না পাওয়ার যন্ত্রণা—দুই দিক থেকেই বিপর্যস্ত পরিবারটি। রবিনের বাবা জলিল মিয়া বর্তমানে শয্যাশায়ী। ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর মা শোফালা বেগমও শোক ও দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
রবিন জীবিত থাকলে তাকে দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে পরিবার। আর যদি তিনি দুর্ঘটনায় মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তার পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবারকে সরকারি ও নির্ভরযোগ্যভাবে বিষয়টি জানানোর জন্য অনুরোধ করেছেন তারা।
দালালচক্রের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি
রবিনকে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় এবং পরে ইউরোপে পাঠানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানিয়েছে তার পরিবার। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজীব এবং লিবিয়ার আলমের মাধ্যমে রবিনের বিদেশযাত্রার পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
আমরা গুজব চাই না, নিশ্চিত খবর চাই
মাহমুদা জানান, প্রতিদিনই পরিবারের কাছে নতুন কোনো খবর আসে—কখনো আশার, কখনো হতাশার। কিন্তু কোনো খবরই এখন পর্যন্ত তাদের কাছে রবিনের প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষায়, তারা আর গুজব, অনুমান কিংবা দালালদের পরস্পরবিরোধী কথা শুনতে চান না। তারা শুধু রবিনের প্রকৃত পরিণতি সম্পর্কে একটি নিশ্চিত খবর চান।
রবিন জীবিত থাকলে তাকে খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আর যদি তিনি না থাকেন, তাহলে অন্তত তার পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবারকে জানানো হোক।
কারণ, প্রিয়জন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন- এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে প্রতিদিন অপেক্ষা করে থাকা যে কতটা নির্মম, রবিনের পরিবার এখন তারই সাক্ষী।
এমআরএম
বিজ্ঞাপন